শরণার্থীদের কর্মসংস্থান ৬৭%, তবু আবাসন নীতিতে প্রশ্ন—জার্মানির ‘ইন্টিগ্রেশন অ্যাক্ট’-এর ১০ বছর
- প্রকাশঃ ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৪০
- / 16
বার্লিন, ৯ আগস্ট, (প্রজন্ম কথা) – জার্মানিতে শরণার্থীদের সমাজ ও শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে চালু হওয়া ‘ইন্টিগ্রেশন অ্যাক্ট’ এক দশক পূর্ণ করেছে। ভাষা ও একীভূতকরণ কোর্স, দ্রুত কর্মসংস্থান এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি আইনে শরণার্থীদের জন্য কিছু বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছিল। এক দশক পর বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে, এসব উদ্যোগের ফলে শ্রমবাজারে শরণার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যদিও বসবাসের বিধিনিষেধসহ কিছু নীতির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০১৫ সালে প্রধানত সিরিয়া থেকে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী জার্মানিতে আসার পর অভিবাসন নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। একদিকে শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর পক্ষে জনসমর্থন ছিল, অন্যদিকে অভিবাসনের মাত্রা ও এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছিল।
এই পরিস্থিতিতে তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলের নেতৃত্বাধীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন, ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির জোট সরকার ‘সহায়তা ও দায়িত্ব’ নীতির ভিত্তিতে আইনটি প্রণয়ন করে। শরণার্থীদের জার্মান সমাজে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি তাদের ওপর কিছু দায়িত্ব আরোপ করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
আইনের আওতায় ভাষা ও একীভূতকরণ কোর্সের পরিধি বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে নতুন আসা শরণার্থীদের দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর মতো নিরাপদ পরিস্থিতি ছিল না, তাদের নির্দিষ্ট শর্তে তিন বছরের কারিগরি প্রশিক্ষণ শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষ করার পর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আরও দুই বছর কাজের সুযোগও রাখা হয়েছিল।
তবে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতাও ছিল। ভাষা ও একীভূতকরণ কোর্সে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে সামাজিক কল্যাণ ভাতা কমানোর মতো ব্যবস্থা রাখা হয়। পাশাপাশি বড় শহরগুলোতে শরণার্থীদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকাতে তাদের জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসের জন্য বণ্টন করা হয়।
এই আবাসন ব্যবস্থার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জার্মানির ইনস্টিটিউট ফর এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের মাইগ্রেশন, ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল লেবার স্টাডিজ বিভাগের প্রধান হার্বার্ট ব্র্যুকার।
তার মতে, শরণার্থীদের তুলনামূলকভাবে বেশি পাঠানো হয়েছিল অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং উচ্চ বেকারত্বের এলাকাগুলোতে। ফলে যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, সেখানে বসবাসের বাধ্যবাধকতা শ্রমবাজারে তাদের প্রবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তবে কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্র্যুকার। তার মতে, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলেও প্রশিক্ষণে ভালোভাবে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ শেষ করার সুযোগ দেওয়া হলে তারা ভাষা শেখা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী হন। পরবর্তী সময়ে তারা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবদান রাখার সুযোগও পান।
ব্র্যুকারের মূল্যায়নে, জার্মানিতে শরণার্থীদের একীভূত হওয়ার পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণার চেয়ে ভালো। অন্যান্য অভিবাসীদের তুলনায় শরণার্থীদের শ্রমবাজারে প্রবেশের গতি ধীর হলেও ১০ বছর পর তাদের কর্মসংস্থানের হার ৬৫ থেকে ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হার জার্মানির জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কম। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে নরওয়ের সঙ্গে জার্মানিও এ ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ভাষা শিক্ষা, একীভূতকরণ কোর্স এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়াকে এই অগ্রগতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
ইন্টিগ্রেশন কোর্সে বিনামূল্যে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করার পরিকল্পনা থেকেও জার্মান সরকার আংশিকভাবে সরে এসেছে। ২০২৬ সালের জুন থেকে ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের আবার এসব কোর্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি জার্মানিতে দীর্ঘমেয়াদি থাকার নিশ্চয়তা নেই এমন ব্যক্তিরাও নির্দিষ্ট শর্তে এতে অংশ নিতে পারছেন।
ব্র্যুকারের মতে, তুলনামূলক কম ব্যয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ ত্বরান্বিত করার কার্যকর উপায় হচ্ছে ইন্টিগ্রেশন কোর্স। তার হিসাবে, কোর্স শেষ করার পর কর্মসংস্থানের হার ৫ থেকে ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে এসব কোর্সে সরকারি অর্থায়ন কমিয়ে দিলে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে এবং সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার ওপর নির্ভরতা দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ব্র্যুকার মনে করেন, আশ্রয়প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর শরণার্থীদের বসবাসের ওপর থাকা কিছু সীমাবদ্ধতা শিথিল করা প্রয়োজন। তার প্রস্তাব, জার্মানিতে আসার এক মাসের মধ্যেই শরণার্থীদের ইন্টিগ্রেশন কোর্স শুরু করার সুযোগ দেওয়া এবং আশ্রয়ের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা।
তার মতে, এতে সুরক্ষার অধিকারী ব্যক্তিরা দ্রুত সমাজে একীভূত হওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে যাদের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার নেই, তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে জার্মানির এক্সপার্ট কাউন্সিল অন ইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড মাইগ্রেশনের হোলগার কোলব কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মধ্যে আরও সমন্বয়ের পাশাপাশি আইনগত কাঠামো সহজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
কোলবের মতে, ২০১৬ সালের আইনটির নাম ‘ইন্টিগ্রেশন অ্যাক্ট’ হলেও জার্মানিতে থাকা সব অভিবাসীর একীভূতকরণ এই আইনের আওতায় পড়ে না। মূলত শরণার্থী হিসেবে আসা ব্যক্তিদের জন্যই এর বিধান তৈরি হয়েছিল। তাই আইনের আওতা ও উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট করা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুন সহজ করা প্রয়োজন।



























