ঢাকা ০৯:৪১ , Mon, ২৮ Sep ২০২৬

তুষারঝড় পেরিয়ে ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত এলব্রুসের চূড়ায় এভারেস্টজয়ী শাকিল

শাহারিয়া নয়ন
  • প্রকাশঃ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২৭
  • / 4
তীব্র তুষারঝড় ও প্রতিকূল আবহাওয়া পেরিয়ে মাউন্ট এলব্রুসের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী ইকরামুল হাসান শাকিল। ছবি: ইকরামুল হাসান শাকিলের সৌজন্যে

মস্কো, ২৮ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – হিমশীতল ঝড়ো হাওয়া, তীব্র তুষারপাত আর হাঁটুসমান নরম বরফ। কয়েক মিটারের বেশি দূরত্বও যখন দেখা যাচ্ছিল না, তখনও থামেননি বাংলাদেশের এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী ইকরামুল হাসান শাকিল। কঠিন আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টায় মাউন্ট এলব্রুসের চূড়ায় পৌঁছান তিনি। সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ান এই পর্বতারোহী।

৫ হাজার ৬৪২ মিটার উচ্চতার এলব্রুস ককেশাস পর্বতমালার সর্বোচ্চ চূড়া। ইউরোপ ও এশিয়ার সীমানা নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে ভৌগোলিক বিতর্ক থাকলেও সাধারণভাবে এটিকে ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে ধরা হয়। একই সঙ্গে এটি ইউরেশিয়ার সর্বোচ্চ সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হিসেবে পরিচিত।

এলব্রুস অভিযানে অংশ নিতে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন শাকিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ সেপ্টেম্বর ভোরে চূড়ায় ওঠার কথা ছিল। তবে আবহাওয়ার অবনতির কারণে অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থা সেই দিনের সামিট পুশ বাতিল করে।

এর আগে টানা দুই দিনের তুষারপাতে চূড়ার পথের বড় অংশ নরম বরফে ঢেকে যায়। ফলে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

পরদিন শুক্রবার রাতে আবার চূড়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন শাকিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহ-পর্বতারোহী হিদার এবং গাইড অ্যালেক্স। তাঁদের অনুসরণ করে আরও দুটি দলও সামিট পুশ শুরু করে।

কিছুদূর যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। প্রবল বাতাসের সঙ্গে শুরু হয় তুষারঝড় ও তীব্র তুষারপাত। চারপাশে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় পথ চেনাও কঠিন হয়ে পড়ে। হাঁটুসমান নরম বরফে বারবার পা ডুবে যাচ্ছিল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে একপর্যায়ে অন্য দুটি দল ফিরে যায়। তবে শাকিল, হিদার ও অ্যালেক্স এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনজন একসঙ্গে এলব্রুসের চূড়ায় পৌঁছান।

চূড়ায় পৌঁছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ান শাকিল। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে এই সাফল্যকে নিজের পর্বতারোহণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন তিনি।

চূড়ায় পৌঁছানোর পর শাকিল বলেন, ২৫ সেপ্টেম্বরের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত থাকলেও এলব্রুসে আরোহণের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস অনেক সময় কার্যকর হয় না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁরা ফিরে আসেননি।

তিনি আরও বলেন, পাহাড় কখনো কখনো মানুষের শারীরিক শক্তির চেয়ে প্রতিকূলতার মধ্যেও কতদূর এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেটিই পরীক্ষা করে। দেশের পতাকা এলব্রুসের চূড়ায় ওড়াতে পেরে গর্বিত বলেও জানান তিনি।

অভিযানটির আয়োজন করে রাশিয়ান হাউজ ইন ঢাকা ও বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ-রাশিয়া ফ্রেন্ডশিপ অভিযান’ উপলক্ষে ঢাকার রাশিয়ান হাউজে শাকিলের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়।

এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন তিনি। অভিযান শেষে মস্কো হয়ে বাংলাদেশে ফেরার কথা রয়েছে তাঁর।

ককেশাস পর্বতমালায় অবস্থিত এলব্রুস মূলত দুটি চূড়া নিয়ে গঠিত। পশ্চিম চূড়াটির উচ্চতা ৫ হাজার ৬৪২ মিটার এবং পূর্ব চূড়ার উচ্চতা ৫ হাজার ৬২১ মিটার। দুটি চূড়াই প্রাচীন আগ্নেয়গিরির অংশ এবং বর্তমানে এলব্রুসকে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এলব্রুসের পূর্ব চূড়ায় প্রথম মানুষের আরোহণের ইতিহাস ১৮২৯ সালের। কাবার্দীয় পর্বতারোহী ও গাইড কিলার খাশিরভ ওই চূড়ায় পৌঁছান। পরে ১৮৭৪ সালে ফ্লোরেন্স ক্রফোর্ড গ্রোভের নেতৃত্বে একটি ব্রিটিশ-সুইস দল পশ্চিম চূড়ায় আরোহণ করে। এর মাধ্যমে পর্বতটির দুই চূড়াই মানুষের আরোহণের আওতায় আসে।

দূর থেকে বরফে ঢাকা এলব্রুসকে শান্ত মনে হলেও চূড়ার দিকে যাওয়ার পথে পর্বতারোহীদের বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। বরফ, হিমবাহ, প্রবল বাতাস এবং দ্রুত বদলে যাওয়া আবহাওয়া অভিযানকে কঠিন করে তুলতে পারে।

তুলনামূলক দীর্ঘ হলেও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল নয় এমন কিছু আরোহণপথ থাকায় এলব্রুস বিশ্বের পরিচিত পর্বতারোহণ গন্তব্যগুলোর একটি। সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ সাতটি শৃঙ্গ নিয়ে গঠিত ‘সেভেন সামিটস’-এর ইউরোপীয় শৃঙ্গ হিসেবেও এলব্রুস বিশেষ পরিচিত।

