ঢাকা ০৩:০১ , Sat, ০৫ Sep ২০২৬

বিশ্বসেরা ১৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েও বেছে নেন এমআইটি, এখন গুগলের সিনিয়র প্রকৌশলী বৃষ্টি

ফাহিম আহমেদ
  • প্রকাশঃ ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৪৮
  • / 13
আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় সাফল্যের পর এমআইটিতে পড়াশোনা করে গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন বৃষ্টি শিকদার ছবি: প্রজন্ম কথা

বাংলাদেশের বৃষ্টি শিকদারের উচ্চশিক্ষা ও পেশাজীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে, যার পরিণতি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, স্ট্যানফোর্ড, ক্যালটেক, ডিউক, কর্নেল এবং যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজসহ বিশ্বের ১৪টি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি বেছে নিয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে গুগল, কোরাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ ও ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ২০২১ সালে গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন তিনি।

বৃষ্টির প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় স্কুলজীবনেই। ২০০৮ সালে একটি প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বৃষ্টি জানিয়েছিলেন, ড. জাফর ইকবালকে দেখার আগ্রহ থেকেই প্রথম প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। পরে অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ তাঁকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উৎসাহিত করেন। দেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সেই প্রেরণা থেকেই প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিংয়ে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন তিনি।

এই পথেই আসে আন্তর্জাতিক সাফল্য। ২০১২ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন বৃষ্টি। পরের বছর এশিয়া-প্যাসিফিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডেও ব্রোঞ্জ পদক পান। ২০১৩ সালে জাতীয় ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে রানার-আপ হন। ২০১৪ সালেও এশিয়া-প্যাসিফিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের হয়ে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন তিনি।

উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সময় বৃষ্টি মোট ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। এর মধ্যে ১৪টি থেকেই ভর্তির সুযোগ পান। সেই তালিকায় ছিল হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড, ক্যালটেক, ডিউক, কর্নেল ও কেমব্রিজের মতো বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০১০-এর দশকের শুরুতে তাঁর এই সাফল্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এতগুলো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ সামনে থাকলেও বৃষ্টি শেষ পর্যন্ত এমআইটিকে বেছে নেন। সেখানে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন। এমআইটিতে তাঁর সময় একাডেমিক পড়াশোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত হন এবং স্নাতক পর্যায়ে গবেষণার সুযোগ কাজে লাগান। তাঁর এমআইটি-জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পড়াশোনার পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করা।

এমআইটিতে প্রথম বর্ষেই গুগলে তাঁর প্রথম ইন্টার্নশিপ হয়। গুগল ট্রান্সলেটের দলের সঙ্গে কাজ করার সময় ছবি থেকে তথ্য শনাক্ত করে লিখিত রূপে আনার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। এরপর ২০১৬ সালে কোরায়, ২০১৭ সালে ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসে এবং ২০১৮ সালে লন্ডনে অবস্থিত গুগল ডিপমাইন্ডে ইন্টার্নশিপ করেন। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বৃষ্টি জানিয়েছিলেন, চারটি গ্রীষ্মেই তিনি ইন্টার্নশিপ করেছেন এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকেই ফেরার পর কাজের সুযোগ পাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন।

২০১৮ সালে এমআইটি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করার পর পূর্ণকালীন পেশাজীবন শুরু করেন বৃষ্টি। তিনি রুব্রিকে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন এবং সেখানে বিতরণকৃত ফাইল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন। রুব্রিকে কাজের পাশাপাশি কোরাসহ প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়। পরে ডিপমাইন্ড ও ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসেও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।

গুগলে ফেরার পথটিও ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। ২০২১ সালে গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন বৃষ্টি। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, শুরুতে গুগলের লেভেল-৪ পদের জন্য সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকার ভালো হওয়ার পর তাঁকে লেভেল-৫ পদের জন্য নেওয়া হয়। এই পদটি গুগলের সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।

সাম্প্রতিক পেশাগত তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি। অর্থাৎ স্কুলজীবনের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ, এমআইটির একাডেমিক জীবন এবং একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে তিনি এখন বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত কাজে যুক্ত।

প্রযুক্তি খাতে নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেও কাজ করছেন বৃষ্টি। ২০২০ সালে তিনি ‘জার্নিজ ইন টেক’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে সফল বাংলাদেশি নারীদের গল্প তুলে ধরার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য অনুপ্রেরণামূলক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

বৃষ্টির ক্যারিয়ারের বিশেষ দিক হলো, তাঁর সাফল্য কোনো একক পরীক্ষার ফল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়নি। স্কুলজীবনে প্রোগ্রামিং শেখা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, অলিম্পিয়াডে পদক অর্জন, উচ্চশিক্ষার জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি প্রক্রিয়ায় সফল হওয়া এবং এমআইটিতে পড়ার পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে ইন্টার্নশিপ করার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

একসময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন নিয়ে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সেই শিক্ষার্থীই পরে হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি ও কেমব্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পান। এমআইটি বেছে নেওয়ার পর প্রথম বর্ষেই গুগলে ইন্টার্নশিপ, এরপর কোরাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ এবং শেষ পর্যন্ত গুগলের সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়া তাঁর দীর্ঘ প্রস্তুতির ধারাবাহিক ফল।

বৃষ্টি শিকদারের গল্প তাই ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আগ্রহকে দক্ষতায় রূপান্তর করা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করা, সুযোগকে কাজে লাগানো এবং এক ধাপ থেকে পরের ধাপে নিজেকে প্রস্তুত করার একটি দীর্ঘ যাত্রার গল্প। সেই যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। প্রযুক্তি খাতে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্নও রয়েছে তাঁর।

