কালনী নদীর বুকে ভাসমান বেদেপল্লি: প্রজন্মের পর প্রজন্মের জীবন সংগ্রাম ও পরিবর্তনের আশা
- প্রকাশঃ ০২:৪৮:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫
- / 81
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চান্দপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কালনী নদীর তীরে অর্ধশতাধিক বেদে নারী–পুরুষ ও শিশুর বসতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নৌকাকেই ঘর বানিয়ে তারা বাস করছে। চারদিকে পরিবর্তনের ঢেউ লাগলেও এই নদীপারের বেদেপল্লির জীবনমান খুব একটা বদলায়নি। ছোট নৌকার ভেতরই তাদের রান্না, ঘুম, সংসার আর জীবিকার সব আয়োজন।
বেদেসমাজের এই ভাসমান জীবন দীর্ঘদিন ধরে একই রকমভাবে চলমান। ভেষজ চিকিৎসা, তাবিজ–কবজ তৈরি, শিঙা লাগানো, দাঁতের ব্যথা নিরাময়, কসমেটিকস বিক্রি এবং গান গাওয়াই ‘গাইন বেদেদের’ প্রধান পেশা। কোনো বাজারে ভিড় দেখলেই সেখানে সুর তোলে গান, আবার কোথাও জমে ওঠে সাপের খেলা। তাদের এই অনিশ্চিত দিনযাপন যেন কালনী নদীর স্রোতের মতোই চলমান।
সরেজমিনে চান্দপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কালনী নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা বাঁধা। বর্ষায় যাতায়াত সহজ হলেও হেমন্ত ও শীতে নাব্য কমে নৌচলাচল ব্যাহত হয়। নদী শুকিয়ে গেলে নৌকা কাদায় আটকে পড়ে, আর তখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজেরাই নৌকা ঠেলে পথ করে নিতে হয়। ফেরিঘাট পারাপারেও স্থানীয়দের মতোই ভোগান্তি সঙ্গী হয় তাদের।
বেদেপল্লির প্রবীণ সরদার লেচু মিয়া ও আক্কল আলী জানান, স্বাধীনতার পর থেকেই তারা এই এলাকায় নৌকা নিয়ে বসবাস করছেন। এর আগে ছিল রফিনগরে আস্তানা। তারা বলেন, আমরা দিনে আনি দিনে খাই। আগের মতো আয়–রোজগার নাই। ছেলে–মেয়েদের পড়াইতে চাই, কিন্তু টেকার অভাবে সবারে স্কুলে দিতে পারি না। সরকার থেকেও তেমন সাহায্য পাই না।
এই বেদেপল্লির ১২টি নৌকায় থাকে অর্ধশতাধিক মানুষ। এর মধ্যে সাতটি নৌকায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে, বাকি পাঁচটি এখনো কুপিবাতির ওপর নির্ভরশীল। নৌকার সংকীর্ণ জায়গা, আলো–বাতাসের সমস্যা, মশা–পোকামাকড়ের উপদ্রব—সব মিলিয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে ওঠে। শিশুরা নৌকার সরু ডেকে খেলা করে, আর নারীরা সেই সঙ্কীর্ণ জায়গাতেই রান্না–বাড়া সারেন।
তবে সময় বদলের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন এসেছে। কেউ কেউ পুরোনো পেশা ছেড়ে দিনমজুরি করছে, কেউ দোকানে চাকরি নিয়েছে, আবার কেউ স্থানীয়ভাবে জায়গা কিনে স্থায়ীভাবে বসবাসের চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা—চান্দপুর এলাকায় কোনো সড়ক নেই। ফলে বাজার, স্কুল বা হাসপাতালে যেতে তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বেদেদের দাবি, সরকার যদি আরও সোলার দিত, গ্রামের দিকে একটা রাস্তা বানাইতো, তাহলে জীবনটা একটু সহজ হইতো।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজিব সরকার বলেন, চান্দপুর এলাকায় বেদে সম্প্রদায়ের সমস্যাগুলো আমরা জানি। ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





























