২৮ বছর ধরে বিশ্ব ঘুরে ৩০ হাজার মাইল হাঁটা, এবার বাড়ি ফেরার পথে কার্ল বুশবি
- প্রকাশঃ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪
- / 16
হাল, ১৩ সেপ্টেম্বর (প্রজন্ম কথা) – প্রায় তিন দশক আগে যুক্তরাজ্যের হাল শহরের বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন কার্ল বুশবি। লক্ষ্য ছিল কোনো যানবাহন ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে আবার নিজের শহরে ফেরা। ২৮ বছর ধরে চলা সেই অভিযানে ৩০ হাজার মাইলের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে এখন তিনি ফিরছেন নিজের বাড়ির দিকে। তবে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে সামনে রয়েছে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার কঠিন পরীক্ষা।
১৯৯৮ সালের ১ অক্টোবর ২৯ বছর বয়সে বুশবি তাঁর দীর্ঘ অভিযাত্রা শুরু করেন। এর আগে তিন বছর ধরে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেন তিনি। শুরুতেই নিজের জন্য দুটি কঠোর নিয়ম ঠিক করেছিলেন। যাত্রাপথে কোনো ধরনের যানবাহন ব্যবহার করা যাবে না এবং অভিযান শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাজ্যে ফেরা যাবে না।

সাটন পার্ক এস্টেটে শৈশবের বাড়ির সামনে মা ও দাদির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিশেষভাবে তৈরি একটি ট্রলি ঠেলে যাত্রা শুরু করেন বুশবি। ট্রলিটির নাম দেন ‘দ্য বিস্ট’। এতে ছিল তাঁবু, ঘুমানোর সরঞ্জাম, মানচিত্র, কফি ও দীর্ঘ পথ চলার প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
হিথরো থেকে উড়োজাহাজে চিলির দক্ষিণ প্রান্তে পৌঁছে সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর মূল পদযাত্রা। প্যাটাগোনিয়া পেরিয়ে আন্দিজের প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাশ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে পৌঁছান তিনি। এরপর কানাডা ও আলাস্কা হয়ে বেরিং প্রণালি পাড়ি দিয়ে প্রবেশ করেন রাশিয়ায়।
রাশিয়া থেকে মঙ্গোলিয়া, চীন ও কাজাখস্তান হয়ে সিল্ক রোড ধরে এগিয়ে যান বুশবি। পরে ইরানের সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর সামনে নতুন বাধা তৈরি হয়। বিকল্প পথ হিসেবে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিতে হয় তাঁকে। এরপর আজারবাইজান, জর্জিয়া ও তুরস্ক হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেন তিনি।
প্রথমে বুশবি ভেবেছিলেন, পুরো অভিযান শেষ করতে প্রায় ১২ বছর সময় লাগবে। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী যাত্রা এগোয়নি। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে তাঁর অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা তিন বছরের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পরে করোনাভাইরাস মহামারিতে আরও প্রায় তিন বছর বিলম্ব হয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ভিসা জটিলতা যোগ হয়ে যাত্রার সময় আরও দীর্ঘ হয়েছে।

রাশিয়ার ভিসা পাওয়ার জন্য এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে রুশ দূতাবাস পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার মাইল ঘুরে যেতে হয়েছিল তাঁকে। শেষ পর্যন্ত সেই ভিসা পান তিনি।
অভিযানের পথে বহুবার জীবনঝুঁকির মুখেও পড়েছেন বুশবি। কারাগারে থাকতে হয়েছে, ডাকাতির শিকার হয়েছেন এবং প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম ভূখণ্ড মোকাবিলা করেছেন। আর্কটিক অঞ্চলে মেরু ভালুকের মুখোমুখিও হয়েছেন।
তাঁর সবচেয়ে আলোচিত অভিযানের একটি ছিল আলাস্কা ও রাশিয়ার মধ্যকার বেরিং প্রণালি অতিক্রম। প্রায় ৫৩ মাইল দীর্ঘ বরফাচ্ছন্ন জলপথে ফরাসি অভিযাত্রী দিমিত্রি কিফারের সঙ্গে তাঁকে ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কাটতে হয়েছে। রাতে বরফের চাঁইয়ের ওপর তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রামও নিয়েছেন তাঁরা। রাশিয়ার ভূখণ্ডে পৌঁছানোর পর অবশ্য বিশ্রামের সুযোগ মেলেনি। তাঁদের সরাসরি একটি রুশ আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়।
ইরানের সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দেওয়াও ছিল অভিযানের অন্যতম কঠিন অধ্যায়। অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্সওয়েল এবং আজারবাইজানের দুই জাতীয় সাঁতারুর সঙ্গে প্রায় ২০০ মাইল সাঁতরে সাগরটি পাড়ি দেন বুশবি। প্রতিদিন তিন ঘণ্টার দুটি পর্বে সাঁতার কাটতেন তাঁরা। রাতে সহায়তাকারী নৌযানে বিশ্রাম ও ঘুমাতেন। পুরো যাত্রায় সময় লাগে এক মাসের বেশি।
২০০০ সালে পানামা ও কলম্বিয়ার মধ্যকার দারিয়েন গ্যাপ অতিক্রমের সময়ও বড় ঝুঁকি নিতে হয় তাঁকে। তখন অঞ্চলটি গৃহযুদ্ধ ও সশস্ত্র সহিংসতায় আক্রান্ত ছিল। বুশবির ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের আশঙ্কা থাকায় তিনি পুরো অভিযানকে সামরিক অভিযানের মতো করে প্রস্তুত করেছিলেন। প্রথম ২০০ মাইল ছদ্মবেশে অতিক্রম করার পর নদীপথে চার দিন ভেসে যান এবং প্রায় তিন সপ্তাহ জঙ্গলে আত্মগোপন ও পালানোর কৌশল অনুশীলন করেন। পরে পানামায় কয়েক সপ্তাহ পুলিশ হেফাজতেও থাকতে হয় তাঁকে।
দীর্ঘ অভিযানে একবার নিজের বাম কব্জির ধমনী কেটে ফেলেছিলেন বুশবি। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণের মধ্যেও নিজেই ক্ষত সেলাই করেন। আরেকবার আর্কটিক অঞ্চলে তুষারের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ে ঘুমিয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল তাঁর। ঘুমিয়ে পড়লে মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল বুঝতে পেরে শেষ মুহূর্তে নিজেকে জাগিয়ে রাখেন তিনি।

