গৃহযুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়ের ছায়ায় মিয়ানমারের নির্বাচন
- প্রকাশঃ ০১:০৮:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 74
ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ, চরম মানবিক সংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেই সাধারণ নির্বাচনের পথে হাঁটছে মিয়ানমার। আগামী রোববার (২৮ ডিসেম্বর) দেশটিতে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চলমান সহিংস সংঘাত মিয়ানমারকে কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই সামরিক জান্তা ও বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। এই সংঘাতে প্রতিদিনই বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা, ভেঙে পড়ছে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো।
এরই মধ্যে চলতি বছরের মার্চে এক শক্তিশালী ভূমিকম্পসহ একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ১০ লাখ। এর মধ্যে অন্তত ২ কোটি মানুষের এখন জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।
দেশটিতে আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার নজিরবিহীন অবমূল্যায়নের ফলে প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬ হাজার ৮০০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৩৬ লাখেরও বেশি মানুষ, যাদের বড় একটি অংশ আশ্রয়হীন ও কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী বছর মিয়ানমারে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। এর মধ্যে অন্তত ১০ লাখ মানুষের জীবন রক্ষায় তাৎক্ষণিক সহায়তা অপরিহার্য। তবে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, খাদ্য সংকট ও ক্ষুধার প্রকৃত চিত্র আড়াল করতে গবেষক ও ত্রাণকর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে সামরিক জান্তা।
জাতিসংঘ আরও জানিয়েছে, মিয়ানমারের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক ত্রাণ তহবিলের মাত্র ১২ শতাংশ এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে দেশটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ‘আন্ডার-ফান্ডেড’ বা তীব্র অর্থসংকটে থাকা মানবিক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে শিশুরা। ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মিয়ানমারে প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগতে পারে, যা গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে একজনের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ পুষ্টিহীনতার কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত মিয়ানমার এখন গভীর সংকটে। বিশ্ব ব্যাংকের চলতি মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমের কারণে আগামী অর্থবছরে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো ২০ শতাংশের বেশি রয়ে গেছে।
এদিকে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দেশটিতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে একটি বড় বিনিয়োগ চুক্তি করেছে জান্তা সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমারের জ্বালানি খাতে রুশ কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চরম সহিংসতা, মানবিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে আয়োজিত এই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

























