লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে এগিয়ে কে, কারেন ব্যাস নাকি নিথ্যা রামান?
- প্রকাশঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:২০
- / 9
লস অ্যাঞ্জেলেস, ১৭ অক্টোবর, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে বর্তমান মেয়র কারেন ব্যাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সিটি কাউন্সিল সদস্য নিথ্যা রামান। জুনের প্রাইমারিতে ব্যাস প্রায় ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও, রানঅফের আগে প্রকাশিত কয়েকটি জরিপে রামান এগিয়ে রয়েছেন। তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার এখনও সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় এবং জরিপগুলোর ফলে পার্থক্য থাকায় ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কে জিতবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, ২ জুনের প্রাইমারিতে ব্যাস পেয়েছিলেন ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯৩ ভোট, যা মোট ভোটের ৩৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। রামান পেয়েছিলেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৭৮১ ভোট বা ২৯ দশমিক ০২ শতাংশ। দুই প্রার্থীর ব্যবধান ছিল ৪৪ হাজার ৮১২ ভোট। মোট ১৪ জন প্রার্থীর মধ্যে কেউই ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যাস ও রামান রানঅফে উঠেছেন।
জরিপে রামানের এগিয়ে থাকার চিত্র
ইউসি বার্কলির ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্টাল স্টাডিজ ও লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস-এর যৌথ জরিপে রামানের সমর্থন পাওয়া গেছে ৩৯ শতাংশ, আর ব্যাসের ২৮ শতাংশ। ১৫ থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২ হাজার ১৫০ জন সম্ভাব্য ভোটারের মতামতের ভিত্তিতে করা জরিপে ৩৩ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। জরিপটির ত্রুটিসীমা প্রায় তিন শতাংশ পয়েন্ট।
অক্টোবরের অন্য জরিপেও রামান এগিয়ে রয়েছেন, যদিও ফলাফলের সঙ্গে জরিপের অর্থায়ন ও পদ্ধতিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। রামান-সমর্থক একটি স্বাধীন ব্যয়কারী গোষ্ঠীর অর্থায়নে ২ থেকে ৭ অক্টোবর পরিচালিত জরিপে রামান ৪৩ শতাংশ এবং ব্যাস ৩৩ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। ২৩ শতাংশ ভোটার তখনও সিদ্ধান্ত নেননি।
অন্যদিকে, ইউনাইটেড ফায়ারফাইটার্স অব লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি, লোকাল ১১২-এর অর্থায়নে পরিচালিত জরিপে রামান ৩৫ শতাংশ এবং ব্যাস ৩৩ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। জরিপটির ত্রুটিসীমা চার শতাংশ পয়েন্ট হওয়ায় দুই শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানকে নিশ্চিত পরিসংখ্যানগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা যায় না।
লাতিনো ভোটারদের সমর্থনে জরিপের অমিল
লাতিনো ভোটারদের সমর্থন নিয়েও জরিপগুলোর ফল এক নয়। সেপ্টেম্বরের বার্কলি-টাইমস জরিপে এই জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে রামান ৪৫ শতাংশ এবং ব্যাস ২১ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিলেন। ৩৪ শতাংশ ভোটার তখনও সিদ্ধান্ত নেননি।
তবে ৯ অক্টোবর প্রকাশিত বিএসপি রিসার্চের জরিপে লাতিনো ভোটারদের মধ্যে ব্যাসের সমর্থন ছিল ৪০ শতাংশ, রামানের ২৮ শতাংশ। ৩২ শতাংশ ভোটার অনির্ধারিত ছিলেন। জরিপটি ‘ইউনিদোস কন কারেন ব্যাস’-এর জন্য পরিচালিত হয়েছিল।
জরিপটির পদ্ধতিগত বিবরণে ফোন ও অনলাইনে নেওয়া সাক্ষাৎকারের ফলের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। ফোনে ব্যাস এগিয়ে থাকলেও অনলাইন সাক্ষাৎকারে রামান এগিয়ে ছিলেন। ফলে দুটি জরিপের ফল পাশাপাশি রেখে লাতিনো ভোটারদের সমর্থনে নিশ্চিত পরিবর্তন হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
গৃহহীনতা ও আবাসন নিয়ে দুই প্রার্থীর অবস্থান
