সৌদির অর্থ, পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও তুরস্কের সামরিক দক্ষতায় আসছে ইসলামিক ন্যাটো
- প্রকাশঃ ০২:৪৯:৪৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / 58
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে ঘিরে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট গঠনের আলোচনা জোরালো হচ্ছে। ন্যাটোর আদলে প্রস্তাবিত এই নিরাপত্তা কাঠামোয় ‘সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতি’ অন্তর্ভুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে এক সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনকে সব সদস্যের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিষয়টি ন্যাটোর বিখ্যাত আর্টিকেল–৫–এর সঙ্গে তুলনীয় বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা ব্লুমবার্গ।
প্রাথমিকভাবে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এই আলোচনা এখন তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন মাত্রা পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য দায়িত্ব বণ্টনের কাঠামোয় সৌদি আরব দেবে অর্থনৈতিক সহায়তা, পাকিস্তান যুক্ত করবে তাদের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও জনবল, আর তুরস্ক যোগ করবে উন্নত সামরিক দক্ষতা ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা।
আঙ্কারা-ভিত্তিক থিংক ট্যাংক টেপাভের কৌশলবিদ নিহাত আলি ওজচান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ক্রমেই নিজস্ব স্বার্থ ও ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আশপাশের অঞ্চলের দেশগুলো নতুন বাস্তবতায় নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প জোট কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলো জানায়, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের কৌশলগত স্বার্থ ক্রমেই কাছাকাছি আসছে। এ কারণে একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা জোট গঠনকে স্বাভাবিক ও যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
ইতোমধ্যে তিন দেশের মধ্যে সামরিক সমন্বয় দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি সপ্তাহে আঙ্কারায় তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি যৌথ নৌবাহিনী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই সম্ভাব্য জোটের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় এ কারণে যে, তুরস্ক কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনীর অধিকারী।
সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে ইরানকে ঘিরে কিছু অভিন্ন উদ্বেগ থাকলেও দুই দেশই সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে তারা একটি স্থিতিশীল, সুন্নি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ার পক্ষে এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে একমত।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। তুরস্ক ইতোমধ্যে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জন্য করভেট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করেছে, পাকিস্তানের এফ–১৬ যুদ্ধবিমান বহর আধুনিকায়নে সহায়তা দিয়েছে এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ড্রোন প্রযুক্তি ভাগাভাগি করছে। পাশাপাশি তুরস্ক তাদের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ প্রকল্পে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলেও আগে জানিয়েছিল ব্লুমবার্গ।
এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা আলোচনা এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। মে মাসে চার দিনব্যাপী সামরিক উত্তেজনার পর এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে সংঘটিত ওই সংঘাত অপারেশন সিঁদুর নামে পরিচিত, যেখানে তুরস্ক প্রকাশ্যভাবেই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত এই জোট বাস্তবায়িত হলে মুসলিম বিশ্বে প্রথমবারের মতো ন্যাটো-ধাঁচের একটি কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

























