ঢাকা ০৯:৩২ , Mon, ২৮ Sep ২০২৬

তিন দশকের বেশি সময় ধরে ‘ইত্যাদি’, যে গল্পের সঙ্গে মিশে আছে হানিফ সংকেত

প্রজন্ম কথা ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:২৬
  • / 4
তিন দশকের বেশি সময় ধরে ‘ইত্যাদি’র সঙ্গে দর্শকের সম্পর্ক ধরে রেখেছেন হানিফ সংকেত। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের টেলিভিশনে কত অনুষ্ঠান এসেছে, দর্শকপ্রিয় হয়েছে, তারপর সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু অনুষ্ঠান সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের জায়গা ধরে রাখে। ‘ইত্যাদি’ তেমনই একটি নাম। ১৯৮৯ সালের মার্চে বিটিভিতে প্রথম প্রচারের পর তিন দশকের বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকের সঙ্গে একটি আলাদা সম্পর্ক তৈরি করেছে। আর সেই দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে হানিফ সংকেতের নাম।

১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর বরিশালে জন্ম হানিফ সংকেতের। তবে টেলিভিশনে তাঁর পরিচিতির শুরু ‘ইত্যাদি’ দিয়ে নয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি প্রথমদিকে পরিচিতি পান।

ফজলে লোহানীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে হানিফ সংকেত বন্ধু ও অভিভাবকের সম্পর্ক হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসঙ্গে পথচলার সেই সময়টি ছিল শেখা ও প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৮৯ সালের মার্চে বিটিভিতে প্রথম প্রচারিত হয় ‘ইত্যাদি’। শুরুতে এটি ছিল স্টুডিওকেন্দ্রিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। পরে নব্বইয়ের দশক থেকে অনুষ্ঠানের নির্মাণধারায় বড় পরিবর্তন আসে। স্টুডিওর চার দেয়াল পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে ‘ইত্যাদি’র পর্ব ধারণ শুরু করেন হানিফ সংকেত।

এর ফলে অনুষ্ঠানের পর্দায় জায়গা করে নেয় বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, লোকজ জীবন ও সাধারণ মানুষের গল্প। রাজধানীকেন্দ্রিক টেলিভিশনের পরিচিত পরিসরের বাইরে থাকা বহু স্থান ও মানুষও এতে দর্শকের সামনে উঠে আসে।

চরফ্যাশন, লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জ কিংবা ঝিনাইদহের মতো বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে অনুষ্ঠান ধারণের ধারাবাহিকতা এখনো রয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পর্যটন ও জনজীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়।

হানিফ সংকেতের কাছে এই কাজের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল দেশকে জানা এবং দেশের মানুষকে জানানো। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন নিয়ে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও ‘ইত্যাদি’র এই দেশভ্রমণের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।

‘ইত্যাদি’র পরিচিতি তৈরি হয়েছে হাস্যরস, গান, নাট্যাংশ ও নানা বিনোদনমূলক আয়োজনের মধ্য দিয়ে। তবে অনুষ্ঠানটির বিষয়বস্তু কখনো কেবল বিনোদনে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

সামাজিক অসংগতি, পরিবেশ, দুর্ঘটনা, অপচয়, পাঠাভ্যাস, নাগরিক আচরণসহ বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক নাট্যাংশ ও প্রতিবেদন নিয়মিত জায়গা পেয়েছে। সাম্প্রতিক পর্বগুলোতেও ইন্টারনেট আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভোগবাদ, সুবিধাবাদ, স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যবসাসহ নানা সামাজিক প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

হানিফ সংকেত বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ইত্যাদি’র শুরু থেকেই সচেতনতা তৈরির লক্ষ্য ছিল। বিনোদনের সঙ্গে এই সামাজিক বার্তার সমন্বয়ই অনুষ্ঠানের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