নির্বাচনী প্রচারে গৃহহীনতা, আবাসনের ব্যয়, জননিরাপত্তা এবং নগর প্রশাসনের কার্যকারিতা প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে বর্তমান মেয়রের রেকর্ড এবং রামানের নীতিগত অবস্থান ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যাসের প্রশাসন গৃহহীন মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়ে নেওয়ার জন্য ‘ইনসাইড সেফ’ কর্মসূচি চালিয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা এটিকে রাস্তায় থাকা মানুষকে জরুরি আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন। সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, অস্থায়ী আশ্রয় থেকে কতজন স্থায়ী আবাসনে যেতে পেরেছেন এবং কর্মসূচির সরকারি ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের গৃহহীন মানুষের সংখ্যা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা লস অ্যাঞ্জেলেস হোমলেস সার্ভিসেস অথরিটির ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, শহরে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, সংখ্যার পরিবর্তন পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তাই একটি হিসাবের ভিত্তিতে সংকটের সামগ্রিক গতিপথ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
আবাসন নীতিতে ব্যাসের প্রশাসন সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন ও নির্মাণ দ্রুত করার উদ্যোগের কথা বলছে। রামান ভাড়াটেদের সুরক্ষা এবং আবাসনের সরবরাহ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে তাঁর কয়েকটি নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এলএ বাংলা টাইমস-এর ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে পুলিশ নিয়োগ, জনপরিসরে গৃহহীন মানুষের তাঁবু নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব এবং আবাসনসংক্রান্ত মেজার ইউএলএ কর নিয়ে রামানের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। রামানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাজেট ও জননিরাপত্তা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার পর তিনি কিছু অবস্থান পুনর্বিবেচনা করেছেন। সমালোচকেরা অবশ্য এই পরিবর্তনের পেছনে নির্বাচনী কৌশল রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জননিরাপত্তাও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু
পুলিশ বিভাগ নিয়ে দুই প্রার্থীর অবস্থানও আলোচনায় রয়েছে। রামান অতীতে পুলিশ বাজেট কমানোর পক্ষে ছিলেন। বর্তমানে তাঁর বক্তব্য, লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগের সদস্যসংখ্যা আর কমতে দেওয়া উচিত নয়। ব্যাস পুলিশ নিয়োগ ও বেতন বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
ভোটারদের কাছে তাই পুলিশ সদস্যসংখ্যা বা বাজেটের প্রশ্নের পাশাপাশি এসব পরিকল্পনার ব্যয়, বাস্তবায়ন এবং শহরের নিরাপত্তায় সম্ভাব্য প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্পেন্সার প্র্যাটের ভোটাররা কোন দিকে যাবেন?
প্রাইমারিতে ব্যাসের এগিয়ে থাকা গণনা করা ভোটের ফল। অন্যদিকে, জরিপে রামানের এগিয়ে থাকা নির্দিষ্ট সময়ে সম্ভাব্য ভোটারদের মতামতের প্রতিফলন। প্রাইমারির পর প্রচার, প্রার্থীদের নীতি, ভোটার উপস্থিতি এবং সিদ্ধান্তহীনদের পছন্দ নির্বাচনের ফল বদলে দিতে পারে।
প্রাইমারিতে রিয়েলিটি টেলিভিশন তারকা স্পেন্সার প্র্যাটও উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিলেন। বার্কলি-টাইমস জরিপে দেখা গেছে, প্র্যাটকে ভোট দেওয়া অধিকাংশ ভোটার রানঅফে কাকে সমর্থন করবেন, তা তখনও ঠিক করেননি। এই ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
১৩ অক্টোবর এনবিসি৪ ও টেলিমুন্ডো ৫২-এর আয়োজনে ব্যাস ও রামান এক ঘণ্টার টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নেন। জননিরাপত্তা, গৃহহীনতা, আবাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি দুই প্রার্থী পরস্পরের নেতৃত্ব ও নীতির সমালোচনা করেন। বিতর্কে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর মূল্যায়নে তাঁদের আগের রেকর্ড, পরিকল্পনার অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বিবেচনা করা জরুরি।
পিবিএস নিউজআওয়ারের ১ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ছিল প্রাইমারির আগের প্রচার নিয়ে। ফলে সেটিকে বর্তমান রানঅফের সমর্থন বা নির্বাচনী অবস্থানের নির্দেশক হিসেবে দেখা যাবে না। অক্টোবরের পরিস্থিতি বুঝতে প্রাইমারির চূড়ান্ত ফল, পরবর্তী জরিপ এবং সাম্প্রতিক প্রচারসংক্রান্ত প্রতিবেদন আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
বর্তমান চিত্রে প্রাইমারির ভোটে কারেন ব্যাস এগিয়ে ছিলেন, আর সাম্প্রতিক প্রকাশিত সামগ্রিক জরিপে নিথ্যা রামান এগিয়ে রয়েছেন। তবে অনির্ধারিত ভোটারের বড় অংশ এবং জরিপগুলোর ভিন্ন ফলের কারণে নির্বাচনের ফল এখনও অনিশ্চিত। ৩ নভেম্বরের ভোটেই নির্ধারিত হবে লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র পদে কে দায়িত্ব পালন করবেন।
























