যুক্তরাজ্যে অভিবাসন আটক হলে জামিন পাবেন যেভাবে, জানুন আবেদন ও শর্ত
- প্রকাশঃ ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪৫
- / 5
লন্ডন, ১২ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাজ্যে অভিবাসন-সংক্রান্ত কারণে আটক ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জামিনে মুক্তির সুযোগ রয়েছে। তবে জামিনের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে আটক রাখার আইনি ভিত্তি, দেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা, ব্যক্তির অতীত আচরণ এবং জামিনের শর্ত মেনে চলার ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাজ্যে প্রায় ২৩ হাজার মানুষ অভিবাসন হেফাজতে প্রবেশ করেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। ফৌজদারি অপরাধে সাজা ভোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও অভিবাসন আটকের ক্ষেত্রে একই ধরনের সর্বোচ্চ সময়সীমা নেই। ফলে মামলার পরিস্থিতি অনুযায়ী আটকের মেয়াদ ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণভাবে সাত দিনের বেশি সময় ধরে আটক থাকা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অভিবাসন জামিনের জন্য আবেদন করতে পারেন। সীমান্তে প্রবেশের অনুমতির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা, নির্বাসন বা অপসারণের প্রস্তুতির কারণে আটক থাকা এবং বিদেশি অপরাধী হিসেবে নির্বাসনের সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যক্তিরাও নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ করলে জামিন চাইতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে কেউ অভিবাসন অপসারণ কেন্দ্রে নাকি কারাগারে আটক আছেন, সেটিই মূল বিষয় নয়। কোন আইনি ক্ষমতার অধীনে তাকে আটক রাখা হয়েছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে অপসারণ বা নির্বাসনের উদ্দেশ্যে আটক ব্যক্তিদের জামিনের আবেদন করার সুযোগ থাকে।
কোথায় জামিনের আবেদন করা যায়
আটক ব্যক্তি স্বরাষ্ট্র দপ্তর অথবা প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালে জামিনের আবেদন করতে পারেন। স্বরাষ্ট্র দপ্তরে আবেদনের জন্য বি-৪০১ ফরম এবং প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালে আবেদনের জন্য বি-১ ফরম ব্যবহার করা হয়। ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার আগে স্বরাষ্ট্র দপ্তরে আবেদন করা বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ একজন আটক ব্যক্তি সরাসরি প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালেও জামিন চাইতে পারেন।
জামিনের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও বিচারিক নির্দেশনায় আটক রাখার পরিবর্তে যুক্তিসংগত বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ট্রাইব্যুনালে কাউকে আটক রাখা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখানোর দায়িত্ব মূলত স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ওপর থাকে।
কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়
জামিনের সিদ্ধান্তের সময় পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, অতীত অপরাধের ইতিহাস, জামিনে থাকা অবস্থায় নতুন অপরাধের সম্ভাবনা, জনস্বাস্থ্য বা জনশৃঙ্খলার ঝুঁকি এবং অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করার ইতিহাস বিবেচনায় আসতে পারে।
কত দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শুনানির ২১ দিনের মধ্যে অপসারণের পরিকল্পনা থাকলে এবং এতে কোনো আইনি বাধা না থাকলে জামিনের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সম্মতির প্রয়োজন হতে পারে। তবে চলমান অভিবাসন আবেদন বা আপিল অপসারণে বাধা সৃষ্টি করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
আটক ব্যক্তির আগের আচরণও বিবেচিত হয়। আগে অভিবাসন জামিনের শর্ত মেনে চলা, নিয়মিত রিপোর্ট করা এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার ইতিহাস থাকলে সেটি ভবিষ্যতে শর্ত মানার সম্ভাবনার পক্ষে যেতে পারে। কোনো রিপোর্টিংয়ে অনুপস্থিত থাকার ঘটনা থাকলে তার কারণ ব্যাখ্যা করার সুযোগও রয়েছে।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতিও জামিনের আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্থায়ী বাসস্থান, ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা চলমান অভিবাসন আবেদন থাকলে সেগুলো পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম হওয়ার পক্ষে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। অতীতে অপরাধ বা পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস থাকলেও পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এলে সেটিও আবেদনে তুলে ধরা সম্ভব।
