টাইমস স্কয়ারে বাংলার বসন্ত, বহুজাতিক নিউইয়র্কে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিস্তার
- প্রকাশঃ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০০
- / 5
নিউইয়র্ক, ১৯ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – চারপাশে বহুজাতিক মানুষের ভিড়, মাথার ওপর নিউইয়র্কের পরিচিত আলোকোজ্জ্বল বিলবোর্ড। সেই ব্যস্ত নগরীর প্রাণকেন্দ্র টাইমস স্কয়ারে একদিন বাংলা গান, লোককবিতা, নৃত্য, শোভাযাত্রা আর শিশুদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে বাঙালির নতুন বছরের কথা। পহেলা বৈশাখের উৎসব সেখানে এক দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ছাড়িয়ে প্রবাসে বাংলা পরিচয় ও ঐতিহ্য ধরে রাখার এক দৃশ্যমান আয়োজনে পরিণত হয়েছিল।
বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ পালনের কয়েক দিন আগে, ১৩ এপ্রিল নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে দিনব্যাপী এই আয়োজন করা হয়। প্রবাসীদের সংগঠন এনআরবি ওয়ার্ল্ডওয়াইডের উদ্যোগে এবং নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটের সহযোগিতায় আয়োজিত উৎসবটি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ২৭টি পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি, আন্তর্জাতিক অতিথি, কূটনীতিক, শিল্পী, লেখক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
নিউইয়র্কের কেন্দ্রে বাংলার নতুন বছর
বাংলা নববর্ষের উৎসবের শুরুতেই ছিল আনুষ্ঠানিক প্রদীপ প্রজ্বালন। এতে অংশ নেন বিশ্বজিৎ সাহা, রোকেয়া হায়দার, হোসাইন কবির ও মহিতোষ তালুকদার তাপস। এরপর টাইমস স্কয়ারের বিশাল ডিজিটাল পর্দায় নিউইয়র্কের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার শুভেচ্ছা ও ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়।
ডেমোক্র্যাট নেতা ব্র্যাড হলম্যান-সিগাল, কুইন্স বরো প্রেসিডেন্ট ডোনোভান রিচার্ডস জুনিয়র, কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং এবং নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর জন সি. লিউয়ের বার্তাও অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়।
এ দৃশ্যের তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। নিউইয়র্কের মতো বহুজাতিক নগরীর অন্যতম পরিচিত জনপরিসরে বাংলা নববর্ষ উদযাপন প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরার একটি সুযোগ তৈরি করে।
সাহিত্য থেকে লোকঐতিহ্য
উৎসবের শুরুতেই কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তোফাজ্জল লিটনের উপস্থাপনায় এই পর্বে বাংলা সাহিত্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নানা দিক তুলে ধরা হয়।
এরপর কার্তিক চন্দ্রের সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সাংস্কৃতিক আবহ আরও বিস্তৃত হয়। গীতাঞ্জলি সংগীত, শিশুদের একক পরিবেশনা, আলভান চৌধুরীর গান, রজনীর নৃত্য এবং চিত্রার সংগীত পরিবেশনায় দিনের প্রথমার্ধে মঞ্চজুড়ে ছিল বৈচিত্র্যময় আয়োজন।
তবে বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি উঠে আসে লোকঐতিহ্যের পরিবেশনায়। জীবন চৌধুরীর কণ্ঠে ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ টাইমস স্কয়ারের দর্শকদের সামনে বাংলার লোকজ সাহিত্য ও সংগীতের দীর্ঘ ঐতিহ্যকে নতুন পরিসরে তুলে ধরে।
আলোকোজ্জ্বল টাইমস স্কয়ারে বাংলা লোককবিতা ও গানের এই পরিবেশনা যেন ভিন্ন দুই জগতকে পাশাপাশি এনে দেয়। একদিকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নগরকেন্দ্র, অন্যদিকে বাংলার গ্রামীণ জীবন ও লোকস্মৃতির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
বৈশাখের মঞ্চে বহুসাংস্কৃতিক নিউইয়র্ক
এই উৎসবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বিভিন্ন দেশের মানুষের অংশগ্রহণ। নেপাল, লাওস ও থাই সম্প্রদায়ের শিল্পীরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ফলে বাংলা নববর্ষের আয়োজনটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিজস্ব উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে একটি বহুসাংস্কৃতিক মিলনমঞ্চের রূপ নেয়।
‘ষড়ঋতু’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বাংলার প্রকৃতি, সময় ও জীবনদর্শনের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরা হয়। বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক, ঋতুবৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাপনের যে যোগসূত্র, এই পরিবেশনায় তারই সাংস্কৃতিক প্রকাশ দেখা যায়।
