ঢাকা ০৯:৩০ , Tue, ০৮ Sep ২০২৬

জীবনের সঙ্গী, অক্সফোর্ডেও সহপাঠী: একজন খুঁজছেন নতুন ওষুধের পথ, অন্যজন অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

তানজিম হোসেন
  • প্রকাশঃ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৪৫
  • / 5
সিনায়াত মাহজাবীন ও আবির হাসান ছবি: লেখক সৌজন্য

একজনের পৃথিবী কোষ, ক্যালসিয়াম সংকেত আর সম্ভাব্য নতুন ওষুধের অণু ঘিরে। অন্যজনের চিন্তার কেন্দ্রে দেশ, অর্থনীতি, রপ্তানি আর নীতিগত সংস্কার। একজন পরীক্ষাগারে বসে খুঁজেছেন মানুষের শরীরের ভেতরের জটিল প্রক্রিয়ার উত্তর, অন্যজন গবেষণার টেবিলে বসে খুঁজছেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পথ।

দুজনের পড়াশোনার বিষয় আলাদা। গবেষণার ক্ষেত্র আলাদা। চিন্তার জগতও আলাদা। তবু তাঁদের গন্তব্য এক হয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সিনায়াত মাহজাবীন ও আবির হাসানের গল্প তাই কেবল দুজনের অক্সফোর্ডে পড়ার গল্প নয়। এটি দুটি আলাদা স্বপ্নের পাশাপাশি এগিয়ে চলার গল্প। একে অপরের স্বপ্নকে নিজের করে নেওয়া নয়, বরং দুজনের আলাদা স্বপ্নকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

২০১৫ সালে তাঁদের বিয়ে। এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়ের প্রস্তুতি। সেই পথ শেষ পর্যন্ত তাঁদের দুজনকেই নিয়ে যায় অক্সফোর্ডে।

কিন্তু কীভাবে?

ছোঁয়াচে ছিল স্বপ্ন

সিনায়াত মাহজাবীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে স্নাতক করেন। আবির হাসান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। পরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিকসে মাস্টার্স করেন তিনি।

শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপ নিয়ে দুজনেরই বড় স্বপ্ন ছিল। নিজেদের সক্ষমতাকে দেশের গণ্ডির বাইরে যাচাই করা, নতুন পরিবেশে শেখা এবং গবেষণার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা থেকেই বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতি শুরু করেন তাঁরা।

অক্সফোর্ডে যাওয়ার সুযোগ প্রথম আসে আবিরের সামনে।

জননীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ পান তিনি। একই সময়ে বিশ্বব্যাংকে কাজের প্রস্তাবও আসে। জীবনের সামনে তখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

আবির পেশাগত সুযোগটিকে বেছে নেন। ফলে অক্সফোর্ডে ভর্তি এক বছর পিছিয়ে দেন।

এই সময়টিই হয়ে ওঠে তাঁদের দুজনের অক্সফোর্ডযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক।

আবির সিনায়াতকে অক্সফোর্ডে আবেদন করতে উৎসাহিত করেন। সিনায়াতও প্রস্তুতি নিয়ে অক্সফোর্ডের পাশাপাশি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন।

দুটি জায়গা থেকেই আসে সুযোগ।

ডেনিশ সরকারের বৃত্তিসহ কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সিনায়াত। তবু শেষ পর্যন্ত বেছে নেন অক্সফোর্ডকে।

কারণটা ছিল একাডেমিক পছন্দের পাশাপাশি ব্যক্তিগত এক সিদ্ধান্তও।

দুজন চেয়েছিলেন একই সময়ে একই শহরে থেকে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু করতে।

সিনায়াতের ভাষায়, তাঁদের অক্সফোর্ডযাত্রাকে কেবল দুজনের একই প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ হিসেবে দেখলে গল্পটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।

এখানে ছিল একে অপরের স্বপ্নকে জায়গা দেওয়া। জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে একে অপরকে সাহায্য করা।

দুজনের স্বপ্ন যেন একে অপরকে আরও দূরে যাওয়ার সাহস দিয়েছিল।

একই শহর, আলাদা পৃথিবী

অক্সফোর্ডে গিয়ে তাঁদের দিন কাটতে থাকে নিজেদের পড়াশোনা ও কাজ নিয়ে।

আবিরের ব্যস্ততা জননীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন ঘিরে। সিনায়াতের পৃথিবী ফার্মাকোলজি ও গবেষণা।

একই শহরে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে থেকেও তাঁদের প্রতিদিনের কাজের জগৎ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

