ঢাকা ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মানিকগঞ্জে শিশুদের খাবারে বিষ! নোংরা বেকারিতে তৈরি হচ্ছে কেমিক্যাল মেশানো বিস্কুট, কেক

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ১১:২০:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 99

শিশু খাদ্যে  বিষ | ছবি: প্রজন্ম কথা


মানিকগঞ্জের সাত উপজেলার বেকারিগুলো এখন যেন বিষের কারখানা! চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন যেখানে শিশুরা খাওয়ার জন্য বিস্কুট, কেক, সেমাই বা বনরুটি কিনছে, সেখানেই তৈরি হচ্ছে এসব খাবার অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে। কোনো নিয়মনীতি নেই, নেই স্বাস্থ্যসুরক্ষা। টেবিলের চারপাশে ময়লা, কড়াইতে তেলাপোকার ভিড়, মশার গুঞ্জন, আর তীব্র দুর্গন্ধ এমন পরিবেশে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজারো প্যাকেট শিশু খাদ্য। ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, নিম্নমানের পাম তেল ও আটা, এমনকি কাপড়ের রং পর্যন্ত।

শুধু তাই নয় এই কারখানাগুলোতে কাজ করছে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা। খালি গায়ে, হাতে গ্লাভস বা মাস্ক ছাড়াই তারা ময়দা মিশাচ্ছে, ক্রিম তৈরি করছে, প্যাকেট সিল দিচ্ছে। এমনকি খাবারের উৎপাদনের তারিখ বা মেয়াদোত্তীর্ণ সময়ও নির্দিষ্ট নয়। শ্রমিকরাই প্যাকেটে স্টিকার লাগিয়ে নতুন তারিখ বসিয়ে দিচ্ছে!

মানিকগঞ্জের সাত উপজেলার মধ্যে সদরে ১৮টি, সিংগাইরে ২২টি, হরিরামপুরে ১৬টি, ঘিওরে ৫টি, শিবালয়ে ৩টি, দৌলতপুরে ৩টি ও সাটুরিয়াতে ৩টি বেকারি রয়েছে। এই ৭২টি বেকারির মধ্যে অধিকাংশেরই নেই বিএসটিআই অনুমোদন, খাদ্য বিভাগের ছাড়পত্র বা ট্রেড লাইসেন্স। স্থানীয় প্রশাসনেরও নেই সঠিক তালিকা বা তদারকি।

বিভিন্ন বেকারিতে শিশু খাদ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে শিল্পকারখানার কেমিক্যাল, ক্ষতিকারক রং এবং নিম্নমানের তেল। এসব খাবার খেলে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে ডায়রিয়া, আমাশয়, লিভার ও কিডনি রোগে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের মানসিক বিকাশেও। এই খাবারগুলো নিয়মিত খেলে ভবিষ্যতে ক্যানসারসহ দীর্ঘস্থায়ী জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

মানিকগঞ্জের পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তিনি সদ্য যোগ দিয়েছেন এখনও জেলার বেকারির তালিকাই তাঁর হাতে নেই! তিনি স্বীকার করেছেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফারহানা ইসলাম অজন্তা বলেন, আমরা ইতিমধ্যে তিনটি বেকারিকে জরিমানা করেছি, তবে জেলার মোট বেকারি সংখ্যা জানা নেই।

অর্থাৎ প্রশাসনের দুই দপ্তরই স্বীকার করছে তাদের হাতে নেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য, নেই নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা। এই সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বেকারি মালিকরা।

এই নোংরা, রাসায়নিক মেশানো খাবার প্রতিদিন যাচ্ছে হাজারো শিশুর পেটে। বিদ্যালয়ের টিফিনে, বিকেলের নাস্তায়, হাট-বাজারে সবখানেই বিক্রি হচ্ছে এই বিষমিশ্রিত খাবার। ডাক্তাররা বলছেন, এটি স্লো পয়জন যার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে শরীর ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়।

যে দেশে শিশুর জন্য তৈরি খাবারই শিশুর প্রাণের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে নীরব থাকা মানে অপরাধে সহযোগিতা করা। মানিকগঞ্জের বেকারিগুলোর এই অমানবিক ও বিপজ্জনক বাস্তবতা এখনই বন্ধ না হলে, এটি পুরো জাতির জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় হয়ে দাঁড়াবে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

