ঢাকা ০৯:১৩ , Tue, ০৮ Sep ২০২৬

ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল কারেন্সি: অর্থের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

তানজিম হোসেন
  • প্রকাশঃ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৩৬
  • / 10
ছবি: সংগৃহীত

অর্থের পরিচয় ছিল কাগজের নোট, ধাতব মুদ্রা আর ব্যাংকের খাতায় লেখা কিছু সংখ্যা। সময় বদলেছে। এখন অর্থের বড় একটি অংশের কোনো কাগুজে অস্তিত্ব নেই, অথচ তা দিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে লেনদেন সম্ভব। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর এরই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ভাবছে আরেক ধরনের ডিজিটাল অর্থের কথা, যাকে বলা হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা বা সিবিডিসি।

ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত এমন এক ধরনের ডিজিটাল সম্পদ, যা সাধারণত কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না। বিটকয়েন এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি লেনদেন যাচাই ও সংরক্ষণের দায়িত্ব থাকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর। ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব অনেকাংশে পালন করে ব্লকচেইন প্রযুক্তি। এটি একটি বিতরণকৃত ডিজিটাল হিসাবখাতা, যেখানে লেনদেন নেটওয়ার্কের বিভিন্ন কম্পিউটারে যাচাই ও সংরক্ষিত হয়। ফলে কোনো একক প্রতিষ্ঠান পুরো ব্যবস্থাটির একমাত্র নিয়ন্ত্রক থাকে না।

ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার অর্থ পাঠানো বা গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিনিয়োগের সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক লেনদেনে সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মার্ট কনট্রাক্ট, টোকেনাইজেশনসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রযুক্তির পথ খুলে দিয়েছে।

তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। অনেক ক্রিপ্টো সম্পদের মূল্য অত্যন্ত অস্থির। কিছু সম্পদের পেছনে নির্ভরযোগ্য সম্পদ বা প্রতিষ্ঠানের নিশ্চয়তা নেই। বাজারে তথ্যের অসমতা ও প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে, ক্রিপ্টো সম্পদের বিস্তার আর্থিক স্থিতিশীলতা, মুদ্রানীতি এবং পুঁজি প্রবাহের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

এখানেই ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সিবিডিসির মৌলিক পার্থক্য। সিবিডিসি কোনো বেসরকারি ক্রিপ্টো টোকেন নয়। এটি একটি দেশের সরকারি মুদ্রার ডিজিটাল রূপ, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইস্যু ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিটকয়েন যেখানে রাষ্ট্রের বাইরে একটি বিকল্প আর্থিক কাঠামোর ধারণা সামনে আনে, সিবিডিসি সেখানে রাষ্ট্রীয় মুদ্রাব্যবস্থাকে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি প্রচেষ্টা।

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক অবস্থান এই পরিবর্তনের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংকের ২০২৪ সালের এক জরিপে ৯৩টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে ৮৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ, খুচরা সিবিডিসি, পাইকারি সিবিডিসি অথবা উভয় ধরনের সিবিডিসি নিয়ে কাজ করছিল।

এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। অর্থনীতি যখন ক্রমেই ডিজিটাল হচ্ছে, তখন কাগজের নোট ও প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের আর্থিক পরিবর্তন সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিবিডিসি নিয়ে আগ্রহকে ক্রিপ্টোকারেন্সি গ্রহণের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি তার বিপরীত। আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রিপ্টো সম্পদ ও স্টেবলকয়েনের বিকাশ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নিজেদের ডিজিটাল মুদ্রা ও আধুনিক লেনদেন অবকাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।

এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় মুদ্রার সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। একটি দেশের মুদ্রা কেবল লেনদেনের মাধ্যম নয়, রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ যদি ব্যাপকভাবে এমন কোনো বেসরকারি ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহার করতে শুরু করে, যার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেই, তাহলে অর্থ সরবরাহ, মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর রাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নীতিগত অবস্থানও হলো, ক্রিপ্টো সম্পদকে সরকারি মুদ্রা বা আইনগত দরপত্রের মর্যাদা না দেওয়াই মুদ্রা সার্বভৌমত্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অধিক নিরাপদ।

