গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ
বিশ্বে মহামারি বা বিপর্যয় নেমে আসলে নিরাপদ থাকবে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড
- প্রকাশঃ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৫
- / 18
সিডনি, ১৩ সেপ্টেম্বর (প্রজন্ম কথা) – পারমাণবিক যুদ্ধ, ভয়াবহ মহামারি, বড় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, গ্রহাণুর আঘাত কিংবা ব্যাপক সাইবার হামলার মতো বৈশ্বিক মহাবিপর্যয়ে কোন অঞ্চল তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল হতে পারে, তা নিয়ে করা এক গবেষণায় অস্ট্রেলিয়াকে সবচেয়ে বিস্তৃত পরিসরে সহনশীল দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিউজিল্যান্ডও বিভিন্ন ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
‘নো প্লেস টু হাইড? রিজিওনাল রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি টু গ্লোবাল ক্যাটাস্ট্রফিক রিস্ক’ শিরোনামের গবেষণাটি বৈশ্বিক বিপর্যয় মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক সহনশীলতা নিয়ে বিদ্যমান গবেষণা ও তথ্য পর্যালোচনা করেছে। গবেষণায় আটজন গবেষক অংশ নিয়েছেন। তাঁরা হলেন ফ্লোরিয়ান উলরিশ ইয়ান, ম্যাক্সিমিলিয়ান রসলার, লুক কেম্প, মাইক ক্যাসিডি, জ্যাকারি কালেনবোর্ন, হুয়ান বার্তোলোমে গার্সিয়া মার্তিনেজ, লারা মানি এবং ম্যাট বয়েড।
গবেষণায় পারমাণবিক যুদ্ধ, পৃথিবীর কাছাকাছি গ্রহাণুর আঘাত, বড় মাত্রার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ব্যাপক সাইবার হামলা, উচ্চমাত্রার তড়িৎচুম্বকীয় পালস, ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় এবং মহামারিসহ বিভিন্ন ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়েছে। গবেষকদের মূল সিদ্ধান্ত হলো, কোনো একটি দেশই সব ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সহনশীল নয়।
তবে পর্যালোচনা করা গবেষণাগুলোর ভিত্তিতে অস্ট্রেলিয়া সবচেয়ে বেশি ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সহনশীলতার বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছে। এর পেছনে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা, কার্যকর শাসনব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিশ্বের প্রধান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রগুলোর অনেক দূরে এবং বিশাল কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে খাদ্য উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। গবেষণায় খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতাকে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের পর টিকে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় দেশটির শিল্পভিত্তি ছোট এবং সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্পের মতো স্থানীয় ঝুঁকিও রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বড় কোনো বৈশ্বিক বিপর্যয়ের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিচ্ছিন্ন দেশগুলোরও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই একটি দেশের নিজস্ব খাদ্য ও সম্পদ উৎপাদনের সক্ষমতার পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকদের মতে, একটি দেশের সহনশীলতার ক্ষেত্রে চারটি বিষয় বারবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এগুলো হলো ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা, উন্নত ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা এবং বিকেন্দ্রীকরণ। এসব বৈশিষ্ট্য একক কোনো বিপর্যয়ের প্রভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তবে বড় শহরগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি আলাদা। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো পানি, খাদ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও পরিবহনের মতো আন্তঃনির্ভর ব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কোনো বড় বিপর্যয়ে এসব ব্যবস্থার একটি অংশ অচল হয়ে গেলে তার প্রভাব দ্রুত অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বড় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা পারমাণবিক যুদ্ধের মতো ঘটনায় বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ছাই ও কণা ছড়িয়ে সূর্যালোক কমে যেতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্য সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। একইভাবে বড় সাইবার হামলা বা ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মহামারির ক্ষেত্রেও জনবসতির ঘনত্ব গুরুত্বপূর্ণ। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিপরীতে অপেক্ষাকৃত কম ঘনবসতিপূর্ণ এবং খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম অঞ্চল কিছু ক্ষেত্রে বেশি স্থিতিশীল থাকতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সংকট মোকাবিলায় সামাজিক সংহতি ও স্থানীয় পর্যায়ের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের সময় স্থানীয় মানুষ একে অপরকে সহায়তা করতে পারলে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
তবে গবেষণাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো, অস্ট্রেলিয়াকেও কোনো ধরনের বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যাবে না। গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা বাড়াতে খাদ্য নিরাপত্তা, দুর্যোগ প্রস্তুতি, জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
গবেষণাটি ২০২৬ সালের ২৭ মার্চ প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ৩ জুলাই সর্বশেষ সংস্করণ হালনাগাদ করা হয়েছে। এটি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বৈশ্বিক বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে একটি বিস্তৃত গবেষণা পর্যালোচনা।
ফলে অস্ট্রেলিয়াকে বৈশ্বিক মহাবিপর্যয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বিস্তৃত সহনশীলতা থাকা দেশগুলোর একটি বলা গেলেও গবেষণাটির বার্তা আরও সতর্ক। কোনো দেশই সব ধরনের বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে নিরাপদ নয়। দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার সক্ষমতা নির্ভর করবে খাদ্য ও সম্পদের স্বনির্ভরতা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংহতি, অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর।




























