ঢাকা ০৮:৪৮ , Tue, ০৮ Sep ২০২৬
বিশ্বসমাচার
কানাডা

কানাডায় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনে কড়াকড়ি, বাড়ছে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা

আহমেদ জামিল । কানাডা
  • প্রকাশঃ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:২৩
  • / 8
কানাডায় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন ও ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় বাড়ছে কড়াকড়ি ছবি: প্রজন্ম কথা

কানাডা, ৮ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন নিয়ে দেশটিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থায় নতুন করে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভিসা যাচাই, শরণার্থী সুরক্ষার আবেদন এবং কানাডায় বৈধভাবে থাকার যোগ্যতা নির্ধারণে দেশটির কর্তৃপক্ষ আগের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর সংখ্যা এবং নিষ্পত্তি হওয়া আশ্রয় আবেদনে প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়েছে।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ কানাডায় গিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করেন। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশ থেকেই কানাডায় শরণার্থী সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে। মার্ক কার্নি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাব পড়ছে ভিসা আবেদন থেকে শুরু করে কানাডায় প্রবেশের পর আশ্রয় চাওয়া এবং বৈধভাবে থাকার যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও।

বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হয়ে উঠেছে আশ্রয় আবেদন পরিচালনার পদ্ধতি। কানাডার আইন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা এবং ভাষাগত সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে কিছু দালাল ও প্রতিষ্ঠান আশ্রয়ের মামলা তৈরিতে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘ল ফার্ম’ পরিচয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান একই ঘটনা ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির নামে আশ্রয়ের মামলা সাজিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব মামলার জন্য একজনের কাছ থেকে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দালালদের দেওয়া হয়েছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলার।

কিছু বৈধ বাংলাদেশি আইনজীবীর প্রতিষ্ঠানও বিপুলসংখ্যক আশ্রয়ের মামলা নিয়েছে। ফলে প্রতিটি মামলা যথাযথভাবে পরিচালনা ও নজরদারি করাও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এক বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর ঘটনা অন্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ৪৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি ছদ্মনামে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশ থেকে কানাডায় গিয়ে আশ্রয় বা শরণার্থী সুরক্ষার আবেদন করেন। আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তার আইনজীবী বিষয়টি তাকে জানাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

কানাডার নিয়ম অনুযায়ী, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ১৫ দিনের মধ্যে আপিল না করলে তাকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। ওই ব্যক্তিকে চিঠি দিয়ে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির কার্যালয়ে দেখা করতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর তাকে আটক করা হয়। একই সময়ে তার পরিবারকে নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতির জন্য দুই দিন সময় দেওয়া হয়।

এ ধরনের ঘটনায় কানাডায় নতুন জীবন শুরুর প্রত্যাশায় থাকা বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির সর্বশেষ হিসাবে, দেশটি থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশির সংখ্যা ৯৬৮ জন।

তাদের কেউ প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথির অপেক্ষায় রয়েছেন, আবার কারও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করার কাজ চলছে। সব দেশ মিলিয়ে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৪০ হাজার ৮২৭। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৬২২টি মামলা শরণার্থী দাবিসংক্রান্ত।

বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির পরিবর্তন তুলে ধরছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ২২৭ জন বাংলাদেশিকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ২০২০ সালের পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল ৩০৮। অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ২০২০ সালের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কানাডা সামগ্রিকভাবেও ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটি থেকে ১৭ হাজার ৩৯৭ জন বিদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ১৬০ জনে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ১০ হাজার ৬০৭ জনকে।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৪০০ জন এমন বিদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, যাদের কানাডায় থাকার আইনগত অনুমতি নেই অথবা যারা দেশটিতে থাকার জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন। এই কার্যক্রম জোরদারে সরকার ৩০ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।

বাংলাদেশিদের শরণার্থী দাবির পরিসংখ্যানেও পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। কানাডার অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট ১৭ হাজার ২৩৯টি শরণার্থী দাবি শরণার্থী সুরক্ষা বিভাগে পাঠানো হয়। ওই বছর নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ৭৫০টি গ্রহণ এবং ১৭৫টি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

২০২৫ সালে নতুন দাবি কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭০টিতে। ওই বছর ১ হাজার ২০৩টি দাবি গ্রহণ করা হলেও ৮৬৭টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৫৪৭টি নতুন দাবি জমা পড়ে। একই সময়ে ২৪৮টি দাবি গ্রহণ এবং ২৯৩টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৯ হাজার ৯৭২টি দাবি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত পাওয়া বাংলাদেশিদের দাবির গ্রহণযোগ্যতার হারও কমেছে। ২০২৪ সালে সিদ্ধান্ত পাওয়া বাংলাদেশিদের প্রায় ৮১ শতাংশের দাবি গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে এই হার কমে প্রায় ৫৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে তা আরও কমে প্রায় ৪৬ শতাংশ হয়েছে।

