ঢাকা ০১:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

১২০০ টাকার এলপিজি ১৮০০–২১০০ টাকায়ও দুর্লভ, নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে বাড়ছে ভোক্তার ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ০১:১০:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 59

সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম যেখানে সরকারি হিসাবে ১ হাজার ২৫৩ টাকা, সেখানে খুচরা বাজারে তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। কোথাও আবার এই দামেও মিলছে না এলপিজি।

গত ২৪ ডিসেম্বর সকালে রান্নার গ্যাস শেষ হয়ে গেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা কাওসার খান একাধিক দোকানে ফোন করে এলপিজি সিলিন্ডার পাননি। পরে আরেকটি দোকান থেকে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে গুনতে হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। কাওসার খান বলেন, হঠাৎ করে এমন দাম বাড়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা ফারজানা নীলা। তিনি বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও দাম দিতে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকা, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ৫০০ টাকা বেশি।

মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা আসমা আখতার জানান, ৩১ ডিসেম্বর তিনি ১ হাজার ৮০০ টাকাতেও এলপিজি পাননি। শেষ পর্যন্ত ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে তাকে ২ হাজার ১০০ টাকা দিতে হয়েছে।

দুই সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে এলপিজির দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা। তাঁদের ভাষ্য, চাহিদা অনুযায়ী কোম্পানিগুলো এলপিজি সরবরাহ করছে না। ফলে তাঁরা বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।

এ পরিস্থিতিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান। তিনি বলেন, অধিকাংশ কোম্পানি সরবরাহ সীমিত বা বন্ধ রেখেছে। ১ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০টি। এতে পরিবহন খরচ বেড়েছে। তবে সরকারিভাবে দাম না বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বাড়তি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এলপিজির দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণের কথা বলছে সংশ্লিষ্টরা। শীত মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বৃদ্ধি, পাশাপাশি এলপিজি আমদানিতে জাহাজসংকট পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ায় আমদানি কমে গেছে। ডিসেম্বরে যেখানে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানির কথা, সেখানে এসেছে মাত্র ৯০ হাজার টন।

এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব)–এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ জানান, ডিসেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে তাঁদের দাবি, তাঁরা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামেই এলপিজি সরবরাহ করছেন। খুচরা বাজারের দাম তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। ডিসেম্বরের জন্য প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা। সে হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়ায় গত বৃহস্পতিবার লোয়াবকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আমদানিকারকদের প্রকৃত খরচ বাড়লে তা কাগজপত্রসহ কমিশনে জমা দিতে হবে। যাচাই শেষে মূল্য সমন্বয় করা হতে পারে। তবে তার আগে বাড়তি দামে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।

তবে বাস্তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিইআরসির কার্যকর ভূমিকা নেই বলে অভিযোগ তুলেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বেশি দামে বিক্রি আইনত অপরাধ হলেও এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে ভোক্তার মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।

সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এলপিজির দাম বাড়তে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

১২০০ টাকার এলপিজি ১৮০০–২১০০ টাকায়ও দুর্লভ, নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে বাড়ছে ভোক্তার ভোগান্তি

প্রকাশঃ ০১:১০:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম যেখানে সরকারি হিসাবে ১ হাজার ২৫৩ টাকা, সেখানে খুচরা বাজারে তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। কোথাও আবার এই দামেও মিলছে না এলপিজি।

গত ২৪ ডিসেম্বর সকালে রান্নার গ্যাস শেষ হয়ে গেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা কাওসার খান একাধিক দোকানে ফোন করে এলপিজি সিলিন্ডার পাননি। পরে আরেকটি দোকান থেকে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে গুনতে হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। কাওসার খান বলেন, হঠাৎ করে এমন দাম বাড়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পাই না।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা ফারজানা নীলা। তিনি বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও দাম দিতে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকা, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ৫০০ টাকা বেশি।

মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা আসমা আখতার জানান, ৩১ ডিসেম্বর তিনি ১ হাজার ৮০০ টাকাতেও এলপিজি পাননি। শেষ পর্যন্ত ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে তাকে ২ হাজার ১০০ টাকা দিতে হয়েছে।

দুই সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে এলপিজির দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা। তাঁদের ভাষ্য, চাহিদা অনুযায়ী কোম্পানিগুলো এলপিজি সরবরাহ করছে না। ফলে তাঁরা বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।

এ পরিস্থিতিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান। তিনি বলেন, অধিকাংশ কোম্পানি সরবরাহ সীমিত বা বন্ধ রেখেছে। ১ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০টি। এতে পরিবহন খরচ বেড়েছে। তবে সরকারিভাবে দাম না বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বাড়তি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এলপিজির দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণের কথা বলছে সংশ্লিষ্টরা। শীত মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বৃদ্ধি, পাশাপাশি এলপিজি আমদানিতে জাহাজসংকট পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ায় আমদানি কমে গেছে। ডিসেম্বরে যেখানে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানির কথা, সেখানে এসেছে মাত্র ৯০ হাজার টন।

এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব)–এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ জানান, ডিসেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে তাঁদের দাবি, তাঁরা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামেই এলপিজি সরবরাহ করছেন। খুচরা বাজারের দাম তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। ডিসেম্বরের জন্য প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা। সে হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়ায় গত বৃহস্পতিবার লোয়াবকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আমদানিকারকদের প্রকৃত খরচ বাড়লে তা কাগজপত্রসহ কমিশনে জমা দিতে হবে। যাচাই শেষে মূল্য সমন্বয় করা হতে পারে। তবে তার আগে বাড়তি দামে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।

তবে বাস্তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিইআরসির কার্যকর ভূমিকা নেই বলে অভিযোগ তুলেছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বেশি দামে বিক্রি আইনত অপরাধ হলেও এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে ভোক্তার মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি হচ্ছে।

সরবরাহ সংকটের অজুহাতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এলপিজির দাম বাড়তে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”