ভালো কাজ করা মানুষদের সামনে আনার ক্ষেত্রেও ‘ইত্যাদি’র আলাদা ভূমিকা রয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমে মানুষের জন্য কাজ করা ব্যক্তি থেকে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত মানুষ, বিভিন্ন সময় এমন অনেক ব্যক্তিকে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বড় দর্শকগোষ্ঠীর সামনে আনা হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি পর্বে ৬০০ বাঁশের সেতু নির্মাণ করা বগুড়ার এক স্বেচ্ছাসেবী কারিগরের কাজও তুলে ধরা হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে ‘ইত্যাদি’ গান, অভিনয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে নতুন শিল্পী ও প্রতিভাবানদের সামনে আসার সুযোগ দিয়েছে।

অনেক পরিচিত শিল্পীর টেলিভিশনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সঙ্গেও অনুষ্ঠানের নাম জড়িয়ে আছে। যেমন সংগীতশিল্পী খালিদ হাসান মিলুর দুই সন্তান প্রতীক হাসান ও প্রীতম হাসানের প্রথম পর্দায় আবির্ভাব এবং একসঙ্গে জুটি হয়ে গান করার একটি পর্যায়ও ‘ইত্যাদি’র সঙ্গে যুক্ত।

তিন দশকের বেশি সময়ের পথচলা নিয়ে হানিফ সংকেত নিজেও বলেছেন, অনুষ্ঠানটি অনেক শিল্পী, অভিনেতা ও নতুন প্রতিভাকে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তাঁদের অনেকে পরে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

১৯৯৪ সালের ২৫ নভেম্বর ‘ইত্যাদি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। হানিফ সংকেতের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় অনুষ্ঠানটি বিটিভিতে প্যাকেজ অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বেসরকারিভাবে নির্মিত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর প্রযোজনা কার্যক্রমও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ফাগুন অডিও ভিশনের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে ‘ইত্যাদি’র পাশাপাশি নাটকসহ বিভিন্ন ধরনের টেলিভিশন প্রযোজনার সঙ্গে তিনি যুক্ত থেকেছেন।

লেখক হিসেবেও হানিফ সংকেতের আলাদা পরিচয় রয়েছে। ব্যঙ্গ ও রম্যধর্মী লেখার পাশাপাশি অভিনয়, গান, সুর ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে তাঁর কর্মজীবনকে কেবল একজন উপস্থাপকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

হানিফ সংকেতের দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিকগুলোর একটি ‘ইত্যাদি’র স্থায়িত্ব।

যে সময়ে বিটিভিই ছিল দেশের প্রধান টেলিভিশন মাধ্যম, সেই সময় থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট চ্যানেলের বিস্তার, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নতুন নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান, দর্শকের বিনোদন গ্রহণের পদ্ধতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন।

তারপরও ‘ইত্যাদি’ টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও দর্শকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি ঈদ পর্ব ইউটিউবে প্রকাশের পর কয়েক দিনের মধ্যেই ৫০ লাখের বেশি দর্শন পেয়েছিল বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ দর্শকের পর্দা বদলেছে, দেখার মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু ‘ইত্যাদি’র সঙ্গে দর্শকের পরিচিত সম্পর্ক পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

দীর্ঘ কর্মজীবনে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছেন হানিফ সংকেত। ২০১০ সালে তিনি একুশে পদক এবং ২০১৪ সালে জাতীয় পরিবেশ পদক লাভ করেন।

২০২৬ সালে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত সরকারি তালিকায় এ বছর সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এ কে এম হানিফ (হানিফ সংকেত)-এর নাম রয়েছে।

এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীল কর্মজীবনের আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। তবে তাঁর কাজের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও দীর্ঘস্থায়ী অংশ এখনো ‘ইত্যাদি’কে ঘিরেই।

বাংলাদেশের টেলিভিশনের এমন এক সময়ে হানিফ সংকেতের পথচলা শুরু হয়েছিল, যখন একটি অনুষ্ঠান একটি পরিবারের নিয়মিত দেখার অভ্যাসে পরিণত হতে পারত। ‘ইত্যাদি’ সেই অভ্যাসের সঙ্গে বহু দর্শকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্মৃতিও তৈরি করেছে।

