অর্থনীতি ইতিবাচক, তবু কেন চাপে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার?
- প্রকাশঃ ১২:০০:০৯ শনিবার, ৩০ জুন ২০২৬
- / 4
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের বাইরে এক পথবিক্রেতার স্টলে রাখা ওয়াল স্ট্রিট–লেখা একটি সাইনপ্লেট। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ইতিবাচক ধারায় থাকলেও দেশটির শেয়ারবাজারে বাড়ছে চাপ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শক্তিশালী ভোক্তা ব্যয় এবং ভোক্তা আস্থার উন্নতি অর্থনীতিকে শক্তিশালী অবস্থানে রাখলেও প্রযুক্তি খাতের শেয়ারদর পতন, সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের ঝুঁকি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জুন মাসে স্পেসএক্সের রেকর্ড গড়া প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার (আইপিও) প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের নতুন প্রধান কেভিন ওয়ার্শের প্রথম বৈঠকসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যেও বাজারে বৈপরীত্য দেখা যায়।
একদিকে ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচকের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির শক্ত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক পুরো মাসজুড়ে নিম্নমুখী ছিল। একসময় বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারও একটি সূচক অনুযায়ী ১০ শতাংশের বেশি কমেছে।
এদিকে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ অতিক্রম করলেও মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের দাম বেড়েছে এবং ফলন কমেছে।
ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জ্যানি মন্টগোমারি স্কটের প্রধান স্থির-আয় কৌশলবিদ গাই লে বাস বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লেও ভোক্তারা জ্বালানিবহির্ভূত পণ্য ও সেবায় ব্যয় অব্যাহত রেখেছেন। তার মতে, এটি দেখায় যে বছরের শুরুতে ধারণার তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অনেক বেশি স্থিতিশীল, সহনশীল এবং শক্তিশালী। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও বাড়তে পারে।
প্রকৃত সুদের হার বাড়ায় বদলাচ্ছে বাজারের চিত্র
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করা প্রকৃত সুদের হার বাড়তে থাকায় বিনিয়োগকারীরা নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।
ফেডপ্রধান কেভিন ওয়ার্শের কঠোর অবস্থানের পর বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক দফা সুদের হার বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। যদিও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আর্থিক পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই কঠোর হয়ে যাওয়ায় বাস্তবে সুদের হার আর বাড়ানো নাও হতে পারে।
এদিকে স্বর্ণ, বিটকয়েন, মাইক্রোসফট এবং মেটার মতো বিভিন্ন সম্পদের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ওয়াল স্ট্রিটে নতুন শেয়ার ও ঋণপত্র বিক্রি রেকর্ড গতিতে চলছে। এর বড় অংশ ব্যবহার হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগে। যদিও অনেক বিনিয়োগকারী এই খাতে অতিমূল্যায়নের ঝুঁকির কথা বলছেন, তবুও বিনিয়োগের গতি এখনো কমেনি।
শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল শেয়ারবাজারের মধ্যে তৈরি হওয়া এই বৈপরীত্য এতদিন বাজার সামাল দিতে পেরেছে। তবে প্রকৃত ঋণগ্রহণ ব্যয় দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষক কামাক্ষ্য ত্রিবেদী বলেন, যুদ্ধের আশঙ্কা কমে যাওয়া এবং তেলের দাম হ্রাস পাওয়ায় বাজার আবার অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তির দিকে নজর দিচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই শেয়ারের উচ্চ মূল্যায়নে প্রতিফলিত হয়েছে। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেই এই টানাপোড়েন সবচেয়ে বেশি এবং এটিই বর্তমানে বাজারের অস্থিরতার অন্যতম উৎস।
এআই খাতে বিনিয়োগে বদলে যাচ্ছে বাজার
বাজারের অস্থিরতার একটি বড় কারণ হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের দ্রুত এক খাত থেকে অন্য খাতে বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়া।
মার্চের শেষ দিকে যুদ্ধসংক্রান্ত উদ্বেগ কমে যাওয়ার পর থেকে সেমিকন্ডাক্টর সূচক ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। চলতি বছরে সূচকটির মূল্য বেড়েছে ৮৭ শতাংশ। একই সময়ে মাইক্রনের শেয়ার চার গুণ এবং ইন্টেল ও মার্ভেল টেকনোলজির শেয়ার প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
অন্যদিকে এনভিডিয়া, অ্যাপল এবং অ্যালফাবেটের নেতৃত্বাধীন ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ গ্রুপ চলতি বছরে নিম্নমুখী রয়েছে। অথচ ২০২৫ সালে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের মোট প্রবৃদ্ধির প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছিল এই সাত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধি ও লভ্যাংশ থেকে।
ঋণ বাড়ায় বদলাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব
অনেক বিনিয়োগকারীর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো নির্মাণে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল ব্যয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গত বছরের শেষ দিকে ওরাকলসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ব্যাপক ঋণ নেওয়া শুরু করার পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
গত ১২ মাসে অ্যামাজন ও অ্যালফাবেট বিভিন্ন মুদ্রায় প্রায় ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বন্ড ইস্যু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ-যোগ্য বন্ড বিক্রির পরিমাণ ইতোমধ্যেই ২০২৫ সালের মোট বিক্রির পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে। বিএনপি পারিবাসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর এই সংখ্যা ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ওকলাহোমাভিত্তিক লংবো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেক ডলারহাইড বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ নির্মাতাদের জন্য ইতিবাচক হলেও যেসব প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তিতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছে, তারা এখনো প্রত্যাশিত আর্থিক সুফল পাচ্ছে না। তার মতে, এ কারণেই চলতি বছরে ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেনের শেয়ারদর চাপে রয়েছে।
অনেক বিনিয়োগকারীর আশঙ্কা, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর আরও কমতে পারে। গত সপ্তাহে ইউবিএস তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে সেমিকন্ডাক্টর ও হার্ডওয়্যার খাতে বিনিয়োগ কমিয়েছে। তাদের ধারণা, শেয়ারদর কমে যাওয়ায় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোয় মূলধনি ব্যয় কমাতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমনটি হলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। কারণ, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি।
গাই লে বাস বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি করপোরেট বিনিয়োগ। সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী কয়েক বছরে ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূলধনি ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। তাই এই বিনিয়োগ অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
তবে তার মতে, মূলধনি ব্যয় কমে যাবে বলে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার একাধিকবার ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে।
জেক ডলারহাইড বলেন, বাজার এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে সামান্য আতঙ্ক তৈরি হলেই অনেক বিনিয়োগকারী সেটিকে নতুন করে শেয়ার কেনার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

























