গুম ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ: চূড়ান্ত প্রতিবেদনে গুম তদন্ত কমিশন
- প্রকাশঃ ১১:৫০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / 64
বাংলাদেশে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলোর পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল—এমন তথ্য উঠে এসেছে গুম তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। কমিশনের সদস্যরা জানিয়েছেন, সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে এটি স্পষ্টভাবে পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেয় গুম তদন্ত কমিশন। এ সময় কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার কমিশনের বরাত দিয়ে জানান, মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে চিহ্নিত হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত।
কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গুমের প্রকৃত সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তিনি জানান, অনেক ভিকটিম এখনো কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কেউ বিদেশে চলে গেছেন, কেউ কমিশনের বিষয়ে অবগত নন, আবার অনেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণে অনরেকর্ড বক্তব্য দিতেও রাজি হননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অন্যদিকে যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
কমিশনের অনুসন্ধানে উচ্চপর্যায়ের একাধিক গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। উল্লেখযোগ্য মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।
কমিশনের সদস্যরা জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী একাধিক গুমের ঘটনায় সরাসরি নির্দেশদাতা ছিলেন। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া গোপনে হস্তান্তর) যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া সম্ভব নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। গণতন্ত্রের মোড়কে কীভাবে পৈশাচিক আচরণ চালানো যায়-এই রিপোর্ট তার প্রামাণ্য নথি। জাতি হিসেবে আমাদের এ ধরনের নৃশংসতা থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে হবে।”
তিনি প্রতিবেদনগুলো সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা ও ভবিষ্যৎ করণীয় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।
এছাড়া আয়নাঘরের পাশাপাশি যেসব স্থানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সেসব স্থান ম্যাপিং করার নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা। কমিশনের তথ্যমতে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। তদন্তে বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুমের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থানের জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তাঁর সহযোগিতা ও সমর্থন ছাড়া এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং ভিকটিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।


























