ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি, কূটনৈতিক সুবিধা পেল পাকিস্তান?
- প্রকাশঃ ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৩:৩০
- / 10
ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পাকিস্তানের সমঝোতা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা । ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের (ডব্লিউএলএফ) সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং কূটনৈতিকভাবে বড় সুবিধা পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এই সমঝোতার ফলে ইসলামাবাদ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বিরল সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ট্রাম্পের ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের টোকেন বিক্রি থেকেই তিনি ৫০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির ক্রিপ্টো কার্যক্রম থেকে তার পরিবারের মোট আয় আরও কয়েকশ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এ বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয় ও ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসসি ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজিস একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটির ডলার-সমর্থিত স্টেবলকয়েন ‘ইউএসডি১’ সীমান্তপারের অর্থ লেনদেনে ব্যবহার করার সম্ভাবনা যাচাই করা।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ইসলামাবাদে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলে ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফের ছেলে জ্যাক উইটকফও ছিলেন। পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেবের সঙ্গে তিনি চুক্তিতে সই করেন। তবে ছয় মাস পার হলেও ইউএসডি১ ব্যবহারের কোনো পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু হয়নি। স্টেবলকয়েনটির জন্য কোনো লাইসেন্সও দেওয়া হয়নি এবং এটি ব্যবহার করে কোনো লেনদেন হয়েছে বলেও সরকারি তথ্য নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবায়ন না হলেও এই সমঝোতা পাকিস্তানকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে। করাচিভিত্তিক অর্থনীতিবিদ খুররম হুসাইন বলেন, “এই সমঝোতা মূলত যোগাযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম ছিল। এর পেছনে শক্ত কোনো নীতিগত ভিত্তি ছিল না। লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে পৌঁছানো এবং সেই লক্ষ্য সফল হয়েছে।” কানাডাভিত্তিক ব্যাংকিং ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম খলিলও একই মত পোষণ করেন। তার ভাষায়, “পুরো বিষয়টিই ছিল প্রভাবশালী মহলে প্রবেশাধিকার পাওয়ার একটি প্রচেষ্টা।”
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, পাকিস্তানে যখন আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণে বাড়ছে, তখন নতুন একটি স্টেবলকয়েন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কতটা। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশটিতে ৩৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। শুধু মে মাসেই রেমিট্যান্স এসেছে রেকর্ড ৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার।
ইব্রাহিম খলিল বলেন, যারা বর্তমানে টেথারের ইউএসডিটি ব্যবহার করছেন, তারা মূলত আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এড়িয়ে চলছেন। নতুন ইউএসডি১ চালু হলেও সেই বাস্তবতা বদলাবে না। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক লেনদেনে ইউএসডি১ ব্যবহার করলেও শেষ পর্যন্ত সেটিকে মার্কিন ডলারে রূপান্তর করতে হবে, যা অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
পাকিস্তান ইতোমধ্যে ভার্চুয়াল অ্যাসেট আইন পাস করে পাকিস্তান ভার্চুয়াল অ্যাসেট রেগুলেটরি অথরিটি (পিভিএআরএ) গঠন করেছে। সংস্থাটি ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স প্রদান ও তদারকির দায়িত্ব পালন করবে। এপ্রিল মাসে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতিও দেয়। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্সিং কার্যক্রম শুরু হয়নি।
একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এমওইউ কেবল প্রযুক্তিগত আলোচনা ও জ্ঞান বিনিময়ের জন্য। এতে কোনো নির্দিষ্ট স্টেবলকয়েন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রিপ্টো চুক্তির পর পাকিস্তান ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। গত বছর ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে হামলার পর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখার জন্য পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়। পরে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান, যা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের সময়ও পাকিস্তান মধ্যস্থতার ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে আসিম মুনিরের কূটনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেন। এদিকে পাকিস্তান সরকারের বর্তমান কর্মকর্তা বিলাল বিন সাকিব, যিনি আগে ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের উপদেষ্টা ছিলেন, এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ক্রিপ্টো উদ্যোগের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আস্থা ও যোগাযোগ পুনর্গঠন সম্ভব হয়েছে। হোয়াইট হাউস অবশ্য জানিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো স্বার্থের সংঘাত ছিল না।











