চীনে বিদেশিদের চাকরি পাওয়া গেলেও ওয়ার্ক ভিসা কেন এখনো কঠিন
- প্রকাশঃ ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২০:১৯
- / 3
বেইজিং, ১০ আগস্ট ২০২৬, (প্রজন্ম কথা) – চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশটির বাড়তে থাকা ভূমিকা বিদেশি তরুণ পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করছে। তবে চীনে চাকরি পাওয়া অনেকের জন্য শেষ ধাপ নয়। নিয়োগদাতার স্পনসরশিপ, যোগ্যতা যাচাই, পয়েন্টভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং বিপুল নথিপত্রের কারণে বৈধভাবে কাজের অনুমতি বা ওয়ার্ক ভিসা পাওয়া এখনও অনেক বিদেশির জন্য জটিল প্রক্রিয়া।
স্পেনের বার্সেলোনার অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইতরের অভিজ্ঞতাতেও বিষয়টি স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চীনে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি সাংহাইয়ে মাস্টার্স করেন এবং পরে একটি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। কিন্তু চাকরি পাওয়ার পর তাঁর সামনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় ওয়ার্ক ভিসা।
চীনে বিদেশি গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির বাজারে প্রবেশও সহজ নয়। স্থানীয় বিপুলসংখ্যক যোগ্য প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশিদের আবেদনও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে না। আইতরের চীনা ভাষাজ্ঞান তাঁকে কিছুটা সুবিধা দিলেও স্থানীয় জনপ্রিয় নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ‘বস ঝিপিন’ বিদেশিদের জন্য খুব সহজলভ্য নয় বলে তিনি মনে করেন।
চাকরি পাওয়ার পর শুরু হয় অনুমতির দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পয়েন্টভিত্তিক যোগ্যতা, কাজের শ্রেণি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কারণে তাঁর ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন ছয় মাস পরও প্রক্রিয়াধীন ছিল।
আইতর মনে করেন, চীনের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করায় তিনি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। তাঁর মতে, অনেক শিক্ষিত ও দক্ষ বিদেশি চীনে বৈধভাবে কাজের সুযোগ পেতে সমস্যায় পড়ছেন। পরিবারভিত্তিক ভিসার সুযোগও তুলনামূলক সীমিত এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের স্পনসরশিপ ছাড়া ওয়ার্ক ভিসা পাওয়া কঠিন।
চীনে বিদেশিদের কর্মসংস্থানের প্রধান পথগুলোর একটি হলো জেড ভিসা। এর জন্য সাধারণত নিয়োগদাতার স্পনসরশিপের পাশাপাশি শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক নথি প্রয়োজন হয়। এই ব্যবস্থায় ‘এ’ শ্রেণি উচ্চপর্যায়ের প্রতিভাবানদের জন্য, ‘বি’ শ্রেণি অধিকাংশ দক্ষ পেশাজীবীর জন্য এবং ‘সি’ শ্রেণি অপেক্ষাকৃত অস্থায়ী বা মৌসুমি কর্মীদের জন্য নির্ধারিত।
গত বছর তরুণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করতে চীন ‘কে ভিসা’ চালু করে। তবে ভিসা পরামর্শক আনা চেনের মতে, এর আওতা সীমিত এবং মূলত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন প্রযুক্তি পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো কে ভিসা আবেদন সফল হতে দেখেননি বলে জানিয়েছেন।
চীনের চাকরির বাজারে বিদেশিদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রতিযোগিতা। সাংহাইয়ের সাবেক নিয়োগকর্তা মার্শাল মা বলেন, মহামারির পর শহরটির চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অনেক পদে স্থানীয় ভাষায় দক্ষ তরুণ চীনা কর্মী তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া যায়। বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে বেতন ও ছুটিসহ বিভিন্ন সুবিধার প্রত্যাশাও তুলনামূলক বেশি বলে তাঁর মত।
বিদেশি কর্মীদের চাহিদা কমার পেছনে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিবর্তনেরও ভূমিকা রয়েছে। ২০২৩ সালের পর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বেশ কিছু আঞ্চলিক সদর দপ্তর চীনে কার্যক্রম সংকুচিত করায় বিদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগও কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। একই সঙ্গে ভিসা, সামাজিক বিমা ও অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়োগদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
চীনে বিদেশিদের দৈনন্দিন জীবন সহজ করতে অবশ্য কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে আলিপে ও উইচ্যাট পের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আন্তর্জাতিক ব্যাংক কার্ড ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো এবং নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পাসপোর্টভিত্তিক পরিচয় যাচাইয়ের কারণে বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদেশিরা এখনও কিছু সমস্যার মুখোমুখি হন।
বিদেশি কর্মীদের অভিজ্ঞতা অবশ্য সবার ক্ষেত্রে একই নয়। ব্রিটিশ-স্প্যানিশ নাগরিক মার্কোস সাবিও লিংকডইনের মাধ্যমে বেইজিংয়ে সফটওয়্যার খাতে চাকরি পান। তাঁর প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ ভিসা প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে। চীনা, ইংরেজি, স্প্যানিশ ও কিছু রুশ ভাষায় দক্ষতা থাকায় চীনের চাকরির বাজারে নিজের ভাষাগত সক্ষমতাকে তিনি বাড়তি সুবিধা হিসেবে দেখেন।
বিদেশিদের জন্য চীনের আকর্ষণও বজায় রয়েছে। ২০২৫ সালের ইন্টারন্যাশনস জরিপে ৪৬টি গন্তব্যের মধ্যে চীন ষষ্ঠ অবস্থানে ছিল। ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত অর্থনীতি ও দৈনন্দিন সুবিধার ক্ষেত্রে সেখানে থাকা বিদেশিরা তুলনামূলক সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তবে ভাষাগত বাধা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ডিজিটাল সেবায় মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা এখনও বিদেশিদের অভিজ্ঞতার অংশ।
মালয়েশিয়ার নাগরিক জেনস লির অভিজ্ঞতাতেও চীনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকলেও চীনের বিশাল বাজার, দ্রুতগতির অর্থনীতি এবং কর্মপরিবেশ পেশাগত শিক্ষা ও ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ তৈরি করে।
ফলে চীনে বিদেশিদের জন্য সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ নয়। তবে চাকরি পাওয়া এবং সেই চাকরিতে বৈধভাবে কাজের অনুমতি পাওয়া দুটি পৃথক বিষয়। নিয়োগদাতার স্পনসরশিপ, পেশাগত যোগ্যতা, ভাষাগত সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারাই বিদেশি কর্মীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
























