নিউইয়র্কে ব্যবসা শুরু করতে কত টাকা লাগে, বিনিয়োগের আগে জানুন নিয়ম ও ভিসার শর্ত
- প্রকাশঃ ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:৪৭
- / 3
নিউইয়র্ক, ৩ নভেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের কাছে নিউইয়র্ক একটি সম্ভাবনাময় বাজার। বড় ভোক্তাগোষ্ঠী, বৈচিত্র্যময় অভিবাসী জনগোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুযোগ এবং সরকারি অর্থায়ন কর্মসূচির কারণে এখানে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে চড়া বাড়িভাড়া, কর্মীদের মজুরি, বীমা, কর, লাইসেন্স ও তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য। তাই বিনিয়োগের আগে বাজার যাচাই, ব্যবসার ধরন, মূলধন, আইনি কাঠামো এবং অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। নিউইয়র্ক নগর পরিকল্পনা বিভাগের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরে বিদেশে জন্ম নেওয়া পুরুষ কর্মীদের মধ্যে বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, রুশ ও কোরীয়দের স্বনিয়োজিত বা নিজস্ব ব্যবসায় যুক্ত থাকার হার তুলনামূলক বেশি। এসব জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে হারটি প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে। তবে এই পরিসংখ্যান নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর পুরুষ কর্মীদের নিয়ে, নিউইয়র্কের সব বাংলাদেশি বাসিন্দা বা পুরো যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশিদের নিয়ে নয়।
কী ধরনের ব্যবসার সুযোগ রয়েছে
নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় মুদি দোকান, রেস্তোরাঁ, খাবার সরবরাহ, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতা সেবা, নির্মাণ, পণ্য সরবরাহ, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং পেশাভিত্তিক সেবার বাজার রয়েছে। বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতি বেশি এমন এলাকায় দেশীয় খাবার, পোশাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার চাহিদা থাকতে পারে। তবে কোনো এলাকায় বাংলাদেশি বা অভিবাসী জনগোষ্ঠী বেশি থাকলেই সেখানে ব্যবসা লাভজনক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান, পণ্যের দাম, দোকানের অবস্থান এবং পরিচালন ব্যয় যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এলএলসি গঠন ও প্রাথমিক খরচ
নিউইয়র্কে ব্যবসা পরিচালনার প্রচলিত আইনি কাঠামোর একটি হলো সীমিত দায়বদ্ধতা কোম্পানি বা এলএলসি। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের তথ্য অনুযায়ী, একটি দেশীয় এলএলসি নিবন্ধনের সরকারি ফি ২০০ ডলার। তবে এটিই ব্যবসা প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ খরচ নয়।
নিউইয়র্কে অধিকাংশ এলএলসির ক্ষেত্রে নিবন্ধনের ১২০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত দুটি সংবাদপত্রে টানা ছয় সপ্তাহ প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশ করতে হয়। এরপর প্রকাশনার হলফনামাসহ সনদ জমা দিতে আরও ৫০ ডলার সরকারি ফি দিতে হয়। সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের খরচ আলাদা এবং কাউন্টি অনুযায়ী তা উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন হতে পারে। এলএলসির সদস্যদের নিবন্ধনের আগে, নিবন্ধনের সময় অথবা ৯০ দিনের মধ্যে লিখিত পরিচালন চুক্তি তৈরি করতে হয়। এ ছাড়া নিবন্ধনের দুই বছর পর এবং এরপর প্রতি দুই বছর অন্তর ৯ ডলার ফি দিয়ে তথ্য বিবরণী জমা দিতে হয়।