কেউ হয়তো মনে রাখেন কোনো একটি গান, কেউ কোনো নাট্যাংশ, কেউ আবার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো মানুষের গল্প। কারও কাছে ‘ইত্যাদি’ মানে ঈদের বিশেষ আয়োজন, আবার কারও কাছে এটি শৈশব ও পরিবারের সঙ্গে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার স্মৃতি।

এই দীর্ঘ সম্পর্কের একটি দিক হলো, ‘ইত্যাদি’ কেবল স্টুডিওর অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে ধারণ করা পর্বগুলো বাংলাদেশের ভূগোল ও মানুষের জীবনকে অনুষ্ঠানের অংশ করেছে। ফাগুন অডিও ভিশনের সাম্প্রতিক আয়োজনগুলোতেও সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

তাই হানিফ সংকেতকে কেবল একজন উপস্থাপক বা নির্মাতা হিসেবে দেখলে তাঁর দীর্ঘ পথচলার পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের টেলিভিশনের একটি দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তন ও স্মৃতি।

আর সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি ‘ইত্যাদি’। যেখানে হাসির সঙ্গে সামাজিক প্রশ্ন এসেছে, ভালো কাজ করা অচেনা মানুষ পরিচিতি পেয়েছেন, নতুন শিল্পীরা বড় দর্শকের সামনে এসেছেন এবং দেশের নানা প্রান্তের জীবন, সংস্কৃতি ও ইতিহাস পৌঁছেছে ঘরের পর্দায়।

তিন দশকের বেশি সময় পরও ‘ইত্যাদি’র নাম উচ্চারিত হলে হানিফ সংকেতের কথা আসে। আবার তাঁর দীর্ঘ টেলিভিশনজীবনের কথা উঠলে ফিরে আসে ‘ইত্যাদি’। এই দুই নামের দীর্ঘ সম্পর্কই বাংলাদেশের টেলিভিশনের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে আছে।

❤️
👏
🙂
😞

তিন দশকের বেশি সময় ধরে ‘ইত্যাদি’, যে গল্পের সঙ্গে মিশে আছে হানিফ সংকেত

প্রকাশঃ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:২৬

বাংলাদেশের টেলিভিশনে কত অনুষ্ঠান এসেছে, দর্শকপ্রিয় হয়েছে, তারপর সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু অনুষ্ঠান সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও নিজেদের জায়গা ধরে রাখে। ‘ইত্যাদি’ তেমনই একটি নাম। ১৯৮৯ সালের মার্চে বিটিভিতে প্রথম প্রচারের পর তিন দশকের বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের টেলিভিশন দর্শকের সঙ্গে একটি আলাদা সম্পর্ক তৈরি করেছে। আর সেই দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে হানিফ সংকেতের নাম।

১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর বরিশালে জন্ম হানিফ সংকেতের। তবে টেলিভিশনে তাঁর পরিচিতির শুরু ‘ইত্যাদি’ দিয়ে নয়। প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি প্রথমদিকে পরিচিতি পান।

ফজলে লোহানীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে হানিফ সংকেত বন্ধু ও অভিভাবকের সম্পর্ক হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসঙ্গে পথচলার সেই সময়টি ছিল শেখা ও প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৮৯ সালের মার্চে বিটিভিতে প্রথম প্রচারিত হয় ‘ইত্যাদি’। শুরুতে এটি ছিল স্টুডিওকেন্দ্রিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। পরে নব্বইয়ের দশক থেকে অনুষ্ঠানের নির্মাণধারায় বড় পরিবর্তন আসে। স্টুডিওর চার দেয়াল পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে ‘ইত্যাদি’র পর্ব ধারণ শুরু করেন হানিফ সংকেত।