শেয়ার করুন

মানিকগঞ্জে শিশুদের খাবারে বিষ! নোংরা বেকারিতে তৈরি হচ্ছে কেমিক্যাল মেশানো বিস্কুট, কেক

প্রকাশঃ ১১:২০:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫

শিশু খাদ্যে  বিষ | ছবি: প্রজন্ম কথা


মানিকগঞ্জের সাত উপজেলার বেকারিগুলো এখন যেন বিষের কারখানা! চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন যেখানে শিশুরা খাওয়ার জন্য বিস্কুট, কেক, সেমাই বা বনরুটি কিনছে, সেখানেই তৈরি হচ্ছে এসব খাবার অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে। কোনো নিয়মনীতি নেই, নেই স্বাস্থ্যসুরক্ষা। টেবিলের চারপাশে ময়লা, কড়াইতে তেলাপোকার ভিড়, মশার গুঞ্জন, আর তীব্র দুর্গন্ধ এমন পরিবেশে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে হাজারো প্যাকেট শিশু খাদ্য। ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, নিম্নমানের পাম তেল ও আটা, এমনকি কাপড়ের রং পর্যন্ত।

শুধু তাই নয় এই কারখানাগুলোতে কাজ করছে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা। খালি গায়ে, হাতে গ্লাভস বা মাস্ক ছাড়াই তারা ময়দা মিশাচ্ছে, ক্রিম তৈরি করছে, প্যাকেট সিল দিচ্ছে। এমনকি খাবারের উৎপাদনের তারিখ বা মেয়াদোত্তীর্ণ সময়ও নির্দিষ্ট নয়। শ্রমিকরাই প্যাকেটে স্টিকার লাগিয়ে নতুন তারিখ বসিয়ে দিচ্ছে!

মানিকগঞ্জের সাত উপজেলার মধ্যে সদরে ১৮টি, সিংগাইরে ২২টি, হরিরামপুরে ১৬টি, ঘিওরে ৫টি, শিবালয়ে ৩টি, দৌলতপুরে ৩টি ও সাটুরিয়াতে ৩টি বেকারি রয়েছে। এই ৭২টি বেকারির মধ্যে অধিকাংশেরই নেই বিএসটিআই অনুমোদন, খাদ্য বিভাগের ছাড়পত্র বা ট্রেড লাইসেন্স। স্থানীয় প্রশাসনেরও নেই সঠিক তালিকা বা তদারকি।

বিভিন্ন বেকারিতে শিশু খাদ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে শিল্পকারখানার কেমিক্যাল, ক্ষতিকারক রং এবং নিম্নমানের তেল। এসব খাবার খেলে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে ডায়রিয়া, আমাশয়, লিভার ও কিডনি রোগে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের মানসিক বিকাশেও। এই খাবারগুলো নিয়মিত খেলে ভবিষ্যতে ক্যানসারসহ দীর্ঘস্থায়ী জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

মানিকগঞ্জের পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তিনি সদ্য যোগ দিয়েছেন এখনও জেলার বেকারির তালিকাই তাঁর হাতে নেই! তিনি স্বীকার করেছেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফারহানা ইসলাম অজন্তা বলেন, আমরা ইতিমধ্যে তিনটি বেকারিকে জরিমানা করেছি, তবে জেলার মোট বেকারি সংখ্যা জানা নেই।

অর্থাৎ প্রশাসনের দুই দপ্তরই স্বীকার করছে তাদের হাতে নেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য, নেই নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা। এই সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বেকারি মালিকরা।

এই নোংরা, রাসায়নিক মেশানো খাবার প্রতিদিন যাচ্ছে হাজারো শিশুর পেটে। বিদ্যালয়ের টিফিনে, বিকেলের নাস্তায়, হাট-বাজারে সবখানেই বিক্রি হচ্ছে এই বিষমিশ্রিত খাবার। ডাক্তাররা বলছেন, এটি স্লো পয়জন যার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে শরীর ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়।

যে দেশে শিশুর জন্য তৈরি খাবারই শিশুর প্রাণের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে নীরব থাকা মানে অপরাধে সহযোগিতা করা। মানিকগঞ্জের বেকারিগুলোর এই অমানবিক ও বিপজ্জনক বাস্তবতা এখনই বন্ধ না হলে, এটি পুরো জাতির জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় হয়ে দাঁড়াবে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”