ব্যবসার ধরন অনুযায়ী লাইসেন্স, অনুমতিপত্র, বীমা, হিসাবরক্ষণ ও আইনজীবীর খরচও যুক্ত হবে। রেস্তোরাঁ, পরিবহন, নির্মাণ বা খাদ্যপণ্যের ব্যবসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। তাই ব্যবসা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্য ও নগর কর্তৃপক্ষের নিয়ম যাচাই করা জরুরি।
সরকারি সহায়তা ও অর্থায়নের সুযোগ
নিউইয়র্ক সিটির ক্ষুদ্র ব্যবসা সেবা বিভাগ উদ্যোক্তাদের বিনা মূল্যে ব্যবসা শুরু, আইনি কাঠামো নির্বাচন, লাইসেন্স ও অনুমতিপত্র, অর্থায়ন এবং বিভিন্ন প্রণোদনা সম্পর্কে পরামর্শ দেয়। শহরের পাঁচটি বরোতেই ব্যবসায়িক পরামর্শকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে ব্যবসার পরিকল্পনা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।
এ ছাড়া নিউইয়র্ক ফিউচার ফান্ড কর্মসূচির আওতায় যোগ্য ছোট ব্যবসাগুলো ২৫ হাজার থেকে ৫ লাখ ডলার পর্যন্ত রাজস্বভিত্তিক ঋণের জন্য আবেদন করতে পারে। বর্তমান কর্মসূচিতে বার্ষিক সুদের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ব্যবসার আয় অনুযায়ী মূল অর্থ পরিশোধের পরিমাণ নির্ধারিত হয়। তবে এটি অনুদান নয়, ঋণ। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ অর্থায়ন-সংক্রান্ত ফি রয়েছে। ২০ শতাংশ বা তার বেশি মালিকানার অংশীদারদের ব্যক্তিগত জামিন দিতে হতে পারে। ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত আর্থিক পরামর্শকের সঙ্গে বৈঠকও করতে হয়।
আবেদনের জন্য ব্যবসার অন্তত ১২ মাসের কার্যক্রম, এক বছরের কর বিবরণী এবং বছরে কমপক্ষে ৫০ হাজার ডলারের প্রকৃত বা সম্ভাব্য আয়ের শর্ত রয়েছে। ঋণের অর্থ কার্যকরী মূলধন, পণ্য মজুত, বিপণন, কর্মী নিয়োগ, উপকরণ ও ছোট যন্ত্রপাতি কেনার মতো কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ঋণ অনুমোদন নির্ভর করবে আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা ও ঋণদাতার মূল্যায়নের ওপর।
বাংলাদেশিদের জন্য ই-২ বিনিয়োগকারী ভিসা
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ই-২ চুক্তিভিত্তিক বিনিয়োগকারী ভিসার যোগ্য দেশের তালিকায় রয়েছে। ফলে বাংলাদেশি নাগরিকেরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসায় বিনিয়োগ ও তা পরিচালনার উদ্দেশ্যে এ ভিসার আবেদন করতে পারেন। তবে ই-২ ভিসা অস্থায়ী অভিবাসন মর্যাদা; এটি সরাসরি স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিনকার্ড দেয় না।
এ ভিসার জন্য আইনে নির্দিষ্ট কোনো সর্বনিম্ন বিনিয়োগের অঙ্ক নেই। বিনিয়োগের পরিমাণ ব্যবসার মোট ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট হতে হবে এবং অর্থ প্রকৃত ব্যবসায়িক ঝুঁকির মধ্যে রাখতে হবে। ব্যবসাটি বাস্তবে পরিচালিত হতে হবে, কেবল বিনিয়োগকারী ও তাঁর পরিবারের ন্যূনতম জীবিকা নির্বাহের মতো সীমিত ব্যবসা হলে চলবে না। আবেদনকারীকে ব্যবসার অন্তত ৫০ শতাংশ মালিকানা অথবা ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকার প্রমাণ দিতে হবে। বিনিয়োগের অর্থ বৈধ উৎস থেকে এসেছে, সেটিও দেখাতে হয়।
স্থায়ী বসবাসের পথ ইবি-৫
যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের আরেকটি পথ হলো ইবি-৫ বিনিয়োগকারী অভিবাসন কর্মসূচি। বর্তমান আইনে সাধারণ প্রকল্পে অন্তত ১০ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করতে হয়। নির্দিষ্ট কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এলাকা বা অনুমোদিত অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম পরিমাণ ৮ লাখ ডলার। এ কর্মসূচিতে সাধারণত যোগ্য মার্কিন কর্মীদের জন্য অন্তত ১০টি পূর্ণকালীন চাকরি সৃষ্টির শর্ত রয়েছে।
ইবি-৫ কর্মসূচিতে বিনিয়োগের অর্থ বৈধ উৎস থেকে এসেছে, তা প্রমাণ করতে হয়। শুধু নির্ধারিত অর্থ বিনিয়োগ করলেই গ্রিনকার্ড নিশ্চিত হয় না; প্রকল্প, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থের উৎস এবং অন্যান্য আইনি শর্ত পূরণ করে আবেদন অনুমোদিত হতে হয়। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বিনিয়োগের ন্যূনতম অঙ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয়ের বিধান রয়েছে। তাই ওই তারিখ বা তার পরে আবেদন করতে চাইলে জমা দেওয়ার সময় কার্যকর সরকারি অঙ্ক যাচাই করা জরুরি।
বিনিয়োগের আগে যে ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করবেন
নিউইয়র্কে ব্যবসা শুরু করতে কত অর্থ প্রয়োজন, তার একক কোনো উত্তর নেই। ছোট পরিসরে পরামর্শসেবা বা দক্ষতাভিত্তিক কাজ শুরু করতে তুলনামূলক কম মূলধন লাগতে পারে। অন্যদিকে রেস্তোরাঁ, মুদি দোকান, পরিবহন, গুদাম কিংবা উৎপাদনমুখী ব্যবসার জন্য জায়গা ভাড়া, যন্ত্রপাতি, কর্মী, পণ্য মজুত ও কার্যকরী মূলধনে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। ব্যবসা চালুর আগেই কয়েক মাসের সম্ভাব্য ব্যয় ও আয় হিসাব করা উচিত।
অংশীদারত্বে ব্যবসা শুরু করলে মালিকানা, বিনিয়োগের পরিমাণ, লাভ-ক্ষতির ভাগ, দায়িত্ব বণ্টন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং কোনো অংশীদার ব্যবসা ছাড়লে কী হবে, তা লিখিত চুক্তিতে নির্ধারণ করা জরুরি। ব্যাংক হিসাব, হিসাবরক্ষণ ও ব্যবসার আর্থিক নথি স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। বাজার যাচাই ছাড়া বিনিয়োগ, অতিরিক্ত ঋণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কিংবা অংশীদারদের বিরোধে লোকসান হতে পারে।
মোহাম্মদ আদিল হুসেন, ব্যবসায়িক পরামর্শক, অ্যাডস্কিল কনসালট্যান্সি ইনকরপোরেটেড, জ্যাকসন হাইটস, ব্যবসা শুরু করার আগে বাজার যাচাই, সঠিক ব্যবসায়িক কাঠামো, আর্থিক পরিকল্পনা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত যোগ্যতা একসঙ্গে বিবেচনার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সরবরাহ করা নম্বর: +১ ৪২৫ ৫৪০ ৭৯৯৬। তবে বিনিয়োগ বা ভিসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারী আইনজীবী, হিসাবরক্ষক এবং অভিবাসন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিউইয়র্কে ব্যবসার বাজার বড় হলেও সফলতার জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত মূলধন, বৈধ কাগজপত্র এবং নিয়মিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা। ব্যবসা শুরু করা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অভিবাসন প্রক্রিয়া দুটি আলাদা বিষয়। তাই ব্যবসার সম্ভাবনা যাচাইয়ের পাশাপাশি ভিসার যোগ্যতা ও আইনি শর্তও আলাদাভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।
সূত্র: নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট, নিউইয়র্ক সিটির ক্ষুদ্র ব্যবসা সেবা বিভাগ, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবার প্রকাশিত তথ্য।


















