প্রথম বাংলাদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থী হিসেবে জাপানের ব্রেইন সার্জারিতে সুযোগ পেলেন রাফি
- প্রকাশঃ ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:২১
- / 4
ঢাকা, ০২ সেপ্টেম্বর (প্রজন্ম কথা) – প্রথম দিনটি ছিল দেখার। পরিচিত হাসপাতাল আর পরিচিত চিকিৎসাব্যবস্থার বাইরে, টোকিওর একটি শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ বাংলাদেশি চিকিৎসা শিক্ষার্থী দেখছিলেন কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে জটিল নিউরোসার্জিক্যাল অস্ত্রোপচার, কীভাবে চিকিৎসকেরা রোগীর কেস নিয়ে আলোচনা করছেন, কীভাবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি তথ্য খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে।
জাপানি ভাষায় চলা আলোচনা বুঝে নেওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি তিনি তখন মূলত একজন পর্যবেক্ষক। কিন্তু চার সপ্তাহের সেই পথচলার শেষ দিকে ছবিটা বদলে যায়। একটি ক্লিনিক্যাল কেস নিজে উপস্থাপন করার পর তীব্র সাবডিউরাল হেমাটোমায় আক্রান্ত এক রোগীর জরুরি ক্র্যানিওটমি অস্ত্রোপচারে চিকিৎসক দলের সঙ্গে সহায়তা করার সুযোগ পান রাকিবুল হোসাইন রাফি। বাংলাদেশ থেকে জাপান, পর্যবেক্ষক থেকে সক্রিয় অংশগ্রহণ, তার এই চার সপ্তাহের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে শেখার এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।

উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ থেকে সম্প্রতি চূড়ান্ত পেশাগত এমবিবিএস পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন রাকিবুল হোসাইন রাফি। পড়াশোনার এই পর্যায় শেষ করে তার লক্ষ্য ছিল দেশের বাইরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল পরিবেশকে কাছ থেকে দেখা। সেই লক্ষ্যেই জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত টোকিওর কেয়ো বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে চার সপ্তাহের পর্যবেক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। জাপানে পৌঁছানোর পর প্রথম দিনেই বিভাগের চিকিৎসকদের সঙ্গে পরিচয়, হাসপাতালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা এবং নিয়মিত সম্মেলনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার নতুন অভিজ্ঞতা।
প্রথম কয়েকদিনে রাফির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল ভাষা। ক্লিনিক্যাল আলোচনা ও রোগী নিয়ে কথোপকথনের বড় অংশই জাপানি ভাষায় হওয়ায় শুরুতে অনেক কিছু বুঝে নিতে সময় লাগছিল। তবে শিক্ষক, আবাসিক চিকিৎসক ও বিভাগের অন্য সদস্যদের সহযোগিতা এবং অনুবাদ প্রযুক্তির সাহায্যে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেন তিনি।
এরপর পর্যবেক্ষণের পরিধিও বাড়তে থাকে। মস্তিষ্কের টিউমার, মস্তিষ্কের রক্তনালির অস্বাভাবিকতা, রক্তনালির ভেতর দিয়ে চিকিৎসা, ময়াময়া-সম্পর্কিত রোগ, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের জটিল নিউরোসার্জিক্যাল অবস্থা এবং বিভিন্ন বিরল রোগের চিকিৎসা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি বিভাগীয় সম্মেলন, ওয়ার্ড পরিদর্শন, রোগীর কেস নিয়ে আলোচনা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমেও নিয়মিত অংশ নেন তিনি। একটি শবদেহভিত্তিক ব্যবহারিক কর্মশালায় অংশ নিয়ে অস্ত্রোপচারের শারীরস্থান সম্পর্কেও হাতে-কলমে শেখার সুযোগ হয় তার।
তবে রাফির জন্য এই সফর কেবল অন্যদের কাজ দেখার মধ্যে আটকে থাকেনি। তৃতীয় সপ্তাহে বিভাগের নিয়মিত কেস সম্মেলনে একটি ক্লিনিক্যাল কেস উপস্থাপনের সুযোগ পান তিনি। এজন্য রোগীর চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য, মস্তিষ্কের বিভিন্ন চিত্র, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত প্রস্তুতি নিতে হয়।
উপস্থাপনার পর জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন এবং আলোচনায় অংশ নেন। একজন চিকিৎসক কীভাবে রোগীর বিভিন্ন তথ্য একত্র করে সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করেন, কোন তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং জটিল পরিস্থিতিতে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন, সেই প্রক্রিয়াটি এ সময় আরও কাছ থেকে বোঝার সুযোগ পান রাফি।

চার সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি আসে শেষ সপ্তাহে। তীব্র সাবডিউরাল হেমাটোমায় আক্রান্ত এক রোগীর জরুরি ক্র্যানিওটমি অস্ত্রোপচারে চিকিৎসক দলের সঙ্গে সহায়তা করার সুযোগ দেওয়া হয় তাকে। একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে শুরু করা সফরে এমন একটি জরুরি নিউরোসার্জিক্যাল অস্ত্রোপচারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাফির জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