❤️
👏
🙂
😞

তুষারঝড় পেরিয়ে ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত এলব্রুসের চূড়ায় এভারেস্টজয়ী শাকিল

প্রকাশঃ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২৭

মস্কো, ২৮ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – হিমশীতল ঝড়ো হাওয়া, তীব্র তুষারপাত আর হাঁটুসমান নরম বরফ। কয়েক মিটারের বেশি দূরত্বও যখন দেখা যাচ্ছিল না, তখনও থামেননি বাংলাদেশের এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী ইকরামুল হাসান শাকিল। কঠিন আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টায় মাউন্ট এলব্রুসের চূড়ায় পৌঁছান তিনি। সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ান এই পর্বতারোহী।

৫ হাজার ৬৪২ মিটার উচ্চতার এলব্রুস ককেশাস পর্বতমালার সর্বোচ্চ চূড়া। ইউরোপ ও এশিয়ার সীমানা নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে ভৌগোলিক বিতর্ক থাকলেও সাধারণভাবে এটিকে ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে ধরা হয়। একই সঙ্গে এটি ইউরেশিয়ার সর্বোচ্চ সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হিসেবে পরিচিত।

এলব্রুস অভিযানে অংশ নিতে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন শাকিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ সেপ্টেম্বর ভোরে চূড়ায় ওঠার কথা ছিল। তবে আবহাওয়ার অবনতির কারণে অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থা সেই দিনের সামিট পুশ বাতিল করে।

এর আগে টানা দুই দিনের তুষারপাতে চূড়ার পথের বড় অংশ নরম বরফে ঢেকে যায়। ফলে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

পরদিন শুক্রবার রাতে আবার চূড়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন শাকিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহ-পর্বতারোহী হিদার এবং গাইড অ্যালেক্স। তাঁদের অনুসরণ করে আরও দুটি দলও সামিট পুশ শুরু করে।

কিছুদূর যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। প্রবল বাতাসের সঙ্গে শুরু হয় তুষারঝড় ও তীব্র তুষারপাত। চারপাশে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় পথ চেনাও কঠিন হয়ে পড়ে। হাঁটুসমান নরম বরফে বারবার পা ডুবে যাচ্ছিল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে একপর্যায়ে অন্য দুটি দল ফিরে যায়। তবে শাকিল, হিদার ও অ্যালেক্স এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনজন একসঙ্গে এলব্রুসের চূড়ায় পৌঁছান।

চূড়ায় পৌঁছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ান শাকিল। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে এই সাফল্যকে নিজের পর্বতারোহণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন তিনি।

চূড়ায় পৌঁছানোর পর শাকিল বলেন, ২৫ সেপ্টেম্বরের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত থাকলেও এলব্রুসে আরোহণের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস অনেক সময় কার্যকর হয় না। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁরা ফিরে আসেননি।

তিনি আরও বলেন, পাহাড় কখনো কখনো মানুষের শারীরিক শক্তির চেয়ে প্রতিকূলতার মধ্যেও কতদূর এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেটিই পরীক্ষা করে। দেশের পতাকা এলব্রুসের চূড়ায় ওড়াতে পেরে গর্বিত বলেও জানান তিনি।

অভিযানটির আয়োজন করে রাশিয়ান হাউজ ইন ঢাকা ও বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ-রাশিয়া ফ্রেন্ডশিপ অভিযান’ উপলক্ষে ঢাকার রাশিয়ান হাউজে শাকিলের হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়।

এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন তিনি। অভিযান শেষে মস্কো হয়ে বাংলাদেশে ফেরার কথা রয়েছে তাঁর।

ককেশাস পর্বতমালায় অবস্থিত এলব্রুস মূলত দুটি চূড়া নিয়ে গঠিত। পশ্চিম চূড়াটির উচ্চতা ৫ হাজার ৬৪২ মিটার এবং পূর্ব চূড়ার উচ্চতা ৫ হাজার ৬২১ মিটার। দুটি চূড়াই প্রাচীন আগ্নেয়গিরির অংশ এবং বর্তমানে এলব্রুসকে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এলব্রুসের পূর্ব চূড়ায় প্রথম মানুষের আরোহণের ইতিহাস ১৮২৯ সালের। কাবার্দীয় পর্বতারোহী ও গাইড কিলার খাশিরভ ওই চূড়ায় পৌঁছান। পরে ১৮৭৪ সালে ফ্লোরেন্স ক্রফোর্ড গ্রোভের নেতৃত্বে একটি ব্রিটিশ-সুইস দল পশ্চিম চূড়ায় আরোহণ করে। এর মাধ্যমে পর্বতটির দুই চূড়াই মানুষের আরোহণের আওতায় আসে।

দূর থেকে বরফে ঢাকা এলব্রুসকে শান্ত মনে হলেও চূড়ার দিকে যাওয়ার পথে পর্বতারোহীদের বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। বরফ, হিমবাহ, প্রবল বাতাস এবং দ্রুত বদলে যাওয়া আবহাওয়া অভিযানকে কঠিন করে তুলতে পারে।

তুলনামূলক দীর্ঘ হলেও প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল নয় এমন কিছু আরোহণপথ থাকায় এলব্রুস বিশ্বের পরিচিত পর্বতারোহণ গন্তব্যগুলোর একটি। সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ সাতটি শৃঙ্গ নিয়ে গঠিত ‘সেভেন সামিটস’-এর ইউরোপীয় শৃঙ্গ হিসেবেও এলব্রুস বিশেষ পরিচিত।