ঢাকা ০৬:২৮ , Thu, ০৩ Sep ২০২৬
ইউরোপ
জার্মানি

জার্মানিতে উচ্চ বেতনের চাকরি ও জীবনযাত্রার খরচ, কোন শহরে সঞ্চয়ের সুযোগ বেশি?

আয়ান সরকার
  • প্রকাশঃ ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:০৮
  • / 15
জার্মানিতে বেতনের পাশাপাশি শহরভেদে আবাসন ও জীবনযাত্রার খরচও সঞ্চয়ের পরিমাণে বড় প্রভাব ফেলে ছবি: প্রজন্ম কথা

বার্লিন, ৩ সেপ্টেম্বর (প্রজন্ম কথা) – মাসের শুরুতে বেতন হিসেবে ব্যাংক হিসাবে ঢুকল ৩ হাজার ৫০০ ইউরো। হিসাবটা দেখে স্বস্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু বাড়িভাড়া ১ হাজার ১৫০ ইউরো, খাবারে ৩৫০, যাতায়াত, ফোন, ইন্টারনেট ও অন্যান্য খরচে আরও কয়েকশ ইউরো চলে যাওয়ার পর মাস শেষে হাতে থাকল প্রায় ১ হাজার ৬০০ ইউরো। জার্মানিতে ভালো বেতনের চাকরি করেও একজন বিদেশি কর্মীর মাসিক জীবনের হিসাব অনেকটা এমন হতে পারে। তাই দেশটিতে চাকরির ক্ষেত্রে শুধু বেতনের অঙ্ক দেখলেই পুরো চিত্র বোঝা যায় না, কোন পেশায় কত আয়, কোন শহরে কত খরচ এবং কর ও সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ কত টাকা কেটে যায়, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

জার্মানির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যম বার্ষিক মোট আয় ছিল ৫৪ হাজার ৬৬ ইউরো, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৪ হাজার ৫০৬ ইউরো। একই সময়ে পূর্ণকালীন কর্মীদের গড় মাসিক মোট আয় ছিল ৪ হাজার ৭৮৪ ইউরো। মধ্যম আয়কে সাধারণ কর্মীর আয়ের তুলনায় বেশি প্রতিনিধিত্বশীল সূচক হিসেবে দেখা হয়, কারণ উচ্চ বেতনের একটি অংশ গড় হিসাবকে ওপরে নিয়ে যেতে পারে। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে পূর্ণকালীন কর্মীদের শীর্ষ ১০ শতাংশের বার্ষিক আয় ছিল কমপক্ষে ১ লাখ ৭১৯ ইউরো, আর নিচের ১০ শতাংশের আয় ছিল ৩৩ হাজার ৮২৮ ইউরো বা তার কম।

কোন পেশায় বেতন বেশি

জার্মানিতে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার উন্নয়ন, প্রকৌশল, গাড়ি শিল্প, বিজ্ঞান, ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজের সুযোগ তুলনামূলক বেশি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মধ্যম বার্ষিক বেতন প্রায় ৬৬ হাজার ৭৫০ ইউরো। মধ্যপর্যায়ের সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা প্রায় ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার ইউরো এবং অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো পর্যন্ত আয় করতে পারেন। প্রকৌশল ও গাড়ি শিল্পে বার্ষিক বেতন সাধারণত ৫৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার ইউরোর মধ্যে শুরু হয়ে অভিজ্ঞ পর্যায়ে ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত যেতে পারে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের বেতন প্রায় ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো এবং পরিচালনা পর্যায়ে ১ লাখ ৫০ হাজার ইউরোর বেশি হতে পারে। বিজ্ঞান, ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্পে বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার ইউরো এবং অভিজ্ঞ পর্যায়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে। চিকিৎসা ও নার্সিং পেশায় চাহিদা বেশি থাকলেও বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে জার্মান ভাষা এবং পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ।

