সন্তান জন্ম দিয়ে মার্কিন নাগরিকত্ব, ‘বার্থ ট্যুরিজমে’ বছরে কত মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে যান?
- প্রকাশঃ ১০ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১০
- / 2
ওয়াশিংটন, ১০ আগষ্ট, (প্রজন্ম কথা) – সন্তানের জন্মের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নিয়ে আবারও বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ধরনের ভ্রমণ বন্ধ এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ঠিক কতজন বিদেশি নারী যুক্তরাষ্ট্রে যান, তার নির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই।
‘বার্থ ট্যুরিজম’ বলতে সাধারণভাবে এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যখন কোনো বিদেশি নাগরিক সন্তানের জন্মের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেন, যাতে সন্তান দেশটির জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতি সাধারণভাবে দেশটির মাটিতে জন্ম নেওয়া শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের পরিধি সীমিত করা এবং বার্থ ট্যুরিজমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। এ নিয়ে নির্বাহী আদেশও জারি করা হয়েছে। তবে এর আগের উদ্যোগ আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতেও বিতর্ক হয়েছে।
বছরে কত শিশুর জন্ম হচ্ছে
মার্কিন রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি ঠিকানাধারী মায়েদের গর্ভে ৯ হাজার ৫০০-এর বেশি শিশুর জন্ম হয়েছে। জন্মনিবন্ধনের সময় মায়ের ঠিকানা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছিল, এমন তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে।
একই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মোট প্রায় ৩৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়। অর্থাৎ বিদেশি ঠিকানাধারী মায়েদের সন্তান মোট জন্মের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে এই সংখ্যা সরাসরি ‘বার্থ ট্যুরিজম’-এর সংখ্যা হিসেবে ধরা যায় না। কোনো মা বিদেশি ঠিকানার হলেও তিনি সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন কি না, সেই তথ্য এই পরিসংখ্যানে আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের (এমপিআই) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে। তাদের অনুমান, বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২০ হাজার থেকে ২৬ হাজার শিশুর জন্ম হতে পারে। এই সংখ্যা দেশটির মোট বার্ষিক জন্মের আনুমানিক শূন্য দশমিক ৫ থেকে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
তবে এমপিআইও বলছে, প্রকৃত সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ, কোনো বিদেশি নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন কি না, সেটি কেবল জন্মনিবন্ধনের তথ্য থেকে নিশ্চিত করা যায় না।
এমপিআইয়ের সহযোগী নীতি বিশ্লেষক কলিন পুটজেল-কাভানাফের মতে, একজন নারীর যুক্তরাষ্ট্রে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ধারণ করাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। এমন ঘটনাও ঘটতে পারে, যখন কেউ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এসে পরে জরুরি চিকিৎসাজনিত কারণে সেখানে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হন।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কী
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতি ‘জুস সলি’ বা ‘ভূমির অধিকার’ নামে পরিচিত। দেশটির সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীতে নাগরিকত্বের এই ভিত্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া শিশুরা মা-বাবার নাগরিকত্ব বিবেচনা ছাড়াই মার্কিন নাগরিকত্ব পায়। তবে এর কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে।
যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে দায়িত্ব পালনরত বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তান এবং কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে বিদেশি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় জন্ম নেওয়া শিশু এই সাধারণ নিয়মের আওতায় পড়ে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের বিধানও এক নয়।
পুয়ের্তো রিকো, গুয়াম ও ইউএস ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে জন্ম নেওয়া শিশুরা সাধারণভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পায়। অন্যদিকে আমেরিকান সামোয়ায় জন্ম নেওয়া শিশুরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিক হয় না; তাদের ‘নন-সিটিজেন ন্যাশনাল’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন উদ্যোগের একটি অংশ জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধতা আরোপের সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুর মা-বাবার নাগরিকত্ব ও আইনগত অবস্থার কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে কোনো মা-বাবার বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, বিদেশি সরকারের হয়ে কাজ করা, প্রতারণার মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা এবং এমন কিছু মার্কিন অঞ্চলে বসবাসের মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ফেডারেল আইনে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিধান প্রযোজ্য নয়।
এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের কলিন পুটজেল-কাভানাফ। তার মতে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য কি না, সেটি কীভাবে এবং কার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। অন্য একটি নির্বাহী আদেশে বার্থ ট্যুরিজম বন্ধে পররাষ্ট্র দপ্তর ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ম আরও কঠোর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করাই নিজে থেকেই সব পরিস্থিতিতে বেআইনি নয়। মূলত পর্যটন ভিসার শর্ত ভঙ্গ, প্রতারণা বা ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহারের মতো বিষয় আইনি সমস্যার কারণ হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের আদেশে বার্থ ট্যুরিজম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টে কী হয়েছে
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময়ও উঠে আসে। সরকারের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানকে নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগ বার্থ ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করেছে। সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা ডি জন সাওয়ার আদালতে বলেন, বর্তমান বিশ্বে বিপুলসংখ্যক মানুষ সহজেই বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন এবং সেখানে সন্তান জন্ম দিলে সেই সন্তান মার্কিন নাগরিক হতে পারে।
তবে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসসহ বিচারপতিরা সংবিধানের বর্তমান বিধানের সঙ্গে এই যুক্তির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি প্রশাসনের ব্যাখ্যা গ্রহণ করেননি।
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে বার্থ ট্যুরিজমের মাধ্যমে ‘কয়েক লাখ’ শিশুর জন্ম হয়েছে বলে দাবি করেছেন। তবে প্রদত্ত তথ্যে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ বা নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তিনি এই সংখ্যা প্রতিবছরের, নাকি দীর্ঘ সময়ের মোট সংখ্যা, সেটিও স্পষ্ট করেননি।
এ কারণেই বার্থ ট্যুরিজমের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সিডিসির বিদেশি ঠিকানাধারী মায়েদের সন্তান জন্মের তথ্য একটি ধারণা দেয়, আর এমপিআইয়ের হিসাব সম্ভাব্য বার্থ ট্যুরিজমের সংখ্যা কিছুটা বেশি হতে পারে বলে ইঙ্গিত করে। তবে কোনো পরিসংখ্যানই যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিতে আসা বিদেশি নারীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্দেশ করে না।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রায় সব ক্ষেত্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশে রয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকোসহ মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে এ ধরনের বিধান কার্যকর। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বড় ধরনের শর্ত ছাড়া জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ম তুলনামূলকভাবে সীমিত। সেখানে শিশুর মা-বাবার অন্তত একজন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা হলে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নীতি, অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রকৃত পরিমাণ। তবে প্রতিবছর ঠিক কতজন নারী শুধুমাত্র সন্তানকে মার্কিন নাগরিক করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যান, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি সংখ্যা এখনো নেই।

























