অস্ট্রেলিয়ার নতুন অভিবাসন নীতিতে চাপে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীরা
- প্রকাশঃ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪২
- / 13
ক্যানবেরা, ১৮ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন নিয়মে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে তাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে শিক্ষার্থী ভিসার সঙ্গে যুক্ত করে অস্ট্রেলিয়ায় নিতে পারবেন না। এর ফলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের পরিবারসহ উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে পিএইচডিসহ নির্দিষ্ট কোর্স এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও আসিয়ানভুক্ত দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বৃহস্পতিবার ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সরকারের লক্ষ্য চলতি অর্থবছরে নিট বিদেশি অভিবাসন ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা সরাসরি কমানোর পরিবর্তে অস্থায়ী ভিসা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে এই লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা করছে সরকার। গত অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৪২৭টি শিক্ষার্থী ভিসা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৫ হাজার ৯৯১টি ছিল নির্ভরশীল বা পরিবারের সদস্যদের জন্য।
নতুন নিয়মে প্যাসিফিক ও আসিয়ানভুক্ত দেশের নাগরিক এবং পিএইচডিসহ নির্দিষ্ট কোর্সের শিক্ষার্থীরা পরিবারের সদস্যদের নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশ আসিয়ানের সদস্য না হওয়ায় দেশভিত্তিক এই ছাড় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে পিএইচডিসহ ব্যতিক্রমের আওতায় থাকা কোর্সে ভর্তি যোগ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে পারেন। বর্তমানে যেসব আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন, নতুন নিয়মে তাদের পরিবার আলাদা করা হবে না।
পরিবারের ভিসার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কোর্স পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ বাড়ানো হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় কোর্স পরিবর্তন করতে হলে নতুন শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন করতে হবে। একটি কোর্স শেষ করার পর পরবর্তী কোর্সটি উচ্চতর যোগ্যতার স্তরের হতে হবে। যেমন স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তরে যাওয়া সম্ভব হবে। একই বা নিচের স্তরের বিভিন্ন কোর্সে বারবার ভর্তি হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান দীর্ঘ করার প্রবণতা বন্ধ করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
ভিজিটর ভিসার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সাধারণভাবে এসব ভিসায় ‘আর অবস্থান করা যাবে না’ ধরনের শর্ত যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ভিজিটর ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে দেশটির ভেতর থেকে অন্য ভিসার আবেদন করে ব্রিজিং ভিসার মাধ্যমে অবস্থান দীর্ঘ করার সুযোগ সীমিত হবে। একই সঙ্গে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যারা দেশটিতে থেকে যান, তাদের শনাক্ত ও ফেরত পাঠানোর সক্ষমতা বাড়াতে অতিরিক্ত জনবল ও আটককেন্দ্রের ব্যবস্থা করার কথাও সরকার জানিয়েছে।
তবে দক্ষ কর্মীদের পরিবারের ক্ষেত্রে একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে না। টনি বার্ক জানিয়েছেন, চিকিৎসক ও নির্মাণকর্মীদের প্রায় অর্ধেক এবং নার্স ও বয়স্কদের সেবায় কর্মরত ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী আকর্ষণ এবং শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণের কারণে তাদের পরিবারের সুযোগ বহাল রাখার অবস্থান নিয়েছে সরকার।
নতুন নীতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের প্রতিনিধিরাও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, বিদেশে তিন থেকে চার বছর পড়াশোনার পরিকল্পনা করা অনেক শিক্ষার্থীর কাছে জীবনসঙ্গী ও পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এই সুযোগ সীমিত হলে অস্ট্রেলিয়া কিছু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হারাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় মাস্টার্সে পড়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেছেন, বিবাহিত শিক্ষার্থীর জন্য কয়েক বছর পরিবার থেকে আলাদা থাকা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও শিক্ষার খরচের পাশাপাশি পরিবারকে সঙ্গে নেওয়া যাবে কি না, বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্তে সেটিও বিবেচনা করেন অনেক শিক্ষার্থী।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও বলছেন, নতুন নিয়মের ফলে পরিবারসহ উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বিকল্প দেশ বিবেচনা করতে পারেন। তবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসায় যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে না। মূল পরিবর্তনটি হচ্ছে, অধিকাংশ সাধারণ শিক্ষার্থী নতুন করে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ হারাবেন।
সরকারের এই পদক্ষেপের বৃহত্তর লক্ষ্য অস্থায়ী ভিসা ব্যবস্থায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং নিট বিদেশি অভিবাসন নির্ধারিত লক্ষ্যের মধ্যে রাখা। শিক্ষার্থী ভিসা ছাড়াও ভিসা পরিবর্তন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থান এবং সুরক্ষা ভিসার আবেদনকে কেন্দ্র করে অবস্থান দীর্ঘ করার প্রবণতা ঠেকাতে একাধিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
ফলে নতুন নীতিতে বাংলাদেশিদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হচ্ছে না, তবে পরিবারসহ পড়াশোনার পরিকল্পনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য শর্ত কঠিন হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পিএইচডি বা ব্যতিক্রমের আওতায় থাকা নির্দিষ্ট কোর্সে ভর্তি হবেন না, তাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ নতুন নিয়মে উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হবে।





