অন্যদিকে ডিজিটাল মুদ্রার সম্ভাবনাও রয়েছে। দ্রুত ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী লেনদেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের দক্ষতা এবং নতুন ধরনের ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো তৈরিতে সিবিডিসি ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সঠিকভাবে নকশা করা সিবিডিসি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং কিছু ক্ষেত্রে ডলারনির্ভরতা বা ক্রিপ্টো ব্যবহারের চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে।

তবে এর সঙ্গে কিছু মৌলিক প্রশ্নও রয়েছে। ডিজিটাল অর্থের যুগে নাগরিকের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা হবে? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা তথ্য দেখতে পারবে? সাইবার হামলা হলে কী হবে? মানুষ যদি ব্যাংকের আমানতের পরিবর্তে সিবিডিসিতে বিপুল অর্থ রাখে, তাহলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা কি চাপে পড়বে? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর এখনো তৈরি হয়নি।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটাল লেনদেনের দিকে এগোলেও নগদ অর্থের ব্যবহার এখনো ব্যাপক। ফলে ভবিষ্যতের ডিজিটাল মুদ্রাব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা, আর্থিক সাক্ষরতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ক্রিপ্টোকারেন্সি থাকবে কি না কিংবা সিবিডিসি আসবে কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আগামী দিনের অর্থব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং প্রযুক্তি সেই ব্যবস্থাকে কতটা বদলে দেবে।

সম্ভবত ভবিষ্যতের অর্থনীতি কাগজের নোটকে পুরোপুরি বিদায় দেবে না, আবার ক্রিপ্টোকারেন্সিকেও একদিনে মুছে ফেলবে না। রাষ্ট্রীয় মুদ্রা, ব্যাংক আমানত, স্টেবলকয়েন, ক্রিপ্টো সম্পদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। সেই বহুমাত্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে প্রযুক্তিকে নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বার্থের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে সমন্বয় করা যায়, সেই সক্ষমতা।

অর্থের ইতিহাসে প্রতিটি যুগ পরিবর্তনের আগে একটি প্রশ্ন রেখে যায়। এবার প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট: টাকার ভবিষ্যৎ কি রাষ্ট্রের হাতে থাকবে, নাকি অ্যালগরিদমের হাতে? এর উত্তর নির্ধারণ করবে অর্থনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার পরবর্তী অধ্যায়ও।

লেখক: তানজিম হোসেন, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

❤️
👏
🙂
😞

ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল কারেন্সি: অর্থের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

প্রকাশঃ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:৩৬

অর্থের পরিচয় ছিল কাগজের নোট, ধাতব মুদ্রা আর ব্যাংকের খাতায় লেখা কিছু সংখ্যা। সময় বদলেছে। এখন অর্থের বড় একটি অংশের কোনো কাগুজে অস্তিত্ব নেই, অথচ তা দিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে লেনদেন সম্ভব। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর এরই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ভাবছে আরেক ধরনের ডিজিটাল অর্থের কথা, যাকে বলা হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা বা সিবিডিসি।

ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত এমন এক ধরনের ডিজিটাল সম্পদ, যা সাধারণত কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না। বিটকয়েন এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি লেনদেন যাচাই ও সংরক্ষণের দায়িত্ব থাকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর। ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব অনেকাংশে পালন করে ব্লকচেইন প্রযুক্তি। এটি একটি বিতরণকৃত ডিজিটাল হিসাবখাতা, যেখানে লেনদেন নেটওয়ার্কের বিভিন্ন কম্পিউটারে যাচাই ও সংরক্ষিত হয়। ফলে কোনো একক প্রতিষ্ঠান পুরো ব্যবস্থাটির একমাত্র নিয়ন্ত্রক থাকে না।

ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার অর্থ পাঠানো বা গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিনিয়োগের সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক লেনদেনে সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মার্ট কনট্রাক্ট, টোকেনাইজেশনসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রযুক্তির পথ খুলে দিয়েছে।

তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। অনেক ক্রিপ্টো সম্পদের মূল্য অত্যন্ত অস্থির। কিছু সম্পদের পেছনে নির্ভরযোগ্য সম্পদ বা প্রতিষ্ঠানের নিশ্চয়তা নেই। বাজারে তথ্যের অসমতা ও প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে, ক্রিপ্টো সম্পদের বিস্তার আর্থিক স্থিতিশীলতা, মুদ্রানীতি এবং পুঁজি প্রবাহের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