দুপুরের আয়োজনে বিশিষ্ট অতিথি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সম্মাননা দেওয়া হয়। এতে বিদেশি অতিথি, সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতারা অংশ নেন। ড. কল্লোল বসুর উপস্থাপনায় এই পর্বে প্রবাসী পরিচয় ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
পরে রোকেয়া হায়দার ও বিশ্বজিৎ সাহার নেতৃত্বে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাংস্কৃতিক যাত্রা নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়।
শোভাযাত্রায় ঢাকার স্মৃতি
বিকেলের পর্বে উৎসবের চেহারা আরও বদলে যায়। ‘জ্যোতি সংহিতা’ নাটক, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সলিল চৌধুরীকে নিয়ে সংগীত পরিবেশনা, রহমান টিটোর ‘দ্রোহের গান’, আড্ডা, সৃষ্টি একাডেমির নৃত্য, শাহ মাহবুবের লোকগান এবং ওড়িশা ড্যান্স একাডেমির শাস্ত্রীয় নৃত্য ছিল এই পর্বের উল্লেখযোগ্য আয়োজন।
ছিল কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের প্রতিও বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন।
শোভাযাত্রায় বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিভিন্ন অনুষঙ্গ তুলে ধরা হয়। টাইমস স্কয়ারের ব্যস্ত সড়ক ও বিশাল ভবনের মধ্যে ঢাকার চারুকলার ঐতিহ্যের অনুরূপ বর্ণিল পরিবেশ তৈরি হয়। দেশের বাইরে থেকেও বাঙালির উৎসবের দৃশ্যপট যে নিজের পরিচিত সাংস্কৃতিক রূপ ধরে রাখতে পারে, সেই অভিজ্ঞতাই যেন সামনে আসে সেখানে।
শিশুদের কণ্ঠে ভবিষ্যতের বাংলা
সন্ধ্যার আয়োজনে শিশুদের পরিবেশনায় ‘শতকণ্ঠে বর্ষবরণ’ ছিল অন্যতম আকর্ষণ। একসঙ্গে শিশুদের কণ্ঠে বাংলা গান ও বর্ষবরণের আয়োজন প্রবাসে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার প্রশ্নটিকেও সামনে আনে।
একটি প্রজন্ম যখন জন্ম ও বেড়ে ওঠার দিক থেকে বাংলাদেশের বাইরে, তখন তার সঙ্গে বাংলা ভাষা, গান, সাহিত্য, উৎসব ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হবে, সেটি প্রবাসী সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিশুদের এমন সাংস্কৃতিক আয়োজনে যুক্ত করা সেই সম্পর্ককে জীবন্ত রাখার একটি পথ হয়ে উঠতে পারে।
এরপর জ্যেষ্ঠ শিল্পীদের সম্মিলিত পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুদের কণ্ঠে তাঁরা বাংলা সংস্কৃতির ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি দেখেছেন। আর প্রবীণ শিল্পীদের পরিবেশনায় ফুটে উঠেছে প্রবাসজীবনের স্মৃতি ও আবেগ।
উৎসবের পরেও থেকে যায় যে প্রশ্ন
রাত ১০টায় কলকাতার ঋতুপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঢাকার নকুল কুমার বিশ্বাসের সমাপনী গান ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী আয়োজনের শেষ হয়।
তবে টাইমস স্কয়ারের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনের সমাপ্তি হলেও এর মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা আরও দীর্ঘ। দেশের বাইরে বসে কীভাবে একটি জাতির ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোকঐতিহ্য ও উৎসব পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়?
নিউইয়র্কের বাংলা নববর্ষের এই আয়োজন তার একটি উত্তর খোঁজার চেষ্টা। এখানে বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব ছিল না। বাংলা গান, ময়মনসিংহ গীতিকা, নৃত্য, নাটক, শোভাযাত্রা, সাহিত্য স্মরণ এবং শিশুদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এটি হয়ে উঠেছিল শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের একটি আয়োজন।
বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, বিশ্বের অন্যতম বহুসাংস্কৃতিক নগরীর কেন্দ্রস্থলে বাংলার এই সাংস্কৃতিক উপস্থিতি দেখিয়েছে, প্রবাসে বসবাস করলেও একটি সংস্কৃতি তার ভাষা ও ঐতিহ্য নিয়ে নতুন পরিসরে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে।
টাইমস স্কয়ারে সেদিনের বৈশাখ তাই কেবল নিউইয়র্কে বসবাসরত বাঙালির উৎসব ছিল না। এটি ছিল নতুন প্রজন্মের হাতে পুরোনো সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তুলে দেওয়ার, অন্য সংস্কৃতির মানুষের সামনে বাংলাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এবং বিশ্বনগরীর বুকে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বরকে দৃশ্যমান করে তোলার একটি প্রয়াস।




