কোন শহরে বেতন বেশি

জার্মানির শহর ও রাজ্যভেদে বেতনের পার্থক্য রয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্টকে ঘিরে হেসেন রাজ্যে পূর্ণকালীন কর্মীদের গড় মাসিক মোট বেতন প্রায় ৫ হাজার ২৮৫ ইউরো। হামবুর্গে প্রায় ৫ হাজার ১০০, বার্লিনে ৫ হাজার ৬০ এবং বাডেন-ভুর্টেমবার্গে প্রায় ৫ হাজার ৩৪ ইউরো। বাভারিয়ায় গড় বেতন প্রায় ৪ হাজার ৯৫৩ ইউরো এবং উত্তর রাইন-ভেস্টফালিয়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৮৯ ইউরো। পূর্বাঞ্চলের স্যাক্সনিতে এই পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ১৪৩ ইউরো।

তবে বেশি বেতন মানেই বেশি সঞ্চয়, এমনটি সব ক্ষেত্রে হয় না। মিউনিখে বেতন তুলনামূলক বেশি হলেও আবাসন ব্যয়ও বেশি। একই পর্যায়ের একজন অভিজ্ঞ সফটওয়্যার প্রকৌশলী মিউনিখে বছরে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ইউরো আয় করতে পারেন। বার্লিনে একই পর্যায়ের আয় প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ইউরো হলেও তুলনামূলক কম আবাসন ব্যয়ের কারণে দুই শহরের প্রকৃত সঞ্চয়ের ব্যবধান অনেকটাই কমে আসতে পারে।

জার্মানিতে বয়স বাড়ার সঙ্গে সাধারণত আয়ও বাড়ে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যম বার্ষিক আয় প্রায় ৪৮ হাজার ৯৫ ইউরো। ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে তা ৫৪ হাজার ২৫২ ইউরো এবং ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৫৬ হাজার ৭৬৭ ইউরো। ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যম আয় প্রায় ৫৬ হাজার ৯৩১ ইউরো। ৫০ থেকে ৫৪ বছর বয়সে তা ৫৭ হাজার ২৭ ইউরো এবং ৫৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সে ৫৭ হাজার ২৮৭ ইউরো। ৬০ থেকে ৬৪ বছর বয়সে মধ্যম আয় কিছুটা কমে প্রায় ৫৫ হাজার ৬০৫ ইউরো হয়েছে।

বেতন থেকে কত টাকা কেটে যায়

জার্মানিতে বেতন হাতে পাওয়ার আগে আয়কর ও সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন অবদান কেটে নেওয়া হয়। পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং বেকারত্ব বিমায় কর্মীর অংশ থাকে। করের পরিমাণ নির্ভর করে আয়, বৈবাহিক অবস্থা, কর শ্রেণি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর। কেউ গির্জার সদস্য হিসেবে নিবন্ধিত থাকলে আয়করের ওপর অতিরিক্ত গির্জা করও দিতে হয়।

এই কারণে একই মোট বেতন হলেও দুই কর্মীর হাতে থাকা অর্থ এক হতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে একক ব্যক্তি, প্রথম কর শ্রেণি এবং গির্জা কর না দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৪ হাজার ৮৫০ ইউরো মোট মাসিক বেতন থেকে আনুমানিক ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯৫০ ইউরো হাতে থাকতে পারে। প্রকৃত পরিমাণ ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হবে।

ধরা যাক, বার্লিনে একজন একক সফটওয়্যার প্রকৌশলীর বার্ষিক মোট বেতন ৭০ হাজার ইউরো। মাসে মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৮৩৩ ইউরো। কর ও সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্তনের পর ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ইউরো আসতে পারে। এরপর এক শয্যার বাসার ভাড়া প্রায় ১ হাজার ১৫০ ইউরো, খাবারে ৩৫০ ইউরো এবং যাতায়াত, ফোন, ইন্টারনেট ও অন্যান্য পরিষেবায় প্রায় ৪০০ ইউরো ব্যয় হলে মাস শেষে হাতে থাকতে পারে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ইউরো।

মিউনিখে একই বেতন হলে বেশি আবাসন ব্যয়ের কারণে অবশিষ্ট অর্থ প্রায় ১ হাজার ২০০ ইউরোতে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ একই চাকরি ও একই বেতন হলেও শহর বদলালে মাস শেষে সঞ্চয়ের পরিমাণে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