এর ফলে অনুষ্ঠানের পর্দায় জায়গা করে নেয় বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, লোকজ জীবন ও সাধারণ মানুষের গল্প। রাজধানীকেন্দ্রিক টেলিভিশনের পরিচিত পরিসরের বাইরে থাকা বহু স্থান ও মানুষও এতে দর্শকের সামনে উঠে আসে।

চরফ্যাশন, লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জ কিংবা ঝিনাইদহের মতো বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে অনুষ্ঠান ধারণের ধারাবাহিকতা এখনো রয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পর্যটন ও জনজীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়।

হানিফ সংকেতের কাছে এই কাজের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল দেশকে জানা এবং দেশের মানুষকে জানানো। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন নিয়ে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও ‘ইত্যাদি’র এই দেশভ্রমণের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে।

‘ইত্যাদি’র পরিচিতি তৈরি হয়েছে হাস্যরস, গান, নাট্যাংশ ও নানা বিনোদনমূলক আয়োজনের মধ্য দিয়ে। তবে অনুষ্ঠানটির বিষয়বস্তু কখনো কেবল বিনোদনে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

সামাজিক অসংগতি, পরিবেশ, দুর্ঘটনা, অপচয়, পাঠাভ্যাস, নাগরিক আচরণসহ বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক নাট্যাংশ ও প্রতিবেদন নিয়মিত জায়গা পেয়েছে। সাম্প্রতিক পর্বগুলোতেও ইন্টারনেট আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভোগবাদ, সুবিধাবাদ, স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যবসাসহ নানা সামাজিক প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

হানিফ সংকেত বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ইত্যাদি’র শুরু থেকেই সচেতনতা তৈরির লক্ষ্য ছিল। বিনোদনের সঙ্গে এই সামাজিক বার্তার সমন্বয়ই অনুষ্ঠানের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

ভালো কাজ করা মানুষদের সামনে আনার ক্ষেত্রেও ‘ইত্যাদি’র আলাদা ভূমিকা রয়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমে মানুষের জন্য কাজ করা ব্যক্তি থেকে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত মানুষ, বিভিন্ন সময় এমন অনেক ব্যক্তিকে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বড় দর্শকগোষ্ঠীর সামনে আনা হয়েছে। সাম্প্রতিক একটি পর্বে ৬০০ বাঁশের সেতু নির্মাণ করা বগুড়ার এক স্বেচ্ছাসেবী কারিগরের কাজও তুলে ধরা হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে ‘ইত্যাদি’ গান, অভিনয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে নতুন শিল্পী ও প্রতিভাবানদের সামনে আসার সুযোগ দিয়েছে।

অনেক পরিচিত শিল্পীর টেলিভিশনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সঙ্গেও অনুষ্ঠানের নাম জড়িয়ে আছে। যেমন সংগীতশিল্পী খালিদ হাসান মিলুর দুই সন্তান প্রতীক হাসান ও প্রীতম হাসানের প্রথম পর্দায় আবির্ভাব এবং একসঙ্গে জুটি হয়ে গান করার একটি পর্যায়ও ‘ইত্যাদি’র সঙ্গে যুক্ত।

তিন দশকের বেশি সময়ের পথচলা নিয়ে হানিফ সংকেত নিজেও বলেছেন, অনুষ্ঠানটি অনেক শিল্পী, অভিনেতা ও নতুন প্রতিভাকে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তাঁদের অনেকে পরে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

১৯৯৪ সালের ২৫ নভেম্বর ‘ইত্যাদি’র একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। হানিফ সংকেতের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় অনুষ্ঠানটি বিটিভিতে প্যাকেজ অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বেসরকারিভাবে নির্মিত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর প্রযোজনা কার্যক্রমও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ফাগুন অডিও ভিশনের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে ‘ইত্যাদি’র পাশাপাশি নাটকসহ বিভিন্ন ধরনের টেলিভিশন প্রযোজনার সঙ্গে তিনি যুক্ত থেকেছেন।