কানাডার আশ্রয় ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চে আইনে পরিণত হওয়া সি-১২ বিলের মাধ্যমে আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত যুক্ত হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২৪ জুন ২০২০-এর পর প্রথমবার কানাডায় প্রবেশের এক বছরের বেশি সময় পরে কেউ আশ্রয়ের আবেদন করলে এবং সেই আবেদন ৩ জুন ২০২৫ বা তার পর করা হলে, সেটি সাধারণ নিয়মে অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ডে পাঠানো হবে না।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্থলসীমান্তের নির্ধারিত প্রবেশপথের বাইরে কানাডায় প্রবেশের ১৪ দিন বা তার বেশি সময় পর আশ্রয়ের আবেদন করলেও তা কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়বে।

এর ফলে কানাডায় প্রবেশের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে আশ্রয় চাওয়ার সুযোগসহ আগের কিছু ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। কানাডার সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকেই যেসব দেশ থেকে ভিসার অপব্যবহার, ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা কানাডায় পৌঁছে আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতা বেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেসব দেশের আবেদন কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।

এই তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়ার নামও রয়েছে। নতুন ঝুঁকি সূচক, গোয়েন্দা তথ্য এবং কর্মকর্তাদের বাড়তি নির্দেশনার কারণে এসব দেশের ভিসা আবেদন আগের তুলনায় বেশি যাচাই করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে কানাডায় আসা ১৭৫ জন পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশিদের ৪৫টি ভ্রমণ ভিসা অনুমোদন করা হয়েছিল। সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম হলেও, বিশ্বকাপের মতো সাময়িক ভ্রমণের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ কানাডায় স্থায়ী হওয়ার পথ খুঁজেছেন বলে আশ্রয় আবেদনের পরিসংখ্যান থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে বাংলাদেশিদের আবেদন নিয়ে কানাডার কর্তৃপক্ষের যাচাই আরও কঠোর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দেওয়া, একই ঘটনা ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির নামে মামলা সাজানো, রাজনৈতিক পরিচয় দেখানো কিংবা ভিত্তিহীন আশ্রয়ের দাবি করে কানাডায় স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়তে পারে বৈধভাবে কানাডায় যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের ওপরও। তাদের ভিসা ও আশ্রয় আবেদনও বাড়তি যাচাইয়ের মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

❤️
👏
🙂
😞

কানাডায় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনে কড়াকড়ি, বাড়ছে ফেরত পাঠানোর সংখ্যা

প্রকাশঃ ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:২৩

কানাডা, ৮ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন নিয়ে দেশটিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থায় নতুন করে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভিসা যাচাই, শরণার্থী সুরক্ষার আবেদন এবং কানাডায় বৈধভাবে থাকার যোগ্যতা নির্ধারণে দেশটির কর্তৃপক্ষ আগের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর সংখ্যা এবং নিষ্পত্তি হওয়া আশ্রয় আবেদনে প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়েছে।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ কানাডায় গিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করেন। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশ থেকেই কানাডায় শরণার্থী সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে। মার্ক কার্নি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাব পড়ছে ভিসা আবেদন থেকে শুরু করে কানাডায় প্রবেশের পর আশ্রয় চাওয়া এবং বৈধভাবে থাকার যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও।

বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হয়ে উঠেছে আশ্রয় আবেদন পরিচালনার পদ্ধতি। কানাডার আইন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা এবং ভাষাগত সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে কিছু দালাল ও প্রতিষ্ঠান আশ্রয়ের মামলা তৈরিতে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘ল ফার্ম’ পরিচয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান একই ঘটনা ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির নামে আশ্রয়ের মামলা সাজিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব মামলার জন্য একজনের কাছ থেকে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দালালদের দেওয়া হয়েছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলার।

কিছু বৈধ বাংলাদেশি আইনজীবীর প্রতিষ্ঠানও বিপুলসংখ্যক আশ্রয়ের মামলা নিয়েছে। ফলে প্রতিটি মামলা যথাযথভাবে পরিচালনা ও নজরদারি করাও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এক বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর ঘটনা অন্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ৪৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি ছদ্মনামে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশ থেকে কানাডায় গিয়ে আশ্রয় বা শরণার্থী সুরক্ষার আবেদন করেন। আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তার আইনজীবী বিষয়টি তাকে জানাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

কানাডার নিয়ম অনুযায়ী, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ১৫ দিনের মধ্যে আপিল না করলে তাকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। ওই ব্যক্তিকে চিঠি দিয়ে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির কার্যালয়ে দেখা করতে বলা হয়। সেখানে যাওয়ার পর তাকে আটক করা হয়। একই সময়ে তার পরিবারকে নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতির জন্য দুই দিন সময় দেওয়া হয়।

