চির বিদায়ে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া
- প্রকাশঃ ১১:০০:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 100
বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বরাত দিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সকাল সোয়া ৭টার দিকে গণমাধ্যমকে বলেন, “আম্মা আর নেই।” একই সঙ্গে বিএনপির মিডিয়া সেল এবং দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পৃথক পোস্টে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে দেশবাসীর কাছে তার রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া চাওয়া হয়।
দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস ও কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। গত ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছিল।
চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকে বিদেশে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। প্রায় এক মাসের বেশি সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর শেষ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসায় সাড়া দেননি।
শৈশব, শিক্ষা ও পারিবারিক জীবন
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ও মাতা তৈয়বা মজুমদার। তাদের আদি নিবাস ফেনী জেলায়। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দায়িত্বকালীন সময়ে তিনি ফার্স্ট লেডি হিসেবে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে অংশ নেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে সরাসরি রাজনীতিতে তার প্রবেশ ঘটে ১৯৮১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর।
রাজনীতিতে উত্থান
১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা
১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরও দুই দফা সরকার পরিচালনা করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান।
তার শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
নির্বাচনী রাজনীতিতে অনন্য রেকর্ড
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার সবচেয়ে আলোচিত ও বিরল রেকর্ড হলো—তিনি জীবনে কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রতিটিতেই বিজয়ী হন।
একসময় একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি আসনে নির্বাচন করার সুযোগ পেতেন। সেই সুযোগে তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন) ও ২০০১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয়লাভ করেন। টানা তিন নির্বাচনে পাঁচ আসনে জয়লাভের এই ‘হ্যাটট্রিক’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
শেষ বিদায়
মৃত্যুর সময় তার পাশে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা এবং দলের শীর্ষ নেতারা। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তার জানাজা আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হতে পারে। জানাজা ও দাফনের চূড়ান্ত সময়সূচি পরে বিস্তারিতভাবে জানানো হবে।
একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি রেখে গেছেন বিরল রেকর্ড, আর একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়েছেন স্থায়ীভাবে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৃষ্টি হলো এক অপূরণীয় শূন্যতা।





