লেখক হিসেবেও হানিফ সংকেতের আলাদা পরিচয় রয়েছে। ব্যঙ্গ ও রম্যধর্মী লেখার পাশাপাশি অভিনয়, গান, সুর ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে তাঁর কর্মজীবনকে কেবল একজন উপস্থাপকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

হানিফ সংকেতের দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিকগুলোর একটি ‘ইত্যাদি’র স্থায়িত্ব।

যে সময়ে বিটিভিই ছিল দেশের প্রধান টেলিভিশন মাধ্যম, সেই সময় থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট চ্যানেলের বিস্তার, ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নতুন নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান, দর্শকের বিনোদন গ্রহণের পদ্ধতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন।

তারপরও ‘ইত্যাদি’ টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও দর্শকের কাছে পৌঁছাচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি ঈদ পর্ব ইউটিউবে প্রকাশের পর কয়েক দিনের মধ্যেই ৫০ লাখের বেশি দর্শন পেয়েছিল বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ দর্শকের পর্দা বদলেছে, দেখার মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু ‘ইত্যাদি’র সঙ্গে দর্শকের পরিচিত সম্পর্ক পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

দীর্ঘ কর্মজীবনে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছেন হানিফ সংকেত। ২০১০ সালে তিনি একুশে পদক এবং ২০১৪ সালে জাতীয় পরিবেশ পদক লাভ করেন।

২০২৬ সালে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত সরকারি তালিকায় এ বছর সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এ কে এম হানিফ (হানিফ সংকেত)-এর নাম রয়েছে।

এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীল কর্মজীবনের আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। তবে তাঁর কাজের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও দীর্ঘস্থায়ী অংশ এখনো ‘ইত্যাদি’কে ঘিরেই।

বাংলাদেশের টেলিভিশনের এমন এক সময়ে হানিফ সংকেতের পথচলা শুরু হয়েছিল, যখন একটি অনুষ্ঠান একটি পরিবারের নিয়মিত দেখার অভ্যাসে পরিণত হতে পারত। ‘ইত্যাদি’ সেই অভ্যাসের সঙ্গে বহু দর্শকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্মৃতিও তৈরি করেছে।

কেউ হয়তো মনে রাখেন কোনো একটি গান, কেউ কোনো নাট্যাংশ, কেউ আবার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো মানুষের গল্প। কারও কাছে ‘ইত্যাদি’ মানে ঈদের বিশেষ আয়োজন, আবার কারও কাছে এটি শৈশব ও পরিবারের সঙ্গে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার স্মৃতি।

এই দীর্ঘ সম্পর্কের একটি দিক হলো, ‘ইত্যাদি’ কেবল স্টুডিওর অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে ধারণ করা পর্বগুলো বাংলাদেশের ভূগোল ও মানুষের জীবনকে অনুষ্ঠানের অংশ করেছে। ফাগুন অডিও ভিশনের সাম্প্রতিক আয়োজনগুলোতেও সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

তাই হানিফ সংকেতকে কেবল একজন উপস্থাপক বা নির্মাতা হিসেবে দেখলে তাঁর দীর্ঘ পথচলার পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের টেলিভিশনের একটি দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তন ও স্মৃতি।

আর সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি ‘ইত্যাদি’। যেখানে হাসির সঙ্গে সামাজিক প্রশ্ন এসেছে, ভালো কাজ করা অচেনা মানুষ পরিচিতি পেয়েছেন, নতুন শিল্পীরা বড় দর্শকের সামনে এসেছেন এবং দেশের নানা প্রান্তের জীবন, সংস্কৃতি ও ইতিহাস পৌঁছেছে ঘরের পর্দায়।

তিন দশকের বেশি সময় পরও ‘ইত্যাদি’র নাম উচ্চারিত হলে হানিফ সংকেতের কথা আসে। আবার তাঁর দীর্ঘ টেলিভিশনজীবনের কথা উঠলে ফিরে আসে ‘ইত্যাদি’। এই দুই নামের দীর্ঘ সম্পর্কই বাংলাদেশের টেলিভিশনের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে আছে।