আমাজনের জঙ্গল থেকে আফ্রিকা, গল্পের খোঁজে বিশ্ব ঘুরছেন তরুণ কনটেন্ট নির্মাতা ওয়াকিফ হোসাইন
- প্রকাশঃ ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২১:০২
- / 12
একদিকে ফিনল্যান্ডের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল পেশাজীবন, অন্যদিকে ক্যামেরা হাতে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছুটে চলা। কোথাও আমাজনের জঙ্গলে একা ২৪ ঘণ্টা, কোথাও বন্দুকের মুখে ফোন হারানোর অভিজ্ঞতা। আবার কখনো কোনো প্রাচীন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে তাদের জীবন ও সংস্কৃতির গল্প তুলে ধরা।
এই ভিন্নধর্মী দুই জগতকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশি এমডি ওয়াকিফ হোসাইন। ফিনল্যান্ডে বসবাসকারী ওয়াকিফ পেশায় কনটেন্ট নির্মাতা ও ভ্রমণচিত্র নির্মাতা। তবে তাঁর ভ্রমণের গল্পের ধরন সাধারণ পর্যটনভিত্তিক ভিডিও থেকে কিছুটা আলাদা। কোনো জায়গায় গিয়ে সেখানে কী দেখা যায়, কোথায় খাওয়া যায় কিংবা কীভাবে ঘুরতে হবে, তার পাশাপাশি তিনি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং একটি স্থানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পকে সামনে আনার চেষ্টা করেন।
পেশাগতভাবে ভ্লগিং শুরু করার প্রায় ১০ মাসের মধ্যেই তাঁর ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৫ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। ফেসবুকে তাঁর অনুসারী ১৬ লাখের বেশি। সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে তাঁর মোট দর্শক ও অনুসারীর সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি।
তবে সংখ্যাগুলো তাঁর গল্পের একটি অংশ মাত্র। তাঁর কনটেন্টের মূল জায়গাটি তৈরি হয়েছে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে গল্পে রূপ দেওয়ার চেষ্টা থেকে।
আমাজনে একা ২৪ ঘণ্টা
বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রাকৃতিক অঞ্চল আমাজন জঙ্গলে একা ২৪ ঘণ্টা কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে ওয়াকিফের। সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি ভিডিওর মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন। ভ্রমণের আরেক পর্যায়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বন্দুকের মুখে তাঁর ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। একটি ভ্রমণ যা সাধারণত নতুন জায়গা দেখা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সঙ্গে যুক্ত, সেটিই সেখানে হঠাৎ নিরাপত্তাঝুঁকির অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। সেই ঘটনাও তিনি ভিডিওতে তুলে ধরেছেন।

কেনিয়ায় তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন ধরনের। সেখানে একটি প্রাচীন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। তাঁদের জীবন ও সংস্কৃতির কাছাকাছি যাওয়ার পাশাপাশি তাঁদের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর ভ্রমণকাহিনির অংশ হয়ে উঠেছে। এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ওয়াকিফের ভ্রমণ কনটেন্টে শুধু স্থান নয়, মানুষও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভ্লগিং শুরুর আগেই অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা
ক্যামেরা হাতে নেওয়ার আগেও অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে ওয়াকিফের পরিচয় ছিল। পেশাগতভাবে ভ্লগিং শুরু করার আগে তিনি একা প্যারাশুট নিয়ে সাতবার একক স্কাইডাইভ সম্পন্ন করেন।
পরবর্তী সময়ে ভ্রমণভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির সময় সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাও দেখা যায় তাঁর কাজের মধ্যে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সার্ফিং করা, পর্বতারোহণ এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তিমি হাঙরের সঙ্গে সাঁতার কাটার মতো অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
ভ্রমণ থেকে তৈরি হয়েছে বড় দর্শকগোষ্ঠী
স্বল্প সময়ের মধ্যে ওয়াকিফের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দর্শকসংখ্যা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউটিউবে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি সাবস্ক্রাইবার এবং ফেসবুকে ১৬ লাখের বেশি অনুসারী তাঁর কনটেন্টের প্রতি দর্শকদের আগ্রহের একটি চিত্র দেয়।
তবে তাঁর নিজের বর্ণনায়, লক্ষ্য কেবল দর্শনীয় স্থান দেখানো নয়। একটি দেশের মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করে, একটি সংস্কৃতির পেছনে কী গল্প রয়েছে কিংবা কোনো জায়গার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী, সেসব বিষয়কে ভ্রমণের গল্পের অংশ করতে চান তিনি।
বাংলাদেশের ভ্রমণভিত্তিক কনটেন্টে প্রামাণ্যচিত্রধর্মী গল্প বলার এই পদ্ধতিকে তিনি নিজের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন।

কনটেন্ট নির্মাণের পাশাপাশি ওয়াকিফ তাঁর পেশাগত জীবনও চালিয়ে যাচ্ছেন। ফিনল্যান্ডের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারফেক্টে তিনি সিনিয়র ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত। কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে আইএমও মেসেঞ্জার, এসিই মানি ট্রান্সফার, ফ্যাসেট, এসিআই লিমিটেড, রবি, বিকাশ, ট্যাপট্যাপ সেন্ড ও গোযায়ান। অর্থাৎ ভ্রমণ ও কনটেন্ট নির্মাণ তাঁর পেশাগত জীবনের একটি অংশ হলেও এর পাশাপাশি করপোরেট পেশাজীবনও ধরে রেখেছেন তিনি।
ওয়াকিফের ভ্রমণ ও কনটেন্ট নির্মাণের যাত্রায় সামনে রয়েছে আরও একটি আন্তর্জাতিক কাজ। আগামী মাসে ভারতের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্রপ্রতিষ্ঠান আজমেরা ফ্যাশন লিমিটেডের ব্র্যান্ডের প্রচারণামূলক ভিডিও তৈরির জন্য তাঁকে ফিনল্যান্ড থেকে ভারতে নেওয়া হবে।
বাংলাদেশি একজন ভ্রমণচিত্র নির্মাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন কাজ তাঁর চলমান যাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে যাচ্ছে।
ফিনল্যান্ডে পেশাগত দায়িত্ব পালন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ এবং ক্যামেরার সামনে সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরা, এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছেন ওয়াকিফ হোসাইন। তাঁর গল্পে ভ্রমণ কেবল নতুন কোনো জায়গায় পৌঁছানোর বিষয় নয়। প্রতিটি যাত্রার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন অভিজ্ঞতা। আর সেই অভিজ্ঞতাগুলোই ক্যামেরার মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে লাখো দর্শকের কাছে।





