তার কাছে এটি কেবল একটি অস্ত্রোপচারকক্ষে থাকার অভিজ্ঞতা ছিল না। আগের কয়েক সপ্তাহে নিয়মিত উপস্থিতি, প্রস্তুতি, রোগীর কেস সম্পর্কে আগ্রহ, প্রশ্ন করা এবং চিকিৎসক দলের সঙ্গে পেশাগত যোগাযোগ গড়ে তোলার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই এই আস্থার জায়গাটি তৈরি হয়েছিল।
জাপানে কাটানো সময় থেকে রাফির সবচেয়ে বড় শিক্ষা এসেছে অস্ত্রোপচারের প্রযুক্তি বা জটিল চিকিৎসাপদ্ধতির বাইরে। তার কাছে টিমওয়ার্ক, পারস্পরিক সম্মান, কার্যকর যোগাযোগ, রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা এবং অস্ত্রোপচারের আগে সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একটি রোগীর মস্তিষ্কের চৌম্বক অনুরণন বা সিটি স্ক্যান তার কাছে এখন আর কেবল একটি চিকিৎসা-চিত্র নয়।
এর পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, তার পরিবার এবং তাদের প্রত্যাশা। তাই একজন চিকিৎসকের দক্ষতা কেবল প্রযুক্তিগত জ্ঞান বা অস্ত্রোপচারের সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, এর সঙ্গে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও জরুরি। জাপানি চিকিৎসকদের সঙ্গে একাডেমিক ও গবেষণামূলক আলোচনার অভিজ্ঞতাও রাফির ভবিষ্যৎ ভাবনাকে নতুনভাবে প্রভাবিত করেছে। আন্তর্জাতিক একটি চিকিৎসা পরিবেশে কাজ করার সুযোগ তাকে গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষার প্রতি আরও আগ্রহী করেছে।
বাংলাদেশে ফিরে নিউরোসার্জারি নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষায় যুক্ত থাকার আগ্রহ এখন আরও দৃঢ় হয়েছে তার। জাপানে দেখা পদ্ধতি, শৃঙ্খলা, দলগত কাজ এবং রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসার অভিজ্ঞতাগুলো ভবিষ্যতে নিজের পেশাগত জীবনে কাজে লাগাতে চান তিনি।
রাফির গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই সুযোগটি তার সামনে হঠাৎ করে আসেনি। চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষা শেষ করার পর বিদেশে ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা নেওয়ার ইচ্ছা থেকেই শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় খোঁজা ও আবেদন করার প্রক্রিয়া। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন, অপেক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত কেয়ো বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের সুযোগ গ্রহণ, পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল ধৈর্য ও প্রস্তুতির। জাপানে পৌঁছানোর পরও ভাষাগত সীমাবদ্ধতা তাকে থামিয়ে দেয়নি। বরং নতুন পরিবেশ বোঝার চেষ্টা, প্রশ্ন করা এবং শেখার আগ্রহই ধীরে ধীরে তাকে পর্যবেক্ষকের সীমা অতিক্রম করার সুযোগ করে দেয়।
একজন বাংলাদেশি চিকিৎসা শিক্ষার্থী হিসেবে জাপানের আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, জটিল নিউরোসার্জিক্যাল কেস পর্যবেক্ষণ করা, বিভাগের সামনে কেস উপস্থাপন করা, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের সঙ্গে একাডেমিক আলোচনায় অংশ নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত জরুরি মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারে চিকিৎসক দলের সঙ্গে সহায়তা করার সুযোগ রাফির জন্য অবশ্যই স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। তবে তিনি এটিকে ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে দেখছেন না। তার কাছে এটি আরও বড় একটি পথচলার শুরু।
ভবিষ্যতে একজন দক্ষ নিউরোসার্জন হয়ে ওঠাই রাফির লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যের সঙ্গে তিনি রাখতে চান উন্নত অস্ত্রোপচার দক্ষতা, গবেষণার প্রতি আগ্রহ, চিকিৎসা শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ততা, রোগীর প্রতি সহমর্মিতা এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশে ফিরিয়ে কাজে লাগানোর প্রত্যয়ও রয়েছে তার।
বাংলাদেশ থেকে জাপান, একটি আবেদন থেকে শুরু হওয়া চার সপ্তাহের এই যাত্রা তাই রাকিবুল হোসাইন রাফির জন্য কেবল একটি বিদেশে প্রশিক্ষণ বা পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির গল্প নয়। এটি একজন তরুণ চিকিৎসা শিক্ষার্থীর শেখার সীমা আরও বিস্তৃত করার গল্প। প্রথম দিনে যিনি ছিলেন একজন পর্যবেক্ষক, চার সপ্তাহ পর তিনিই একটি কেস নিয়ে দাঁড়িয়েছেন চিকিৎসকদের সামনে এবং জরুরি নিউরোসার্জিক্যাল অস্ত্রোপচারে চিকিৎসক দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
সামনে তার পথ আরও দীর্ঘ। জাপানের সেই চার সপ্তাহ হয়তো সেই পথের একটি অধ্যায়, কিন্তু শেখার প্রতি আগ্রহ, নিজের সীমা পেরোনোর চেষ্টা এবং অর্জিত অভিজ্ঞতাকে দেশে কাজে লাগানোর প্রত্যয়ই হতে পারে তার পরবর্তী পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তি।






