এ ধরনের ঘটনায় কানাডায় নতুন জীবন শুরুর প্রত্যাশায় থাকা বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির সর্বশেষ হিসাবে, দেশটি থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকদের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশির সংখ্যা ৯৬৮ জন।

তাদের কেউ প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথির অপেক্ষায় রয়েছেন, আবার কারও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করার কাজ চলছে। সব দেশ মিলিয়ে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা ৪০ হাজার ৮২৭। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৬২২টি মামলা শরণার্থী দাবিসংক্রান্ত।

বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির পরিবর্তন তুলে ধরছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ২২৭ জন বাংলাদেশিকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ২০২০ সালের পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল ৩০৮। অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ২০২০ সালের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কানাডা সামগ্রিকভাবেও ফেরত পাঠানোর কার্যক্রম বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটি থেকে ১৭ হাজার ৩৯৭ জন বিদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ১৬০ জনে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ১০ হাজার ৬০৭ জনকে।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৪০০ জন এমন বিদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, যাদের কানাডায় থাকার আইনগত অনুমতি নেই অথবা যারা দেশটিতে থাকার জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন। এই কার্যক্রম জোরদারে সরকার ৩০ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।

বাংলাদেশিদের শরণার্থী দাবির পরিসংখ্যানেও পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। কানাডার অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট ১৭ হাজার ২৩৯টি শরণার্থী দাবি শরণার্থী সুরক্ষা বিভাগে পাঠানো হয়। ওই বছর নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ৭৫০টি গ্রহণ এবং ১৭৫টি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

২০২৫ সালে নতুন দাবি কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭০টিতে। ওই বছর ১ হাজার ২০৩টি দাবি গ্রহণ করা হলেও ৮৬৭টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৫৪৭টি নতুন দাবি জমা পড়ে। একই সময়ে ২৪৮টি দাবি গ্রহণ এবং ২৯৩টি প্রত্যাখ্যান করা হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৯ হাজার ৯৭২টি দাবি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত পাওয়া বাংলাদেশিদের দাবির গ্রহণযোগ্যতার হারও কমেছে। ২০২৪ সালে সিদ্ধান্ত পাওয়া বাংলাদেশিদের প্রায় ৮১ শতাংশের দাবি গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০২৫ সালে এই হার কমে প্রায় ৫৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে তা আরও কমে প্রায় ৪৬ শতাংশ হয়েছে।

কানাডার আশ্রয় ব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চে আইনে পরিণত হওয়া সি-১২ বিলের মাধ্যমে আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত যুক্ত হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২৪ জুন ২০২০-এর পর প্রথমবার কানাডায় প্রবেশের এক বছরের বেশি সময় পরে কেউ আশ্রয়ের আবেদন করলে এবং সেই আবেদন ৩ জুন ২০২৫ বা তার পর করা হলে, সেটি সাধারণ নিয়মে অভিবাসন ও শরণার্থী বোর্ডে পাঠানো হবে না।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্থলসীমান্তের নির্ধারিত প্রবেশপথের বাইরে কানাডায় প্রবেশের ১৪ দিন বা তার বেশি সময় পর আশ্রয়ের আবেদন করলেও তা কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়বে।

এর ফলে কানাডায় প্রবেশের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে আশ্রয় চাওয়ার সুযোগসহ আগের কিছু ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। কানাডার সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকেই যেসব দেশ থেকে ভিসার অপব্যবহার, ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা কানাডায় পৌঁছে আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতা বেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেসব দেশের আবেদন কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।

এই তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়ার নামও রয়েছে। নতুন ঝুঁকি সূচক, গোয়েন্দা তথ্য এবং কর্মকর্তাদের বাড়তি নির্দেশনার কারণে এসব দেশের ভিসা আবেদন আগের তুলনায় বেশি যাচাই করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে কানাডায় আসা ১৭৫ জন পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। তাদের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশিদের ৪৫টি ভ্রমণ ভিসা অনুমোদন করা হয়েছিল। সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম হলেও, বিশ্বকাপের মতো সাময়িক ভ্রমণের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ কানাডায় স্থায়ী হওয়ার পথ খুঁজেছেন বলে আশ্রয় আবেদনের পরিসংখ্যান থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

ফলে বাংলাদেশিদের আবেদন নিয়ে কানাডার কর্তৃপক্ষের যাচাই আরও কঠোর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দেওয়া, একই ঘটনা ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির নামে মামলা সাজানো, রাজনৈতিক পরিচয় দেখানো কিংবা ভিত্তিহীন আশ্রয়ের দাবি করে কানাডায় স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়তে পারে বৈধভাবে কানাডায় যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের ওপরও। তাদের ভিসা ও আশ্রয় আবেদনও বাড়তি যাচাইয়ের মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।