শৈশব থেকেই বুশবির জীবন ছিল অন্যরকম। তিনি ছিলেন পাতলা গড়নের এবং ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত। পাখি দেখা ও প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। স্কুলে নিপীড়নের শিকারও হয়েছেন। তাঁর বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিশেষ বাহিনীর সদস্য। ১৭ বছর বয়সে পাঁচবার চেষ্টা করার পর প্যারাট্রুপার হিসেবে যোগ দেন বুশবি।
এখন ৫৭ বছর বয়সী এই অভিযাত্রী প্রতিদিন অন্তত ২০ মাইল হাঁটছেন। বেলজিয়ামের সেন্ট ভিথ থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে ক্যালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে এখনও রয়েছে প্রায় ১৫০ পাউন্ড ওজনের ‘দ্য বিস্ট’। সকালের খাবার হিসেবে এক কাপ কফি ও এক বাটি দই খেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটেন। রাতে সুযোগমতো ছোট তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করেন।
২৮ বছরের অভিযানের প্রভাব তাঁর শরীরেও পড়েছে। হারিয়েছেন বহু পায়ের নখ, পেটের পেশি আগের মতো নেই এবং হাঁটুতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবু এখন তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য একটি, যাত্রাটি শেষ করা।
এই অভিযানের জন্য ব্যক্তিগত জীবনেও বড় মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকে। যাত্রাপথে দুবার গভীর সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বুশবি। কিন্তু ভিসা জটিলতা ও মহামারির কারণে দুটো সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত টেকেনি।
বাড়ি ছাড়ার সময় তাঁর ছেলে অ্যালেক্সের বয়স ছিল সাত বছর। এখন অ্যালেক্সের ১১ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে, যার সঙ্গে বুশবির এখনও দেখা হয়নি। গত ১৩ বছর ধরে পরিবারের কারও সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি তাঁর। তবে বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগ রয়েছে।
বুশবির মা অ্যাঞ্জেলা বলেন, ছেলে বাড়ি ফিরতে এতটা সময় নেবে, তা তিনি কখনো ভাবেননি। তবে যাত্রা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ফিরবেন না, বুশবির এই সিদ্ধান্ত তিনি বুঝতেন। ছেলে হালে পৌঁছালে বাড়ির বাগানের ফটকে অপেক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

এখন বুশবির সামনে শেষ বড় প্রাকৃতিক বাধা ইংলিশ চ্যানেল। ইউরোটানেলের ভেতর দিয়ে হাঁটার পরিকল্পনা থাকলেও সেই সুযোগ না থাকায় ফ্রান্স থেকে সাঁতরে চ্যানেল পাড়ি দিতে হবে তাঁকে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্রান্স থেকে ইংলিশ চ্যানেলে সাঁতার কাটা নিষিদ্ধ হলেও বিশেষ অনুমতি ও সহায়তাকারী নৌকার ব্যবস্থা করে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সাঁতারই তাঁর বিশ্বভ্রমণ শেষ করার অন্যতম শেষ বাধা।
বুশবির সঙ্গে চ্যানেল পাড়ি দেবেন দীর্ঘপথের আরেক অভিযাত্রী ও তাঁর বন্ধু অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্সওয়েল। দীর্ঘদিনের হাঁটার কারণে প্রশিক্ষণের জন্য সময়ও খুব বেশি নেই বলে জানিয়েছেন বুশবি।
চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার পর হাল পর্যন্ত বাকি থাকবে তাঁর শেষ পথ। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর নিজ শহরে পৌঁছানোর আশা করছেন তিনি।
১৯৯৮ সালে যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন বুশবি, তখন টনি ব্লেয়ার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সময়টা কাটাচ্ছিলেন। গুড ফ্রাইডে চুক্তি সদ্য স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই সময় থেকে প্রায় তিন দশক পর নিজের শহরে ফেরার পথে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

দীর্ঘ অভিযানের শেষে নতুন জীবন নিয়েও তাঁর সামনে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো সঞ্চয় নেই, পেনশন নেই, পরবর্তী জীবনের স্পষ্ট পরিকল্পনাও নেই। কিন্তু এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই।
বুশবির ভাষায়, তিনি কিছুই বদলাতে চান না। প্রায় ৩০ বছর ধরে চলা এই অভিযানই তাঁর কাজ, জীবন ও উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। এখন তিনি বাড়ির কাছাকাছি।





