কিন্তু দিন শেষে সেই আলাদা জগতের গল্পগুলো এসে মিলত একই জায়গায়।

নতুন কোনো বিষয় শেখা। কঠিন কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। পড়াশোনার চাপ। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

এসব নিয়েই চলত তাঁদের কথোপকথন।

একজনের গবেষণার বিষয় হয়তো অন্যজনের কাছে সব সময় সহজবোধ্য ছিল না। তবু সেই ভিন্নতাই তাঁদের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

সিনায়াত বলেন, তাঁদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো, তাঁরা একে অপরকে নিজেদের পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি।

বরং দুজনের আলাদা পথকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েই পাশাপাশি থাকার চেষ্টা করেছেন।

এই জায়গাটিই হয়তো তাঁদের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

একসঙ্গে পথ চলা মানেই একই পথে হাঁটা নয়। কখনো কখনো পাশাপাশি থাকার অর্থ হলো, দুজনকে নিজেদের পছন্দের পথে হাঁটার জায়গা করে দেওয়া।

অক্সফোর্ডের পর সিনায়াতের গবেষণার নতুন অধ্যায়

অক্সফোর্ডের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর সিনায়াতের গবেষণার পথ তাঁকে নিয়ে যায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

দেশে ফিরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে ইউসুফ জামিল বৃত্তি নিয়ে ফার্মাকোলজিতে পিএইচডি করেন।

তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল মানুষের শরীরের কোষে ক্যালসিয়াম কীভাবে সংকেত আদান-প্রদান করে।

বিষয়টি সহজ করে বললে, শরীরের কোষগুলো নিজেদের মধ্যে নানা সংকেতের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। সেই সংকেতব্যবস্থায় ক্যালসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা হলে বিভিন্ন রোগের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

সিনায়াতের গবেষণার লক্ষ্য ছিল এমন নতুন কিছু অণু খুঁজে বের করা, যেগুলো এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ভবিষ্যতে ওষুধ তৈরির গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।

একটি কোষের ভেতরে চলতে থাকা অদৃশ্য সংকেতের ভাষা বোঝার চেষ্টা করতে করতে তাঁর গবেষণার পথ এগিয়ে যায় আরও গভীরে।

আবিরের গবেষণায় বাংলাদেশ

অন্যদিকে আবিরের গবেষণার কেন্দ্র বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ কীভাবে রপ্তানি খাত থেকে আরও বেশি আয় করতে পারে, সেটিই তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত।

শুধু তৈরি পোশাকের মতো কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভর না করে কীভাবে নতুন শিল্প ও রপ্তানি খাত তৈরি করা যায়? সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কীভাবে দীর্ঘ মেয়াদে করা সম্ভব?

মূলত এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন আবির।

সিনায়াতের গবেষণার টেবিলে যেখানে একটি কোষের ভেতরের ক্যালসিয়াম সংকেত, আবিরের গবেষণার টেবিলে সেখানে একটি দেশের অর্থনীতি, নীতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন।

দুটি গবেষণার বিষয় যতটা আলাদা, তাঁদের আলোচনার পরিসরও ততটাই বিস্তৃত।

একজন কোষ বোঝেন, অন্যজন দেশ

কোষ, ওষুধ ও জীববিজ্ঞানের নানা প্রক্রিয়া ঘিরে সিনায়াতের গবেষণার জগৎ।

আবির ভাবেন দেশ, অর্থনীতি, নীতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে।

একজন পরীক্ষাগারে বসে একটি কোষের ভেতরের প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করেন। অন্যজন খুঁজে দেখেন কেন কোনো দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার সফল হয়, কোনোটি আবার থেমে যায়।

একজনের গবেষণার যুক্তি অন্যজনের কাছে সব সময় সহজবোধ্য না হলেও পারস্পরিক আলাপ তাঁদের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে।

হয়তো এখানেই তাঁদের সম্পর্কের আরেকটি শক্তি।

একই উত্তর খোঁজা তাঁদের প্রয়োজন হয়নি। প্রয়োজন হয়েছে একে অপরকে প্রশ্ন করার, শুনে নেওয়ার এবং ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের ভাবনাকে দেখার।

সাফল্যকে তাঁরা কীভাবে দেখেন

দুজনের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও নিজেদের অর্জনকে আবির ও সিনায়াত কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখতে চান না।

দুজনই নিজেদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের জন্য কাজে লাগাতে চান।

তরুণদের উদ্দেশে তাঁদের বার্তাও তাই সাফল্যের প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে।

নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রম করতে হবে।

অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে পড়া অবশ্যই বড় অর্জন। কিন্তু তাঁদের কাছে এই পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়।

শিক্ষাটি হলো নিজের জায়গা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া।

প্রত্যাখ্যান এলে আবার চেষ্টা করা।

নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করা।

আর নিজের পথকে অন্যের পথের সঙ্গে তুলনা না করা।

তাঁদের বিশ্বাস, সাফল্য মানে কেবল কোথায় পৌঁছানো, তা নয়। সেই পথে চলতে গিয়ে কী শেখা হলো এবং পরে সেই শিক্ষাকে অন্যদের জন্য কীভাবে কাজে লাগানো গেল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গল্প এখনো চলছে

অক্সফোর্ড তাঁদের গল্পের শেষ গন্তব্য হয়ে থাকেনি।

আবির বর্তমানে অক্সফোর্ড ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে পিএইচডি গবেষণা করছেন।

অন্যদিকে সিনায়াত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থেকে ক্রনিক কিডনি ডিজিজের একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন।

দুজনের গবেষণার বিষয় এখনো আলাদা। একজনের সামনে মানুষের শরীরের জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া, অন্যজনের সামনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বড় প্রশ্ন।

তবু তাঁদের পথ পাশাপাশি।

২০১৫ সালে যে দুজন জীবনসঙ্গী হিসেবে একসঙ্গে পথচলা শুরু করেছিলেন, তাঁদের সেই পথচলায় একে অপরের স্বপ্নকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা নেই। আছে স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা, কঠিন সময়ে পাশে থাকার মানসিকতা এবং ভিন্ন পথ থেকেও একে অপরকে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

হয়তো এ কারণেই তাঁদের অক্সফোর্ডযাত্রার সবচেয়ে সুন্দর দিকটি কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের মধ্যে আটকে নেই।

সেটি আছে দুজন মানুষের গল্পে, যারা একই জীবনে থেকেও নিজেদের আলাদা পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

একজন কোষের ভেতর খুঁজছেন জীবনের সংকেত। অন্যজন একটি দেশের অর্থনীতির ভেতর খুঁজছেন পরিবর্তনের সূত্র।

দুটি পথ আলাদা।

কিন্তু পাশাপাশি হাঁটার গল্পটি এক।

❤️
👏
🙂
😞

জীবনের সঙ্গী, অক্সফোর্ডেও সহপাঠী: একজন খুঁজছেন নতুন ওষুধের পথ, অন্যজন অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশঃ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৪৫

একজনের পৃথিবী কোষ, ক্যালসিয়াম সংকেত আর সম্ভাব্য নতুন ওষুধের অণু ঘিরে। অন্যজনের চিন্তার কেন্দ্রে দেশ, অর্থনীতি, রপ্তানি আর নীতিগত সংস্কার। একজন পরীক্ষাগারে বসে খুঁজেছেন মানুষের শরীরের ভেতরের জটিল প্রক্রিয়ার উত্তর, অন্যজন গবেষণার টেবিলে বসে খুঁজছেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পথ।

দুজনের পড়াশোনার বিষয় আলাদা। গবেষণার ক্ষেত্র আলাদা। চিন্তার জগতও আলাদা। তবু তাঁদের গন্তব্য এক হয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সিনায়াত মাহজাবীন ও আবির হাসানের গল্প তাই কেবল দুজনের অক্সফোর্ডে পড়ার গল্প নয়। এটি দুটি আলাদা স্বপ্নের পাশাপাশি এগিয়ে চলার গল্প। একে অপরের স্বপ্নকে নিজের করে নেওয়া নয়, বরং দুজনের আলাদা স্বপ্নকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

২০১৫ সালে তাঁদের বিয়ে। এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়ের প্রস্তুতি। সেই পথ শেষ পর্যন্ত তাঁদের দুজনকেই নিয়ে যায় অক্সফোর্ডে।

কিন্তু কীভাবে?