জার্মানিতে বসবাসের খরচ

বড় শহরগুলোর মধ্যে মিউনিখে আবাসন ব্যয় সবচেয়ে বেশি। শহরের কেন্দ্রে এক শয্যার বাসার মাসিক ভাড়া প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ইউরো। ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ ও স্টুটগার্টে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ইউরো এবং বার্লিনে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭৫ ইউরো ধরা হয়েছে। ছোট শহরগুলোতে ভাড়া তুলনামূলক কম। লাইপজিগ, ডর্টমুন্ড ও হ্যানোভারের মতো শহরে এক শয্যার বাসার ভাড়া প্রায় ৬৫০ থেকে ৯৫০ ইউরোর মধ্যে হতে পারে।

এর বাইরে একক ব্যক্তির মাসিক খাবারের খরচ প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ইউরো, বিদ্যুৎ, অন্যান্য পরিষেবা ও ইন্টারনেটে প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০ ইউরো এবং গণপরিবহনের মাসিক টিকিটে ৫৮ ইউরো খরচ হতে পারে। পরিবারপ্রতি রেডিও ও টেলিভিশন ব্যবহারের জন্য মাসিক ১৮ দশমিক ৩৬ ইউরো ফিও দিতে হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সুইজারল্যান্ডের নাগরিকরা সাধারণত আলাদা কাজের অনুমতি ছাড়াই জার্মানিতে কাজ করতে পারেন। অন্য দেশের দক্ষ কর্মীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কাজ ও বসবাসের অনুমতি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীল কার্ডের জন্য ২০২৬ সালে সাধারণ বার্ষিক বেতনের সীমা ৫০ হাজার ৭০০ ইউরো। ঘাটতি রয়েছে এমন পেশা, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কর্মী এবং সাম্প্রতিক স্নাতকদের জন্য সীমাটি ৪৫ হাজার ৯৩৪ ইউরো।

যোগ্যতার স্বীকৃতি থাকা বিদেশি কর্মীরা নির্দিষ্ট চাকরির ভিত্তিতে দক্ষ কর্মী হিসেবে বসবাসের অনুমতিও পেতে পারেন। আর চাকরি না থাকলেও যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য সুযোগ কার্ডের মাধ্যমে জার্মানিতে গিয়ে সর্বোচ্চ ১২ মাস চাকরি খোঁজার সুযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও আর্থিক সামর্থ্যের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণার মতো কিছু ক্ষেত্রে ইংরেজিতে কাজের সুযোগ পাওয়া গেলেও নার্সিংসহ বেশ কিছু পেশায় জার্মান ভাষা এবং বিদেশি শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রয়োজন।

ন্যূনতম মজুরি কত

জার্মানিতে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আইনগত ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৩ দশমিক ৯০ ইউরো হয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এটি বেড়ে ১৪ দশমিক ৬০ ইউরো হওয়ার কথা রয়েছে।

জার্মানিতে চাকরির বেতন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গড় বেতনের পাশাপাশি মধ্যম বেতন দেখা বেশি কার্যকর। কারণ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, অর্থ খাত এবং অভিজ্ঞ প্রযুক্তি পেশাজীবীদের বেশি আয় গড় বেতনকে ওপরে নিয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালের সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, পূর্ণকালীন কর্মীদের মাত্র একাংশ গড় বেতনের ওপরে আয় করেন।

এ ছাড়া জার্মানিতে আইন অনুযায়ী ১৩তম মাসের বেতন বাধ্যতামূলক নয়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান বড়দিন বা ছুটির সময় অতিরিক্ত ভাতা দেয়। তাই চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে মূল বেতনের পাশাপাশি বোনাস, ছুটির ভাতা, পেনশন সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা চুক্তিতে কীভাবে উল্লেখ আছে, সেটিও দেখা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত জার্মানিতে একজন বিদেশি কর্মীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ‘বেতন কত’ নয়, ‘সব খরচ ও কর কাটার পর কতটা সঞ্চয় করা সম্ভব’। মিউনিখ বা ফ্রাঙ্কফুর্টে বেশি বেতনের সুযোগ থাকলেও বেশি ভাড়া সেই সুবিধার একটি অংশ কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলক কম বেতনের শহরে আবাসন ব্যয় কম হলে মাস শেষে সঞ্চয়ের পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাই জার্মানিতে চাকরি বেছে নেওয়ার সময় পেশা, বেতন, কর, শহর, ভাড়া এবং জীবনযাত্রার খরচ একসঙ্গে হিসাব করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।

❤️
👏
🙂
😞

জার্মানিতে উচ্চ বেতনের চাকরি ও জীবনযাত্রার খরচ, কোন শহরে সঞ্চয়ের সুযোগ বেশি?