এখানেই ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সিবিডিসির মৌলিক পার্থক্য। সিবিডিসি কোনো বেসরকারি ক্রিপ্টো টোকেন নয়। এটি একটি দেশের সরকারি মুদ্রার ডিজিটাল রূপ, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইস্যু ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বিটকয়েন যেখানে রাষ্ট্রের বাইরে একটি বিকল্প আর্থিক কাঠামোর ধারণা সামনে আনে, সিবিডিসি সেখানে রাষ্ট্রীয় মুদ্রাব্যবস্থাকে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি প্রচেষ্টা।

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক অবস্থান এই পরিবর্তনের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংকের ২০২৪ সালের এক জরিপে ৯৩টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে ৮৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ, খুচরা সিবিডিসি, পাইকারি সিবিডিসি অথবা উভয় ধরনের সিবিডিসি নিয়ে কাজ করছিল।

এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। অর্থনীতি যখন ক্রমেই ডিজিটাল হচ্ছে, তখন কাগজের নোট ও প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের আর্থিক পরিবর্তন সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিবিডিসি নিয়ে আগ্রহকে ক্রিপ্টোকারেন্সি গ্রহণের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি তার বিপরীত। আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রিপ্টো সম্পদ ও স্টেবলকয়েনের বিকাশ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নিজেদের ডিজিটাল মুদ্রা ও আধুনিক লেনদেন অবকাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।

এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় মুদ্রার সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। একটি দেশের মুদ্রা কেবল লেনদেনের মাধ্যম নয়, রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ যদি ব্যাপকভাবে এমন কোনো বেসরকারি ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহার করতে শুরু করে, যার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেই, তাহলে অর্থ সরবরাহ, মুদ্রানীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর রাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নীতিগত অবস্থানও হলো, ক্রিপ্টো সম্পদকে সরকারি মুদ্রা বা আইনগত দরপত্রের মর্যাদা না দেওয়াই মুদ্রা সার্বভৌমত্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অধিক নিরাপদ।

অন্যদিকে ডিজিটাল মুদ্রার সম্ভাবনাও রয়েছে। দ্রুত ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী লেনদেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের দক্ষতা এবং নতুন ধরনের ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো তৈরিতে সিবিডিসি ভূমিকা রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সঠিকভাবে নকশা করা সিবিডিসি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং কিছু ক্ষেত্রে ডলারনির্ভরতা বা ক্রিপ্টো ব্যবহারের চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে।

তবে এর সঙ্গে কিছু মৌলিক প্রশ্নও রয়েছে। ডিজিটাল অর্থের যুগে নাগরিকের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা হবে? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা তথ্য দেখতে পারবে? সাইবার হামলা হলে কী হবে? মানুষ যদি ব্যাংকের আমানতের পরিবর্তে সিবিডিসিতে বিপুল অর্থ রাখে, তাহলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা কি চাপে পড়বে? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর এখনো তৈরি হয়নি।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটাল লেনদেনের দিকে এগোলেও নগদ অর্থের ব্যবহার এখনো ব্যাপক। ফলে ভবিষ্যতের ডিজিটাল মুদ্রাব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা, আর্থিক সাক্ষরতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ক্রিপ্টোকারেন্সি থাকবে কি না কিংবা সিবিডিসি আসবে কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আগামী দিনের অর্থব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং প্রযুক্তি সেই ব্যবস্থাকে কতটা বদলে দেবে।

সম্ভবত ভবিষ্যতের অর্থনীতি কাগজের নোটকে পুরোপুরি বিদায় দেবে না, আবার ক্রিপ্টোকারেন্সিকেও একদিনে মুছে ফেলবে না। রাষ্ট্রীয় মুদ্রা, ব্যাংক আমানত, স্টেবলকয়েন, ক্রিপ্টো সম্পদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। সেই বহুমাত্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে প্রযুক্তিকে নীতি, নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বার্থের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে সমন্বয় করা যায়, সেই সক্ষমতা।

অর্থের ইতিহাসে প্রতিটি যুগ পরিবর্তনের আগে একটি প্রশ্ন রেখে যায়। এবার প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট: টাকার ভবিষ্যৎ কি রাষ্ট্রের হাতে থাকবে, নাকি অ্যালগরিদমের হাতে? এর উত্তর নির্ধারণ করবে অর্থনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার পরবর্তী অধ্যায়ও।

লেখক: তানজিম হোসেন, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়