যুক্তরাজ্যের ২৭ বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থী এখন সংখ্যালঘু, বৃত্তি নীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক
- প্রকাশঃ ০২ জুলাই ২০২৬, ২০:১০
- / 18
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাতিগত প্রতিনিধিত্ব ও বৃত্তি নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যের ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্তরাজ্য-নিবাসী শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীরা এখন মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও কম। একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০টিতে কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয় ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর (BAME) শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বৈচিত্র্যভিত্তিক বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বহাল থাকায় দেশটিতে উচ্চশিক্ষার বৃত্তি নীতি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
দ্য টেলিগ্রাফ-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যের দুই ডজনের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে যুক্তরাজ্য-নিবাসী শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অথচ এর মধ্যে প্রায় এক ডজন বিশ্ববিদ্যালয় এখনও শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের সেইসব বৈচিত্র্যভিত্তিক বৃত্তি থেকে বাইরে রাখছে, যেগুলো মূলত BAME শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত।
এ ধরনের বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) এবং কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন। এসব বিশ্ববিদ্যালয় BAME শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।
শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী পরিবারের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় অন্যতম কম প্রতিনিধিত্বকারী গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও তাদের এ ধরনের কর্মসূচির বাইরে রাখা হচ্ছে বলে সমালোচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা এসব কর্মসূচিকে “বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক” বলে উল্লেখ করে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
ইউনিভার্সিটি অব বাকিংহামের রাজনীতিবিদ্যার অধ্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈচিত্র্যনীতি বিষয়ক সমালোচক এরিক কফম্যান বলেন, BAME-কেন্দ্রিক বৃত্তি ব্যবস্থা বজায় রাখার যৌক্তিকতা এখন আর নেই। তার ভাষায়, “এটি নিছকই বর্ণবাদী বৈষম্য। শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার পর এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়েছে।”
সম্প্রতি দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ডজনেরও বেশি বৃত্তি, বার্সারি ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের তুলনায় জাতিগত পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালে অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজে শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী পরিবারের শিক্ষার্থীর হার ছিল ৩ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে বর্তমানে কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয় ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশের বেশি। তারপরও শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবী শিক্ষার্থীরা বৈচিত্র্যভিত্তিক অধিকাংশ কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন।
রিফর্ম ইউকের শিক্ষা বিষয়ক মুখপাত্র সুয়েলা ব্রেভারম্যান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত অবিলম্বে জাতিগতভাবে বৈষম্যমূলক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং আবেদনকারীদের গায়ের রঙ নয়, মেধার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সমতা আইন ২০১০ অনুযায়ী সুবিধাবঞ্চিত বা কম প্রতিনিধিত্বকারী গোষ্ঠীর জন্য “পজিটিভ অ্যাকশন” গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। একই ধরনের কর্মসূচি ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এবং করদাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত কিছু কর্মসংস্থান কর্মসূচিতেও চালু রয়েছে।
হায়ার এডুকেশন স্ট্যাটিসটিক্স এজেন্সির তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, ২০২১ সালের আদমশুমারির জনসংখ্যার অনুপাতের তুলনায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যের ১৪৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৮০টিতে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব কম। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা ছিল ৬৫।
অভিজাত রাসেল গ্রুপভুক্ত ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫টিতেও শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার অনুপাতে কম। এক দশক আগে এই সংখ্যা ছিল ১০।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীরা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছেন। ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৩টি।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (ইউসিএল) শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীর হার ৪৮ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে অধ্যয়নরত কৃষ্ণাঙ্গ বা মিশ্র কৃষ্ণাঙ্গ জাতিগত পটভূমির শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে ২৩ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বৃত্তি দিচ্ছে। পাশাপাশি আফ্রিকা বা ক্যারিবীয় অঞ্চলের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন যুক্তরাজ্যভিত্তিক পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে এক হাজার পাউন্ডের অ্যামোস বার্সারি চালু রয়েছে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে শ্বেতাঙ্গদের হার ৪২ শতাংশ হলেও প্রকৌশল, চিকিৎসা, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ টিউশন ফি বহনকারী বৃত্তি চালু রয়েছে।
কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়টি মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যয়নরত যুক্তরাজ্য-নিবাসী কৃষ্ণাঙ্গ ও “গ্লোবাল মেজরিটি” পটভূমির শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্টশিপ প্রদান করছে। এর আওতায় সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে ১৮ হাজার ৬২ পাউন্ড ভাতা দেওয়া হয়।
এছাড়া ওয়েস্ট লন্ডন, গ্রিনউইচ, ওয়েস্টমিনস্টার, লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, গোল্ডস্মিথস কলেজ, সিটি সেন্ট জর্জেস এবং সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনেও অনুরূপ কর্মসূচি চালু রয়েছে।
ডোন্ট ডিভাইড আস প্রচারণা সংগঠনের পরিচালক অলকা সেহগাল কাথবার্ট বলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েরই এমন বৃত্তি বা আর্থিক সহায়তা প্রকল্প পরিচালনা করা উচিত নয়, যেখানে আবেদনকারীদের একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষিত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আলাদা সুবিধা দেওয়া হয়। তার মতে, এ ধরনের নীতি বিভাজন সৃষ্টি করে এবং ভুক্তভোগী হওয়ার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীর হার কমে যাওয়ার পেছনে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর শিক্ষাগত অগ্রগতিও ভূমিকা রেখেছে। তাই এ ধরনের বিশেষ সুবিধাভিত্তিক কর্মসূচির যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
অন্যদিকে গোল্ডস্মিথস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, শিল্প ও সৃজনশীল শিক্ষার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত করতে তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে এবং সামাজিক পটভূমির পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি অব্যাহত থাকবে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের একটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের বৈচিত্র্যভিত্তিক বৃত্তি কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের কম প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে তারা দাবি করেছে, ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের সাধারণ বার্সারি ব্যবস্থা যুক্তরাজ্যের অন্যতম উদার আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি।