❤️
👏
🙂
😞

বিশ্বসেরা ১৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েও বেছে নেন এমআইটি, এখন গুগলের সিনিয়র প্রকৌশলী বৃষ্টি

প্রকাশঃ ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৪৮

বাংলাদেশের বৃষ্টি শিকদারের উচ্চশিক্ষা ও পেশাজীবনের যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে, যার পরিণতি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, স্ট্যানফোর্ড, ক্যালটেক, ডিউক, কর্নেল এবং যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজসহ বিশ্বের ১৪টি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি বেছে নিয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে গুগল, কোরাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ ও ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ২০২১ সালে গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন তিনি।

বৃষ্টির প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় স্কুলজীবনেই। ২০০৮ সালে একটি প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বৃষ্টি জানিয়েছিলেন, ড. জাফর ইকবালকে দেখার আগ্রহ থেকেই প্রথম প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। পরে অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ তাঁকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উৎসাহিত করেন। দেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সেই প্রেরণা থেকেই প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিংয়ে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন তিনি।

এই পথেই আসে আন্তর্জাতিক সাফল্য। ২০১২ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন বৃষ্টি। পরের বছর এশিয়া-প্যাসিফিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডেও ব্রোঞ্জ পদক পান। ২০১৩ সালে জাতীয় ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডে রানার-আপ হন। ২০১৪ সালেও এশিয়া-প্যাসিফিক ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের হয়ে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন তিনি।

উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার সময় বৃষ্টি মোট ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। এর মধ্যে ১৪টি থেকেই ভর্তির সুযোগ পান। সেই তালিকায় ছিল হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড, ক্যালটেক, ডিউক, কর্নেল ও কেমব্রিজের মতো বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০১০-এর দশকের শুরুতে তাঁর এই সাফল্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এতগুলো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ সামনে থাকলেও বৃষ্টি শেষ পর্যন্ত এমআইটিকে বেছে নেন। সেখানে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন। এমআইটিতে তাঁর সময় একাডেমিক পড়াশোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত হন এবং স্নাতক পর্যায়ে গবেষণার সুযোগ কাজে লাগান। তাঁর এমআইটি-জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পড়াশোনার পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করা।

এমআইটিতে প্রথম বর্ষেই গুগলে তাঁর প্রথম ইন্টার্নশিপ হয়। গুগল ট্রান্সলেটের দলের সঙ্গে কাজ করার সময় ছবি থেকে তথ্য শনাক্ত করে লিখিত রূপে আনার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। এরপর ২০১৬ সালে কোরায়, ২০১৭ সালে ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসে এবং ২০১৮ সালে লন্ডনে অবস্থিত গুগল ডিপমাইন্ডে ইন্টার্নশিপ করেন। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বৃষ্টি জানিয়েছিলেন, চারটি গ্রীষ্মেই তিনি ইন্টার্নশিপ করেছেন এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকেই ফেরার পর কাজের সুযোগ পাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন।

২০১৮ সালে এমআইটি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করার পর পূর্ণকালীন পেশাজীবন শুরু করেন বৃষ্টি। তিনি রুব্রিকে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন এবং সেখানে বিতরণকৃত ফাইল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন। রুব্রিকে কাজের পাশাপাশি কোরাসহ প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়। পরে ডিপমাইন্ড ও ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটসেও কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।

গুগলে ফেরার পথটিও ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। ২০২১ সালে গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন বৃষ্টি। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, শুরুতে গুগলের লেভেল-৪ পদের জন্য সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকার ভালো হওয়ার পর তাঁকে লেভেল-৫ পদের জন্য নেওয়া হয়। এই পদটি গুগলের সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।

সাম্প্রতিক পেশাগত তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টি গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি। অর্থাৎ স্কুলজীবনের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ, এমআইটির একাডেমিক জীবন এবং একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে তিনি এখন বিশ্বের অন্যতম বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত কাজে যুক্ত।

প্রযুক্তি খাতে নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেও কাজ করছেন বৃষ্টি। ২০২০ সালে তিনি ‘জার্নিজ ইন টেক’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে সফল বাংলাদেশি নারীদের গল্প তুলে ধরার পাশাপাশি প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য অনুপ্রেরণামূলক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

বৃষ্টির ক্যারিয়ারের বিশেষ দিক হলো, তাঁর সাফল্য কোনো একক পরীক্ষার ফল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়নি। স্কুলজীবনে প্রোগ্রামিং শেখা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, অলিম্পিয়াডে পদক অর্জন, উচ্চশিক্ষার জন্য দীর্ঘ প্রস্তুতি, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি প্রক্রিয়ায় সফল হওয়া এবং এমআইটিতে পড়ার পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে ইন্টার্নশিপ করার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

একসময় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন নিয়ে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সেই শিক্ষার্থীই পরে হার্ভার্ড, প্রিন্সটন, স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি ও কেমব্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পান। এমআইটি বেছে নেওয়ার পর প্রথম বর্ষেই গুগলে ইন্টার্নশিপ, এরপর কোরাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ এবং শেষ পর্যন্ত গুগলের সিনিয়র সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়া তাঁর দীর্ঘ প্রস্তুতির ধারাবাহিক ফল।

বৃষ্টি শিকদারের গল্প তাই ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আগ্রহকে দক্ষতায় রূপান্তর করা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করা, সুযোগকে কাজে লাগানো এবং এক ধাপ থেকে পরের ধাপে নিজেকে প্রস্তুত করার একটি দীর্ঘ যাত্রার গল্প। সেই যাত্রা এখনো শেষ হয়নি। প্রযুক্তি খাতে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্নও রয়েছে তাঁর।