প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালে জামিনের আবেদন হলে শুনানির আগে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের একটি জামিন-সারসংক্ষেপ দেওয়ার কথা। এতে আটকের কারণ, অপসারণের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলো তুলে ধরা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাস্তবে এই সারসংক্ষেপ কখনো শেষ মুহূর্তে দেওয়া হয় এবং কখনো শুনানির আগেই তা পাওয়া যায় না। ফলে সারসংক্ষেপে থাকা তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বরাষ্ট্র দপ্তর কোন তথ্যকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং কোন তথ্য বাদ দিয়েছে, তা জামিনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আবেদনকারী বা তাঁর আইনজীবীর উচিত সারসংক্ষেপের তথ্য বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলে শুনানিতে তা তুলে ধরা।
দীর্ঘদিন আটক থাকলে কী হয়
আটকের সময়কালও জামিনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিচারিক নির্দেশনায় তিন মাসের আটককে উল্লেখযোগ্য এবং ছয় মাসের আটককে দীর্ঘ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ছয় মাসের বেশি সময় কাউকে আটক রাখার ক্ষেত্রে জননিরাপত্তার মতো শক্তিশালী কারণ প্রয়োজন হতে পারে।
জামিন দেওয়া হলে সাধারণত এক বা একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়। এর মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে কর্তৃপক্ষ বা ট্রাইব্যুনালে হাজিরা, নির্দিষ্ট ঠিকানায় বসবাস, নিয়মিত রিপোর্ট করা, কাজ বা পড়াশোনার ওপর সীমাবদ্ধতা, নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান এবং ইলেকট্রনিক নজরদারি থাকতে পারে।
নির্বাসনের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইলেকট্রনিক নজরদারি বাধ্যতামূলক হতে পারে। তবে শুধু অতীতে অপরাধের ইতিহাস থাকার কারণে প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর এমন নজরদারি বাধ্যতামূলক নয়। আগে থেকেই অপরাধসংক্রান্ত তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা থাকলে অতিরিক্ত নজরদারি প্রয়োজন কি না, সেটিও বিবেচনা করা হতে পারে।
জামিনের আবেদনে আর্থিক সহায়তাকারী বা জামিনদার থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কোনো ব্যক্তি আবেদনকারী জামিনের শর্ত মেনে চলবেন তা নিশ্চিত করতে আর্থিক দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত থাকলে বিষয়টি বিচারকের বিবেচনায় আসতে পারে। আর্থিক শর্ত একাই জামিনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে না।
আইনজীবীদের জন্যও জামিনের আবেদনে সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট যুক্তি উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব ঝুঁকি থাকলে সেটি কীভাবে নির্দিষ্ট জামিনের শর্তের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তা দেখানো গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়ী বাসস্থান, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত পরিস্থিতির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিও উপস্থাপন করা যেতে পারে।
২৮ দিনের নিয়ম কী
প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনাল জামিন প্রত্যাখ্যান করলে সরাসরি আপিলের সুযোগ নেই। তবে পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটলে নতুন করে জামিনের আবেদন করা যায়।
সাধারণভাবে, জামিন প্রত্যাখ্যানের পর ২৮ দিনের মধ্যে আবার আবেদন করা হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হতে পারে, যদি আবেদনকারী তার পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখাতে না পারেন। নতুন আপিল শুরু হওয়া, অভিবাসন মামলায় নতুন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা অপসারণের পথে নতুন কোনো বাধা তৈরি হওয়া পরবর্তী আবেদনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তাই জামিনের আবেদন কখন করা হচ্ছে এবং আগের সিদ্ধান্তের পর পরিস্থিতিতে কী পরিবর্তন এসেছে, সেটিও প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাধারণভাবে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তুলনায় প্রথম স্তরের ট্রাইব্যুনালে জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির জামিন নিশ্চিত এমন দাবি করা যায় না। মামলার আইনি ভিত্তি, আটকের কারণ, অপসারণের সম্ভাবনা, অতীত আচরণ এবং নির্দিষ্ট শর্তের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না, এসব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।



