ছোঁয়াচে ছিল স্বপ্ন

সিনায়াত মাহজাবীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে স্নাতক করেন। আবির হাসান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। পরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ইকোনমিকসে মাস্টার্স করেন তিনি।

শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপ নিয়ে দুজনেরই বড় স্বপ্ন ছিল। নিজেদের সক্ষমতাকে দেশের গণ্ডির বাইরে যাচাই করা, নতুন পরিবেশে শেখা এবং গবেষণার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা থেকেই বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতি শুরু করেন তাঁরা।

অক্সফোর্ডে যাওয়ার সুযোগ প্রথম আসে আবিরের সামনে।

জননীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করার সুযোগ পান তিনি। একই সময়ে বিশ্বব্যাংকে কাজের প্রস্তাবও আসে। জীবনের সামনে তখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

আবির পেশাগত সুযোগটিকে বেছে নেন। ফলে অক্সফোর্ডে ভর্তি এক বছর পিছিয়ে দেন।

এই সময়টিই হয়ে ওঠে তাঁদের দুজনের অক্সফোর্ডযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক।

আবির সিনায়াতকে অক্সফোর্ডে আবেদন করতে উৎসাহিত করেন। সিনায়াতও প্রস্তুতি নিয়ে অক্সফোর্ডের পাশাপাশি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন।

দুটি জায়গা থেকেই আসে সুযোগ।

ডেনিশ সরকারের বৃত্তিসহ কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন সিনায়াত। তবু শেষ পর্যন্ত বেছে নেন অক্সফোর্ডকে।

কারণটা ছিল একাডেমিক পছন্দের পাশাপাশি ব্যক্তিগত এক সিদ্ধান্তও।

দুজন চেয়েছিলেন একই সময়ে একই শহরে থেকে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু করতে।

সিনায়াতের ভাষায়, তাঁদের অক্সফোর্ডযাত্রাকে কেবল দুজনের একই প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ হিসেবে দেখলে গল্পটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।

এখানে ছিল একে অপরের স্বপ্নকে জায়গা দেওয়া। জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে একে অপরকে সাহায্য করা।

দুজনের স্বপ্ন যেন একে অপরকে আরও দূরে যাওয়ার সাহস দিয়েছিল।

একই শহর, আলাদা পৃথিবী

অক্সফোর্ডে গিয়ে তাঁদের দিন কাটতে থাকে নিজেদের পড়াশোনা ও কাজ নিয়ে।

আবিরের ব্যস্ততা জননীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন ঘিরে। সিনায়াতের পৃথিবী ফার্মাকোলজি ও গবেষণা।

একই শহরে, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে থেকেও তাঁদের প্রতিদিনের কাজের জগৎ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

কিন্তু দিন শেষে সেই আলাদা জগতের গল্পগুলো এসে মিলত একই জায়গায়।

নতুন কোনো বিষয় শেখা। কঠিন কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। পড়াশোনার চাপ। ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

এসব নিয়েই চলত তাঁদের কথোপকথন।

একজনের গবেষণার বিষয় হয়তো অন্যজনের কাছে সব সময় সহজবোধ্য ছিল না। তবু সেই ভিন্নতাই তাঁদের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

সিনায়াত বলেন, তাঁদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো, তাঁরা একে অপরকে নিজেদের পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেননি।

বরং দুজনের আলাদা পথকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েই পাশাপাশি থাকার চেষ্টা করেছেন।

এই জায়গাটিই হয়তো তাঁদের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

একসঙ্গে পথ চলা মানেই একই পথে হাঁটা নয়। কখনো কখনো পাশাপাশি থাকার অর্থ হলো, দুজনকে নিজেদের পছন্দের পথে হাঁটার জায়গা করে দেওয়া।

অক্সফোর্ডের পর সিনায়াতের গবেষণার নতুন অধ্যায়

অক্সফোর্ডের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর সিনায়াতের গবেষণার পথ তাঁকে নিয়ে যায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

দেশে ফিরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে ইউসুফ জামিল বৃত্তি নিয়ে ফার্মাকোলজিতে পিএইচডি করেন।

তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল মানুষের শরীরের কোষে ক্যালসিয়াম কীভাবে সংকেত আদান-প্রদান করে।

বিষয়টি সহজ করে বললে, শরীরের কোষগুলো নিজেদের মধ্যে নানা সংকেতের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। সেই সংকেতব্যবস্থায় ক্যালসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় সমস্যা হলে বিভিন্ন রোগের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

সিনায়াতের গবেষণার লক্ষ্য ছিল এমন নতুন কিছু অণু খুঁজে বের করা, যেগুলো এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ভবিষ্যতে ওষুধ তৈরির গবেষণায় কাজে লাগতে পারে।

একটি কোষের ভেতরে চলতে থাকা অদৃশ্য সংকেতের ভাষা বোঝার চেষ্টা করতে করতে তাঁর গবেষণার পথ এগিয়ে যায় আরও গভীরে।

আবিরের গবেষণায় বাংলাদেশ

অন্যদিকে আবিরের গবেষণার কেন্দ্র বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ কীভাবে রপ্তানি খাত থেকে আরও বেশি আয় করতে পারে, সেটিই তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত।

শুধু তৈরি পোশাকের মতো কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভর না করে কীভাবে নতুন শিল্প ও রপ্তানি খাত তৈরি করা যায়? সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কীভাবে দীর্ঘ মেয়াদে করা সম্ভব?