প্রকাশঃ ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:০৮

বার্লিন, ৩ সেপ্টেম্বর (প্রজন্ম কথা) – মাসের শুরুতে বেতন হিসেবে ব্যাংক হিসাবে ঢুকল ৩ হাজার ৫০০ ইউরো। হিসাবটা দেখে স্বস্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু বাড়িভাড়া ১ হাজার ১৫০ ইউরো, খাবারে ৩৫০, যাতায়াত, ফোন, ইন্টারনেট ও অন্যান্য খরচে আরও কয়েকশ ইউরো চলে যাওয়ার পর মাস শেষে হাতে থাকল প্রায় ১ হাজার ৬০০ ইউরো। জার্মানিতে ভালো বেতনের চাকরি করেও একজন বিদেশি কর্মীর মাসিক জীবনের হিসাব অনেকটা এমন হতে পারে। তাই দেশটিতে চাকরির ক্ষেত্রে শুধু বেতনের অঙ্ক দেখলেই পুরো চিত্র বোঝা যায় না, কোন পেশায় কত আয়, কোন শহরে কত খরচ এবং কর ও সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ কত টাকা কেটে যায়, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

জার্মানির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পূর্ণকালীন কর্মীদের মধ্যম বার্ষিক মোট আয় ছিল ৫৪ হাজার ৬৬ ইউরো, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৪ হাজার ৫০৬ ইউরো। একই সময়ে পূর্ণকালীন কর্মীদের গড় মাসিক মোট আয় ছিল ৪ হাজার ৭৮৪ ইউরো। মধ্যম আয়কে সাধারণ কর্মীর আয়ের তুলনায় বেশি প্রতিনিধিত্বশীল সূচক হিসেবে দেখা হয়, কারণ উচ্চ বেতনের একটি অংশ গড় হিসাবকে ওপরে নিয়ে যেতে পারে। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে পূর্ণকালীন কর্মীদের শীর্ষ ১০ শতাংশের বার্ষিক আয় ছিল কমপক্ষে ১ লাখ ৭১৯ ইউরো, আর নিচের ১০ শতাংশের আয় ছিল ৩৩ হাজার ৮২৮ ইউরো বা তার কম।

কোন পেশায় বেতন বেশি

জার্মানিতে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার উন্নয়ন, প্রকৌশল, গাড়ি শিল্প, বিজ্ঞান, ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজের সুযোগ তুলনামূলক বেশি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে মধ্যম বার্ষিক বেতন প্রায় ৬৬ হাজার ৭৫০ ইউরো। মধ্যপর্যায়ের সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা প্রায় ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার ইউরো এবং অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো পর্যন্ত আয় করতে পারেন। প্রকৌশল ও গাড়ি শিল্পে বার্ষিক বেতন সাধারণত ৫৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার ইউরোর মধ্যে শুরু হয়ে অভিজ্ঞ পর্যায়ে ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার ইউরো পর্যন্ত যেতে পারে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের বেতন প্রায় ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার ইউরো এবং পরিচালনা পর্যায়ে ১ লাখ ৫০ হাজার ইউরোর বেশি হতে পারে। বিজ্ঞান, ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্পে বার্ষিক আয় প্রায় ৬০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার ইউরো এবং অভিজ্ঞ পর্যায়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত হতে পারে। চিকিৎসা ও নার্সিং পেশায় চাহিদা বেশি থাকলেও বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে জার্মান ভাষা এবং পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ।

কোন শহরে বেতন বেশি

জার্মানির শহর ও রাজ্যভেদে বেতনের পার্থক্য রয়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্টকে ঘিরে হেসেন রাজ্যে পূর্ণকালীন কর্মীদের গড় মাসিক মোট বেতন প্রায় ৫ হাজার ২৮৫ ইউরো। হামবুর্গে প্রায় ৫ হাজার ১০০, বার্লিনে ৫ হাজার ৬০ এবং বাডেন-ভুর্টেমবার্গে প্রায় ৫ হাজার ৩৪ ইউরো। বাভারিয়ায় গড় বেতন প্রায় ৪ হাজার ৯৫৩ ইউরো এবং উত্তর রাইন-ভেস্টফালিয়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৮৯ ইউরো। পূর্বাঞ্চলের স্যাক্সনিতে এই পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ১৪৩ ইউরো।

