রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইদুল্লাহ, শিক্ষার স্বপ্নে বদলে গেছে জীবন
- প্রকাশঃ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৪৭
- / 1
কক্সবাজার, ৮ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার সময় সাইদুল্লাহর সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু জিনিসপত্র। সহিংসতা, নিপীড়ন ও আতঙ্ক থেকে বাঁচতে পরিবারের সঙ্গে দিনের পর দিন বন ও পাহাড় পেরিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছান তিনি। সেই যাত্রায় হারিয়েছেন নিজের বাড়ি, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা অনেক স্বপ্ন। তবে হারাননি শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে শরণার্থী হিসেবে বসবাসের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সাত বছর পর ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পান তিনি। চলতি বছর নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামাজিক বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন সাইদুল্লাহ। তাঁর বিশেষায়িত অধ্যয়নের ক্ষেত্র ছিল আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন।
বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাইদুল্লাহ বলেন, শরণার্থীদের জন্য সাক্ষরতার অর্থ কেবল পড়তে ও লিখতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের অধিকার বোঝা, নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া, শরণার্থী শিবিরের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করা, ভুল তথ্য যাচাই করা এবং নিজের কথা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরার সক্ষমতাও এর অংশ।
সাইদুল্লাহর ভাষায়, শিক্ষা তাঁর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী সুরক্ষার একটি হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে থাকার সময় তিনি দেখেছেন, হাজারো তরুণ আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অত্যন্ত সীমিত সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠছে। তাদের অনেকের স্বপ্ন চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, উদ্যোক্তা, গবেষক বা কমিউনিটি নেতা হওয়ার। বাস্তুচ্যুতি তাদের মেধা ও আকাঙ্ক্ষা কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে সুযোগ।
তাঁর মতে, শরণার্থীদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকার পেছনে বাস্তুচ্যুতি, চলাচলের বিধিনিষেধ, বৈধ নথিপত্রের অভাব, দারিদ্র্য, বৈষম্য, ভাষাগত বাধা এবং উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার সীমিত পথ বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। এর প্রভাব শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এতে বিপুল মানবিক সম্ভাবনাও অপূর্ণ থেকে যায়।
রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে বসবাসের সময় বহু বছর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজেছেন সাইদুল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া একসময় তাঁর কাছে প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল। শেখার আগ্রহ ও পরিশ্রমের ইচ্ছা থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য স্বাভাবিক বলে বিবেচিত আইনি মর্যাদা ও সুযোগ তাঁর ছিল না। তবু তিনি চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
শরণার্থী শিবিরে থাকার সময় সাইদুল্লাহ ‘রোহিঙ্গা স্টুডেন্ট নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির মাধ্যমে তিনি দেখেছেন, তরুণদের শেখার সুযোগ দেওয়া হলে তাদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের সক্ষমতা কীভাবে বাড়ে।
সাইদুল্লাহ মনে করেন, শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়। এটি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, নেতৃত্বের গুণ বিকাশ করে এবং মানুষকে নিজের জীবনে প্রভাব ফেলা বিষয়গুলো বোঝার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সক্ষমতা দেয়।
রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও ইতিহাস বারবার অস্বীকার বা বিকৃতভাবে উপস্থাপনের প্রেক্ষাপটে তথ্য যাচাই, নিজের অধিকার বোঝা এবং নিজের কথা তুলে ধরার সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, তথ্য বুঝতে ও বিশ্লেষণ করতে পারা একজন মানুষকে সহজে নীরব করে দেওয়া কঠিন করে তোলে।
ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতার ধারণাও বদলেছে বলে মনে করেন সাইদুল্লাহ। শরণার্থীরা এখন মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে খবর পায়, যোগাযোগ করে, সংগঠিত হয় এবং পড়াশোনা চালায়। ফলে বর্তমান সময়ে সাক্ষরতার মধ্যে ভুল তথ্য শনাক্ত করা, ডিজিটাল মাধ্যম কীভাবে তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় তা বোঝা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারও অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ভুল তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও মানুষকে অমানবিকভাবে উপস্থাপনের বয়ান ইতোমধ্যে ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করেছে। তাই শিক্ষা তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করা, বিদ্বেষকে চ্যালেঞ্জ করা, শান্তিপূর্ণভাবে অন্যদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং নিজেদের সম্প্রদায়ের দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করা উচিত।
শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আলোচনায় শিক্ষাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাইদুল্লাহ। তাঁর মতে, শরণার্থীদের শিক্ষায় বিনিয়োগকে দাতব্য কাজ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষিত শরণার্থীরা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে, নিজেদের সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করতে, সামাজিক সংহতি বাড়াতে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারেন।
নিজের জীবনের পরিবর্তনের পেছনে যারা তাঁর শরণার্থী পরিচয়ের বাইরে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সম্ভাবনাকে দেখেছেন, তাদের অবদানের কথাও উল্লেখ করেছেন সাইদুল্লাহ। তাঁর মতে, তাঁর গল্পটি ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা হওয়া উচিত নয়।
বিশ্ব সাক্ষরতা দিবসে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কতজন শরণার্থী শিশু পড়তে ও লিখতে পারে, সেটির পাশাপাশি কতজনকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার।
সাইদুল্লাহর মতে, খাদ্য মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, আশ্রয় নিরাপত্তা দেয় এবং মানবিক সহায়তা বাস্তুচ্যুত মানুষকে টিকে থাকতে সাহায্য করে। তবে শিক্ষা মানুষকে টিকে থাকার পর্যায় পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি করে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামাজিক বিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করার পর বর্তমানে সাইদুল্লাহ আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে নিউইয়র্কের বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানোর তাঁর এই যাত্রা শিক্ষার সুযোগ এবং বাস্তুচ্যুত তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে এনেছে।



























