ঢাকা কলেজ থেকে এমআইটি, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গবেষণায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সেলিম শাহরিয়ার
- প্রকাশঃ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০৩
- / 5
শিকাগো, ১৫ সেপ্টেম্বর (প্রজন্ম কথা) – পাবনায় স্কুলজীবন, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক, এরপর যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি। সেখান থেকে একের পর এক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর এখন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম এম. শাহরিয়ার। পদার্থবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণাকর্মের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি।
১৯৬৪ সালে জন্ম নেওয়া সেলিম শাহরিয়ারের শৈশব ও স্কুলজীবন কেটেছে পাবনায়। পরে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। এমআইটিতে পড়াশোনার সময় একাধিক বিষয়ে একসঙ্গে একাডেমিক সাফল্য অর্জন করেন।
১৯৮৬ সালে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সায়েন্স এবং পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন শাহরিয়ার। এরপর ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার সায়েন্সে ১৯৮৯ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৯২ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল তিন স্তরবিশিষ্ট পরমাণুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও এর ব্যবহার।
পিএইচডি শেষ করার পরও এমআইটির সঙ্গে তাঁর গবেষণার সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। রিসার্চ ল্যাবরেটরি অব ইলেকট্রনিকসে পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করার পর ১৯৯২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত গবেষণা বিজ্ঞানী এবং ২০০১ সালে প্রধান গবেষণা বিজ্ঞানী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন শাহরিয়ার। ২০০৮ সাল থেকে সেখানে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বর্তমানে তিনি বৈদ্যুতিক ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। একই সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ফলিত পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গেও তাঁর কাজের সম্পর্ক রয়েছে।
সেলিম শাহরিয়ারের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। তিনি লিগো বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার সদস্য এবং এই আন্তর্জাতিক গবেষণা উদ্যোগের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। লিগোর অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র ব্যবহার করে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণ ও এর সংবেদনশীলতা বাড়ানোর প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর গবেষণা রয়েছে।
২০১৬ সালে লিগো সহযোগিতার বিজ্ঞানীরা প্রথমবার মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার ঘোষণা দেন। দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ থেকে উৎপন্ন ওই সংকেত শনাক্তের মধ্য দিয়ে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের নতুন যুগ শুরু হয়। ঐতিহাসিক ওই গবেষণাপত্রের সহলেখকদের তালিকায় সেলিম শাহরিয়ারের নামও রয়েছে। নর্থওয়েস্টার্নের গবেষণা তালিকাতেও তাঁর নাম মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনায় পাওয়া যায়।
তাঁর গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকারীর সংবেদনশীলতা বাড়ানো। হোয়াইট লাইট ক্যাভিটি বা আলোকভিত্তিক বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইন্টারফেরোমিটারের সংবেদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা গবেষণা করেছেন। এই গবেষণার লক্ষ্য আরও দুর্বল মহাকর্ষীয় তরঙ্গ সংকেত শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানো।
শাহরিয়ারের গবেষণার পরিধি মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরমাণু ও ফোটনিক প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম যোগাযোগ, পরমাণু ঘড়ি, পরমাণু ইন্টারফেরোমেট্রি, আলোকভিত্তিক তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ এবং অতি সংবেদনশীল পরিমাপ প্রযুক্তিও তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণার মধ্যেও অত্যন্ত নির্ভুল পরিমাপ ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির বিষয় রয়েছে। ২০২৬ সালে তাঁর সহলেখকত্বে প্রকাশিত একটি গবেষণায় লেজারে ন্যূনতম পরিমাপযোগ্য কম্পাঙ্ক পরিবর্তনের সীমা নিয়ে নতুন বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
পরমাণু ইন্টারফেরোমেট্রি নিয়েও তাঁর গবেষণায় অত্যন্ত সংবেদনশীল ত্বরণ ও ঘূর্ণন পরিমাপের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এই ধরনের প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ব্যবহার অত্যন্ত নির্ভুল নেভিগেশন ও বৈজ্ঞানিক পরিমাপের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা তথ্যেও শাহরিয়ারের নাম কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, লেজার, পরমাণু ইন্টারফেরোমিটার এবং মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণসংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
সেলিম শাহরিয়ারের পথচলার বিশেষ দিক হলো এর শুরু বাংলাদেশের একটি জেলা শহর থেকে। পাবনায় স্কুলজীবন শেষ করে ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়ার পর তিনি পৌঁছান এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানে। সেখানে একই সঙ্গে প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে পরে গবেষণায় প্রবেশ করেন।
এখন নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মের গবেষকদের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁর গবেষণার বিষয়গুলো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এমন কিছু প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত, যেখানে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, আলোকবিজ্ঞান ও মহাকর্ষের মতো মৌলিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
পাবনা থেকে শুরু হওয়া সেই শিক্ষাযাত্রা তাই ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। স্থানীয় পর্যায়ের স্কুল ও কলেজ থেকে শুরু করেও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় যুক্ত হওয়া সম্ভব, সেলিম শাহরিয়ারের দীর্ঘ একাডেমিক পথচলা তার একটি উদাহরণ।
























