ট্রাম্পের মেমকয়েনে প্রায় ১০ লাখ বিনিয়োগকারীর ৩.৮১ বিলিয়ন ডলার লোকসান
- প্রকাশঃ ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৩
- / 5
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারিত মেমকয়েনে বিনিয়োগ করে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সম্মিলিতভাবে ৩৮১ কোটি (৩.৮১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার লোকসান গুনেছেন। একই সময়ে ট্রাম্প এই ক্রিপ্টো উদ্যোগ থেকে ৬৩ কোটি ৬০ লাখ (৬৩৬ মিলিয়ন) ডলার আয় করেছেন বলে নতুন এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান ন্যানসেনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন মাসের শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের ‘$ট্রাম্প’ মেমকয়েন কিনেছিলেন এমন প্রায় ১০ লাখ বিনিয়োগকারী বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
ট্রাম্পের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পর এই মূল্যায়ন করেছে ন্যানসেন। বিবরণী অনুযায়ী, এই ক্রিপ্টো উদ্যোগ থেকে ট্রাম্প ৬৩৬ মিলিয়ন ডলার আয় করেছেন। এছাড়া ২০২৫ সালে তার বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে মোট আয় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেমকয়েনের দাম বাড়ুক বা কমুক, ট্রাম্পের আয় অব্যাহত ছিল। কারণ, টোকেনটির প্রতিটি কেনাবেচা থেকে তিনি নির্দিষ্ট অংশ পেতেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি নিয়মিত অনুসারীদের এই টোকেন কেনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ক্রিপ্টোকারেন্সির কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডিজিটাল মুদ্রার বাজারে প্রবেশ করেন। তিনি ও তার ছেলেরা ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ নামে একটি ক্রিপ্টো স্টার্টআপ গড়ে তোলেন এবং ‘ডাব্লিউএলএফআই’ নামে একটি টোকেন চালু করেন, যার মূল্য বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
অভিষেকের তিন দিন আগে ট্রাম্প দ্বিতীয় ক্রিপ্টো উদ্যোগ হিসেবে ‘$ট্রাম্প’ মেমকয়েন চালু করেন। এটি মূলত একটি মেমকয়েন, যার কোনো ব্যবহারিক কার্যকারিতা নেই।
ট্রাম্প সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, “আমরা যা কিছুর পক্ষে লড়েছি, তা উদযাপনের সময় এসেছে: জয়! আমার বিশেষ ট্রাম্প কমিউনিটিতে যোগ দিন। এখনই আপনার $ট্রাম্প টোকেন সংগ্রহ করুন!” পরে এই আহ্বান অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ব্লকচেইনে সংরক্ষিত লেনদেন বিশ্লেষণ করে ন্যানসেন জানিয়েছে, জুন মাসের শেষ পর্যন্ত ‘$ট্রাম্প’ মেমকয়েনে লোকসান গুনেছেন এমন ওয়ালেটের সংখ্যা ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৯০৫টি। অর্থাৎ প্রতি তিনজন ক্রেতার মধ্যে প্রায় দুইজন লোকসানের মুখে পড়েছেন।
এই ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৯০৫টি ওয়ালেটের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ ৩৮১ কোটি ডলার। এদের মধ্যে এমন অনেক বিনিয়োগকারীও রয়েছেন, যারা লোকসানের পরও তাদের টোকেন বিক্রি করেননি। গত শুক্রবার ‘$ট্রাম্প’ মেমকয়েনের দাম ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭৬ ডলার, যা সর্বোচ্চ ৭৫ দশমিক ৩৫ ডলার থেকে প্রায় ৯৭ শতাংশ কম।
লোকসান গুনেছেন এমন বিনিয়োগকারীদের একজন নিকোলাস পিন্টো। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া এই ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী জানান, তিনি ‘$ট্রাম্প’ মেমকয়েনে প্রায় ৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন, যার প্রায় অর্ধেক হারিয়েছেন।
এক সাক্ষাৎকারে পিন্টো বলেন, “জনগণের চোখে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠার পর তিনি ডিজিটাল মুদ্রা চালু করতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। এটি অবিশ্বাস্য। এটি প্রায় একটি আইনি উপায়ের প্রতারণা।”
হোয়াইট হাউস অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের ওপর নীতিগত নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই শিথিল করেছে।
