৫৬ দেশের প্রতিযোগিতা পেরিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের বৃত্তিতে এডিনবরায় এরা রব্বানি, সুযোগ পেয়েছিলেন অক্সফোর্ড-কেমব্রিজেও
- প্রকাশঃ ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৪৮
- / 3
সাফল্যের গল্প পড়তে পড়তে একসময় নিজেই এমন একটি গল্পের অংশ হয়ে উঠেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক এরা রব্বানি। যুক্তরাজ্য সরকারের পূর্ণ অর্থায়নে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে বর্তমানে এডিনবরায় পড়াশোনা করছেন তিনি। এর আগে অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও এডিনবরার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির সুযোগও পেয়েছিলেন।
এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অপরাধবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বিচার, শান্তি, নিরাপত্তা এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ধীরে ধীরে নিজের বিষয়কে ভিন্নভাবে দেখতে শুরু করেন তিনি।
তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তিনি যেসব সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন, সেগুলো কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক আলোচনায় দক্ষিণের দেশগুলোর মানুষের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতিও তিনি অনুভব করেন।
কেনিয়ায় একটি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা সেই উপলব্ধিকে আরও গভীর করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গবেষকদের সঙ্গে একই জায়গায় কাজ ও মতবিনিময়ের সুযোগ তাকে বুঝতে সাহায্য করে, গবেষণার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে শেখার সুযোগও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর বিশ্বের প্রতিযোগিতাপূর্ণ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বৃত্তির জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি শুরু করেন এরা। প্রায় নয় মাস ধরে প্রস্তুতি নেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তির শর্ত, অর্থায়নের সুযোগ এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্ক তুলনা করতে একটি তালিকাও তৈরি করেন।
লিংকডইন ও ইমেইলের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আবেদন প্রক্রিয়ায় আসলে কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা জানতে তাদের অভিজ্ঞতা শোনেন। আবেদনের প্রায় ছয় মাস আগে ব্যক্তিগত বিবৃতি লেখা শুরু করেন। একের পর এক খসড়া তৈরি করেন, যার অনেকগুলোই পরে তার নিজের কাছেই খুব একটা ভালো মনে হয়নি।
তবে আবেদন তৈরির সময় কোনো নির্দিষ্ট ছক অনুসরণ করতে চাননি তিনি। ভর্তি কমিটি কী শুনতে চাইতে পারে, তা অনুমান করার পরিবর্তে নিজের আগ্রহ, সমস্যা নিয়ে ভাবার ধরন এবং পড়াশোনার পেছনে নিজের প্রেরণাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
এরা মনে করেন, আবেদনকে আলাদা করে তুলতে এই নিজস্বতাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কঠিন দিক ছিল মানসিক চাপ সামলানো। নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা রাখা এবং কোথায় আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা মেনে নেওয়ার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হয়েছে তাকে।
কমনওয়েলথ বৃত্তির প্রতিযোগিতা ছিল আরও কঠিন। ৫৬টি দেশের আবেদনকারীরা এতে অংশ নেন এবং গ্রহণযোগ্যতার হার ছিল প্রায় শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ।
এই চাপ সামলাতে এরা নিজের চিন্তার ধরনেও পরিবর্তন আনেন। ‘আমি যদি সুযোগ না পাই’ এই ভাবনার বদলে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করতেন, ‘সুযোগ না পেলেও এই প্রক্রিয়া থেকে আমি কী নিয়ে বের হব?’ এই পরিবর্তন তাকে এমন বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ রাখতে সাহায্য করেছে, যেগুলো তার নিয়ন্ত্রণে ছিল।
অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এডিনবরাকে বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল একাধিক কারণ। এডিনবরার ‘গ্লোবাল ক্রাইম, জাস্টিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ বিষয়টি তার আগের গবেষণার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়। পাশাপাশি অর্থায়নের সুযোগও তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় বাছাইয়ের সময় শহরের কাছাকাছি সমুদ্রসৈকত আছে কি না, সেটিও তার ব্যক্তিগত বিবেচনার তালিকায় ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি এডিনবরার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার উদ্যোগে আইন গবেষক হিসেবে একটি কাজের সুযোগ পাওয়াও সিদ্ধান্তটিকে আরও দৃঢ় করে।
এডিনবরায় যাওয়ার পর নতুন পরিবেশ তার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এনেছে বলে জানান এরা। জার্মানি, গাজা, ইরান ও পাকিস্তানের বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ তাকে এমন কিছু ইতিহাস ও অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে দেখতে সাহায্য করেছে, যেগুলো আগে তিনি মূলত বইয়ে পড়েছেন।
অভিজ্ঞতাটি সহজ ছিল না। নতুন পরিবেশে অস্বস্তির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নিজের অর্থ ও সময়ের হিসাব রাখা এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে আলোচনাভিত্তিক শ্রেণিকক্ষে অংশ নেওয়া তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। তবু তিনি এটিকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলোর একটি হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এই সময় তার একাডেমিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত জগতকে আরও বিস্তৃত করেছে।
পেছনে ফিরে এরা মনে করেন, শুরু করার আগে জীবনের প্রতিটি বিষয় গুছিয়ে নেওয়া জরুরি নয়। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন নিজের সম্ভাবনা ও শেখার আগ্রহ প্রকাশের একটি সুযোগ, ইতিমধ্যে সবকিছু অর্জন করে ফেলেছেন তার প্রমাণ দেওয়ার পরীক্ষা নয়।
এ ধরনের সুযোগের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত মনে হওয়ার অপেক্ষা না করা। সুপারিশকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফেলে না রাখা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
তার মতে, দক্ষিণ এশিয়ার আলোচনায় অনেক সময় একটি দেশের কণ্ঠই বেশি প্রাধান্য পায়। সেখানে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার কারণ নেই। এটি একজন শিক্ষার্থীর শক্তি হতে পারে।
এরা তার এই পথচলায় সাবেক সহকর্মী, পরামর্শদাতা এবং পরিবারের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। সাবেক সহকর্মীদের কেউ প্রথম তাকে অক্সফোর্ডে পড়ার কথা ভাবতে উৎসাহ দেন। পরে অপরিচিত মানুষকে ইমেইল ও অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে যোগাযোগ করে কয়েকজন পরামর্শদাতার সহায়তা পান। বাবা-মায়ের উৎসাহও তাকে আবেদন করার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
এখন এরা পিএইচডি করার দিকে এগোতে চান। ভবিষ্যতে নিজের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছাও রয়েছে তার। যেসব শিক্ষার্থী হয়তো কখনো এমন সুযোগের কথা কল্পনাও করেনি, তাদের সামনে বৃহত্তর সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারলে সেটিকেই নিজের জন্য বড় প্রাপ্তি মনে করবেন তিনি।
এরা রব্বানির বিশ্বাস, স্বপ্ন কিছুটা অসম্ভব শোনাতেই পারে। কারণ স্বপ্ন দেখার অর্থই হলো পরিচিত সীমার বাইরে কিছু কল্পনা করা। আর সেই স্বপ্ন দেখার মুহূর্ত থেকেই তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ শুরু হয়।


