তবে বেশি বেতন মানেই বেশি সঞ্চয়, এমনটি সব ক্ষেত্রে হয় না। মিউনিখে বেতন তুলনামূলক বেশি হলেও আবাসন ব্যয়ও বেশি। একই পর্যায়ের একজন অভিজ্ঞ সফটওয়্যার প্রকৌশলী মিউনিখে বছরে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ইউরো আয় করতে পারেন। বার্লিনে একই পর্যায়ের আয় প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ইউরো হলেও তুলনামূলক কম আবাসন ব্যয়ের কারণে দুই শহরের প্রকৃত সঞ্চয়ের ব্যবধান অনেকটাই কমে আসতে পারে।

জার্মানিতে বয়স বাড়ার সঙ্গে সাধারণত আয়ও বাড়ে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যম বার্ষিক আয় প্রায় ৪৮ হাজার ৯৫ ইউরো। ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে তা ৫৪ হাজার ২৫২ ইউরো এবং ৩৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৫৬ হাজার ৭৬৭ ইউরো। ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যম আয় প্রায় ৫৬ হাজার ৯৩১ ইউরো। ৫০ থেকে ৫৪ বছর বয়সে তা ৫৭ হাজার ২৭ ইউরো এবং ৫৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সে ৫৭ হাজার ২৮৭ ইউরো। ৬০ থেকে ৬৪ বছর বয়সে মধ্যম আয় কিছুটা কমে প্রায় ৫৫ হাজার ৬০৫ ইউরো হয়েছে।

বেতন থেকে কত টাকা কেটে যায়

জার্মানিতে বেতন হাতে পাওয়ার আগে আয়কর ও সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন অবদান কেটে নেওয়া হয়। পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং বেকারত্ব বিমায় কর্মীর অংশ থাকে। করের পরিমাণ নির্ভর করে আয়, বৈবাহিক অবস্থা, কর শ্রেণি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর। কেউ গির্জার সদস্য হিসেবে নিবন্ধিত থাকলে আয়করের ওপর অতিরিক্ত গির্জা করও দিতে হয়।

এই কারণে একই মোট বেতন হলেও দুই কর্মীর হাতে থাকা অর্থ এক হতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে একক ব্যক্তি, প্রথম কর শ্রেণি এবং গির্জা কর না দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৪ হাজার ৮৫০ ইউরো মোট মাসিক বেতন থেকে আনুমানিক ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯৫০ ইউরো হাতে থাকতে পারে। প্রকৃত পরিমাণ ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হবে।

ধরা যাক, বার্লিনে একজন একক সফটওয়্যার প্রকৌশলীর বার্ষিক মোট বেতন ৭০ হাজার ইউরো। মাসে মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৮৩৩ ইউরো। কর ও সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্তনের পর ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ইউরো আসতে পারে। এরপর এক শয্যার বাসার ভাড়া প্রায় ১ হাজার ১৫০ ইউরো, খাবারে ৩৫০ ইউরো এবং যাতায়াত, ফোন, ইন্টারনেট ও অন্যান্য পরিষেবায় প্রায় ৪০০ ইউরো ব্যয় হলে মাস শেষে হাতে থাকতে পারে প্রায় ১ হাজার ৬০০ ইউরো।

মিউনিখে একই বেতন হলে বেশি আবাসন ব্যয়ের কারণে অবশিষ্ট অর্থ প্রায় ১ হাজার ২০০ ইউরোতে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ একই চাকরি ও একই বেতন হলেও শহর বদলালে মাস শেষে সঞ্চয়ের পরিমাণে পার্থক্য তৈরি হতে পারে।

জার্মানিতে বসবাসের খরচ

বড় শহরগুলোর মধ্যে মিউনিখে আবাসন ব্যয় সবচেয়ে বেশি। শহরের কেন্দ্রে এক শয্যার বাসার মাসিক ভাড়া প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ইউরো। ফ্রাঙ্কফুর্ট, হামবুর্গ ও স্টুটগার্টে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ইউরো এবং বার্লিনে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭৫ ইউরো ধরা হয়েছে। ছোট শহরগুলোতে ভাড়া তুলনামূলক কম। লাইপজিগ, ডর্টমুন্ড ও হ্যানোভারের মতো শহরে এক শয্যার বাসার ভাড়া প্রায় ৬৫০ থেকে ৯৫০ ইউরোর মধ্যে হতে পারে।