ট্রাম্পের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গর্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানীতে পরিণত করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ মার্কিন জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থেই করা হয়েছে।”
অন্যদিকে ‘$ট্রাম্প’ মেমকয়েন প্রকল্পের কোনো প্রতিনিধি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। ওয়ার্ল্ড লিবার্টির মুখপাত্র ডেভিড ওয়াচম্যান বলেন, ‘ডাব্লিউএলএফআই’ টোকেনের মূল্য কমে যাওয়ার পেছনে বিটকয়েনসহ পুরো ক্রিপ্টো বাজারের দরপতন দায়ী। তার ভাষায়, “বাজারের ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ওয়ার্ল্ড লিবার্টি তাদের গভর্নেন্স টোকেন ডাব্লিউএলএফআই-এর পাশে রয়েছে, যা প্রথম দিন থেকেই তাদের ইকোসিস্টেমে ভূমিকা রাখছে।”
ন্যানসেনের তথ্য অনুযায়ী, ‘$ট্রাম্প’ মেমকয়েন থেকে প্রায় ৫ লাখ ক্রিপ্টো ওয়ালেট মোট ৪০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই লাভের বড় অংশ পেয়েছেন একেবারে শুরুর দিকের ক্রেতারা। বিপরীতে অধিকাংশ সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারী বড় অঙ্কের লোকসান বহন করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ক্রিপ্টো উদ্যোগগুলোর মধ্যে মেমকয়েন ছিল সবচেয়ে লাভজনক উদ্যোগগুলোর একটি।
বার্ষিক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, গত বছর ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল থেকে ট্রাম্পের মোট মুনাফা ছিল ৭৯ কোটি ৯০ লাখ (৭৯৯ মিলিয়ন) ডলার। এর মধ্যে শত শত মিলিয়ন ডলার এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে, যারা ২০২৫ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় অর্ধেক মালিকানা কিনে নেয়। এছাড়া $ডব্লিউএলএফআই টোকেন বিক্রির লভ্যাংশের ৭৫ শতাংশ ট্রাম্পের কোম্পানির জন্য সংরক্ষিত ছিল। ফলে টোকেনটির মূল্য কমে গেলেও তার আয় অব্যাহত ছিল।
ওয়ার্ল্ড লিবার্টির টোকেনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত লোকসানের হিসাব নির্ধারণ করা তুলনামূলক কঠিন। শুরুতে কোম্পানিটি ০.০১৫ অথবা ০.০৫ ডলারে সরাসরি টোকেন বিক্রি করেছিল। যারা ০.০৫ ডলারে কিনেছিলেন, তারা এখনো সামান্য লাভে রয়েছেন। তবে গত সেপ্টেম্বরের আগে টোকেনটি উন্মুক্ত বাজারে লেনদেনের সুযোগ ছিল না।
ন্যানসেন ২৬ হাজার ৬৬৩টি ওয়ালেট বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ লোকসানে রয়েছে। এসব ওয়ালেটের মোট লোকসান ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, বিপরীতে লাভ হয়েছে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে এটি মোট লোকসানের একটি অংশমাত্র, কারণ এক্সচেঞ্জে লেনদেন করা সব ওয়ালেটের তথ্য তাদের কাছে নেই।
বর্তমানে ওয়ার্ল্ড লিবার্টির টোকেনের মূল্য ০.০৫৭ ডলার, যা গত সেপ্টেম্বরের দামের তুলনায় প্রায় ৮২ শতাংশ কম।
ক্রিপ্টো বাজারে বড় ধরনের দরপতন হলেও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে নজরদারি ও আইনি প্রয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও আইনি নীতিবিষয়ক অধ্যাপক স্টিফেন গিলার্স বলেন, ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রতারিত বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে যৌথ মামলা হলে তিনি বিস্মিত হবেন না। যদিও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ঘোষণা করে, তারা মেমকয়েন নিয়ে আর অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করবে না।
মেমকয়েনটির ওয়েবসাইটে আগে থেকেই সতর্ক করে বলা হয়েছিল, এটি বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে তৈরি করা হয়নি। সেখানে উল্লেখ ছিল, “ট্রাম্প মেমস মূলত $ট্রাম্প প্রতীকের প্রতি সমর্থন ও বিশ্বাস প্রকাশের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি কোনো বিনিয়োগের সুযোগ নয়।”
তবে স্টিফেন গিলার্সের মতে, ট্রাম্প দায়িত্ব ছাড়ার পর এই সতর্কবার্তা আইনি দায় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। তিনি বলেন, “ট্রাম্প যখন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ছিলেন, তখন তিনি নিজেই বলতেন মানুষের কল্পনাকে কাজে লাগাতে ভালোবাসেন। এখানেও তিনি সমর্থকদের বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছেন, আর সেই সময় নিজে কোটি কোটি ডলার তুলে নিয়েছেন।”



