মূলত এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন আবির।

সিনায়াতের গবেষণার টেবিলে যেখানে একটি কোষের ভেতরের ক্যালসিয়াম সংকেত, আবিরের গবেষণার টেবিলে সেখানে একটি দেশের অর্থনীতি, নীতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন।

দুটি গবেষণার বিষয় যতটা আলাদা, তাঁদের আলোচনার পরিসরও ততটাই বিস্তৃত।

একজন কোষ বোঝেন, অন্যজন দেশ

কোষ, ওষুধ ও জীববিজ্ঞানের নানা প্রক্রিয়া ঘিরে সিনায়াতের গবেষণার জগৎ।

আবির ভাবেন দেশ, অর্থনীতি, নীতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে।

একজন পরীক্ষাগারে বসে একটি কোষের ভেতরের প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করেন। অন্যজন খুঁজে দেখেন কেন কোনো দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার সফল হয়, কোনোটি আবার থেমে যায়।

একজনের গবেষণার যুক্তি অন্যজনের কাছে সব সময় সহজবোধ্য না হলেও পারস্পরিক আলাপ তাঁদের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে।

হয়তো এখানেই তাঁদের সম্পর্কের আরেকটি শক্তি।

একই উত্তর খোঁজা তাঁদের প্রয়োজন হয়নি। প্রয়োজন হয়েছে একে অপরকে প্রশ্ন করার, শুনে নেওয়ার এবং ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের ভাবনাকে দেখার।

সাফল্যকে তাঁরা কীভাবে দেখেন

দুজনের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও নিজেদের অর্জনকে আবির ও সিনায়াত কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখতে চান না।

দুজনই নিজেদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের জন্য কাজে লাগাতে চান।

তরুণদের উদ্দেশে তাঁদের বার্তাও তাই সাফল্যের প্রচলিত সংজ্ঞার বাইরে।

নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রম করতে হবে।

অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে পড়া অবশ্যই বড় অর্জন। কিন্তু তাঁদের কাছে এই পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়।

শিক্ষাটি হলো নিজের জায়গা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া।

প্রত্যাখ্যান এলে আবার চেষ্টা করা।

নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করা।

আর নিজের পথকে অন্যের পথের সঙ্গে তুলনা না করা।

তাঁদের বিশ্বাস, সাফল্য মানে কেবল কোথায় পৌঁছানো, তা নয়। সেই পথে চলতে গিয়ে কী শেখা হলো এবং পরে সেই শিক্ষাকে অন্যদের জন্য কীভাবে কাজে লাগানো গেল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গল্প এখনো চলছে

অক্সফোর্ড তাঁদের গল্পের শেষ গন্তব্য হয়ে থাকেনি।

আবির বর্তমানে অক্সফোর্ড ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টে পিএইচডি গবেষণা করছেন।

অন্যদিকে সিনায়াত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থেকে ক্রনিক কিডনি ডিজিজের একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন।

দুজনের গবেষণার বিষয় এখনো আলাদা। একজনের সামনে মানুষের শরীরের জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া, অন্যজনের সামনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বড় প্রশ্ন।

তবু তাঁদের পথ পাশাপাশি।

২০১৫ সালে যে দুজন জীবনসঙ্গী হিসেবে একসঙ্গে পথচলা শুরু করেছিলেন, তাঁদের সেই পথচলায় একে অপরের স্বপ্নকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা নেই। আছে স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা, কঠিন সময়ে পাশে থাকার মানসিকতা এবং ভিন্ন পথ থেকেও একে অপরকে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

হয়তো এ কারণেই তাঁদের অক্সফোর্ডযাত্রার সবচেয়ে সুন্দর দিকটি কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের মধ্যে আটকে নেই।

সেটি আছে দুজন মানুষের গল্পে, যারা একই জীবনে থেকেও নিজেদের আলাদা পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

একজন কোষের ভেতর খুঁজছেন জীবনের সংকেত। অন্যজন একটি দেশের অর্থনীতির ভেতর খুঁজছেন পরিবর্তনের সূত্র।

দুটি পথ আলাদা।

কিন্তু পাশাপাশি হাঁটার গল্পটি এক।