এর বাইরে একক ব্যক্তির মাসিক খাবারের খরচ প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ইউরো, বিদ্যুৎ, অন্যান্য পরিষেবা ও ইন্টারনেটে প্রায় ২৫০ থেকে ৩৫০ ইউরো এবং গণপরিবহনের মাসিক টিকিটে ৫৮ ইউরো খরচ হতে পারে। পরিবারপ্রতি রেডিও ও টেলিভিশন ব্যবহারের জন্য মাসিক ১৮ দশমিক ৩৬ ইউরো ফিও দিতে হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সুইজারল্যান্ডের নাগরিকরা সাধারণত আলাদা কাজের অনুমতি ছাড়াই জার্মানিতে কাজ করতে পারেন। অন্য দেশের দক্ষ কর্মীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের কাজ ও বসবাসের অনুমতি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীল কার্ডের জন্য ২০২৬ সালে সাধারণ বার্ষিক বেতনের সীমা ৫০ হাজার ৭০০ ইউরো। ঘাটতি রয়েছে এমন পেশা, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কর্মী এবং সাম্প্রতিক স্নাতকদের জন্য সীমাটি ৪৫ হাজার ৯৩৪ ইউরো।

যোগ্যতার স্বীকৃতি থাকা বিদেশি কর্মীরা নির্দিষ্ট চাকরির ভিত্তিতে দক্ষ কর্মী হিসেবে বসবাসের অনুমতিও পেতে পারেন। আর চাকরি না থাকলেও যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য সুযোগ কার্ডের মাধ্যমে জার্মানিতে গিয়ে সর্বোচ্চ ১২ মাস চাকরি খোঁজার সুযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও আর্থিক সামর্থ্যের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণার মতো কিছু ক্ষেত্রে ইংরেজিতে কাজের সুযোগ পাওয়া গেলেও নার্সিংসহ বেশ কিছু পেশায় জার্মান ভাষা এবং বিদেশি শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি প্রয়োজন।

ন্যূনতম মজুরি কত

জার্মানিতে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আইনগত ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৩ দশমিক ৯০ ইউরো হয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এটি বেড়ে ১৪ দশমিক ৬০ ইউরো হওয়ার কথা রয়েছে।

জার্মানিতে চাকরির বেতন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গড় বেতনের পাশাপাশি মধ্যম বেতন দেখা বেশি কার্যকর। কারণ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, অর্থ খাত এবং অভিজ্ঞ প্রযুক্তি পেশাজীবীদের বেশি আয় গড় বেতনকে ওপরে নিয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালের সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, পূর্ণকালীন কর্মীদের মাত্র একাংশ গড় বেতনের ওপরে আয় করেন।

এ ছাড়া জার্মানিতে আইন অনুযায়ী ১৩তম মাসের বেতন বাধ্যতামূলক নয়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান বড়দিন বা ছুটির সময় অতিরিক্ত ভাতা দেয়। তাই চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে মূল বেতনের পাশাপাশি বোনাস, ছুটির ভাতা, পেনশন সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা চুক্তিতে কীভাবে উল্লেখ আছে, সেটিও দেখা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত জার্মানিতে একজন বিদেশি কর্মীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ‘বেতন কত’ নয়, ‘সব খরচ ও কর কাটার পর কতটা সঞ্চয় করা সম্ভব’। মিউনিখ বা ফ্রাঙ্কফুর্টে বেশি বেতনের সুযোগ থাকলেও বেশি ভাড়া সেই সুবিধার একটি অংশ কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলক কম বেতনের শহরে আবাসন ব্যয় কম হলে মাস শেষে সঞ্চয়ের পরিমাণ বেশি হতে পারে। তাই জার্মানিতে চাকরি বেছে নেওয়ার সময় পেশা, বেতন, কর, শহর, ভাড়া এবং জীবনযাত্রার খরচ একসঙ্গে হিসাব করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।