ঢাকা ০৮:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্কুলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ, ট্রমায় চার বছরের শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ০৩:২২:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 61

শিশুটিকে ধরে রেখেছেন প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান। আর মারধর করছেন স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার। ছবি: সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া


রাজধানীর একটি স্কুলে চার বছরের কম বয়সী এক শিশুকে নির্মমভাবে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখনো গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার মা।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শিশুটির মা। তিনি বলেন, “আমার বাচ্চা এখনো ভয় কাটাতে পারেনি। ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে বলে—‘মুখ সিলি করে দিয়ো না।’ আবার বলে, ‘স্কুলে যাব না।’ আমরা জোর করে স্কুলে পাঠাব—এই ভয়ে আমাদের সঙ্গেও থাকতে চাইছে না। এখন সে নানা বাড়িতে আছে।”

শিশুটির বাবা জানান, প্রি-প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর ছেলে এমন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্যাতনের ভিডিও দেখে তাঁরা হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। শিশুটি বারবার বলেছে, “আঙ্কেল বলেছে, বাসায় বললে গলায় পাড়া দেবে, মুখ সেলাই করে দেবে।”

স্কুলের অফিস কক্ষে নির্যাতনের দৃশ্য

ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ জানুয়ারি, নয়াপল্টনের মসজিদ রোডে অবস্থিত শারমিন একাডেমি নামের একটি স্কুলে। স্কুলের অফিস কক্ষে ধারণ করা ভিডিওটি এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল।

ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলের পোশাক পরা শিশুটিকে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে প্রথমে এক নারী চড় মারেন। পরে সেখানে থাকা এক পুরুষ শিশুটির গলা ও মুখ চেপে ধরেন। তাঁর হাতে ছিল স্ট্যাপলার। শিশুটি কাঁদছিল ও ছটফট করছিল, আর ওই নারী শিশুটিকে ধরে রাখছিলেন। একপর্যায়ে শিশুটি নারীর শাড়িতে থুতু ফেললে, পুরুষটি শিশুটির মাথা জোর করে শাড়িতে চেপে ধরে কয়েকবার ঝাঁকান।

পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওতে থাকা নারী হলেন স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এবং পুরুষটি স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী।

মামলা, আসামিরা পলাতক

আজ শিশুটির মা বাদী হয়ে শিশু আইন ২০১৩-এর ৭০ ধারায় পল্টন থানায় মামলা করেন। মামলায় শারমিন জাহান ও পবিত্র কুমারকে আসামি করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মতিঝিল জোন) হুসাইন মুহাম্মদ ফারাবী বলেন, নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজে ঘটনাটি স্পষ্ট। পুলিশ স্কুল পরিদর্শন করেছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে পলাতক।

পল্টন থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান বলেন, শুরুতে পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল এবং মামলা করতে দ্বিধায় ছিল। পরে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে সম্মত হন।

বাসায় ফিরে শিশুর শারীরিক অসুস্থতা

শিশুটির মা জানান, ঘটনার দিন ছেলেকে নিতে গিয়ে তার পোশাক এলোমেলো ও মনমরা দেখে সন্দেহ হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ তখন ‘হালকা চড় দেওয়ার’ কথা স্বীকার করে। কিন্তু বাসায় ফিরে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং গলা, মুখ ও কানে ব্যথার কথা জানায়।

পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে শিশুটির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি লক্ষ্য করা যায়। পরে সিসিটিভির ভিডিও সংগ্রহ করে পুরো ঘটনার ভয়াবহতা প্রকাশ পায়।

অভিভাবকদের ক্ষোভ ও আতঙ্ক

ঘটনার পর আজ সকালে স্কুলটি বন্ধ দেখা গেছে। তবে সেখানে জড়ো হন একাধিক অভিভাবক। তাঁরা জানান, ভিডিও দেখে তাঁরা আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ। অনেকেই সন্তানকে ওই স্কুলে পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

শিশু নির্যাতনের শাস্তি ও আইন

শিশু আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ নীতিমালা’ থাকলেও কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ে নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।

পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞ মত

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রওশন আরা বলেন, “শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ না হলে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব পুরো সমাজে পড়বে।”

চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ জানিয়েছে, শিশুটিকে মানসিক ট্রমা থেকে বের করে আনতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

স্কুলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ, ট্রমায় চার বছরের শিশু

প্রকাশঃ ০৩:২২:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

শিশুটিকে ধরে রেখেছেন প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান। আর মারধর করছেন স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার। ছবি: সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া


রাজধানীর একটি স্কুলে চার বছরের কম বয়সী এক শিশুকে নির্মমভাবে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখনো গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার মা।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শিশুটির মা। তিনি বলেন, “আমার বাচ্চা এখনো ভয় কাটাতে পারেনি। ঘুমের মধ্যেও চিৎকার করে বলে—‘মুখ সিলি করে দিয়ো না।’ আবার বলে, ‘স্কুলে যাব না।’ আমরা জোর করে স্কুলে পাঠাব—এই ভয়ে আমাদের সঙ্গেও থাকতে চাইছে না। এখন সে নানা বাড়িতে আছে।”

শিশুটির বাবা জানান, প্রি-প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর ছেলে এমন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্যাতনের ভিডিও দেখে তাঁরা হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। শিশুটি বারবার বলেছে, “আঙ্কেল বলেছে, বাসায় বললে গলায় পাড়া দেবে, মুখ সেলাই করে দেবে।”

স্কুলের অফিস কক্ষে নির্যাতনের দৃশ্য

ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ জানুয়ারি, নয়াপল্টনের মসজিদ রোডে অবস্থিত শারমিন একাডেমি নামের একটি স্কুলে। স্কুলের অফিস কক্ষে ধারণ করা ভিডিওটি এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল।

ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলের পোশাক পরা শিশুটিকে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে প্রথমে এক নারী চড় মারেন। পরে সেখানে থাকা এক পুরুষ শিশুটির গলা ও মুখ চেপে ধরেন। তাঁর হাতে ছিল স্ট্যাপলার। শিশুটি কাঁদছিল ও ছটফট করছিল, আর ওই নারী শিশুটিকে ধরে রাখছিলেন। একপর্যায়ে শিশুটি নারীর শাড়িতে থুতু ফেললে, পুরুষটি শিশুটির মাথা জোর করে শাড়িতে চেপে ধরে কয়েকবার ঝাঁকান।

পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিওতে থাকা নারী হলেন স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এবং পুরুষটি স্কুলের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী।

মামলা, আসামিরা পলাতক

আজ শিশুটির মা বাদী হয়ে শিশু আইন ২০১৩-এর ৭০ ধারায় পল্টন থানায় মামলা করেন। মামলায় শারমিন জাহান ও পবিত্র কুমারকে আসামি করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মতিঝিল জোন) হুসাইন মুহাম্মদ ফারাবী বলেন, নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজে ঘটনাটি স্পষ্ট। পুলিশ স্কুল পরিদর্শন করেছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে পলাতক।

পল্টন থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান বলেন, শুরুতে পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল এবং মামলা করতে দ্বিধায় ছিল। পরে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে সম্মত হন।

বাসায় ফিরে শিশুর শারীরিক অসুস্থতা

শিশুটির মা জানান, ঘটনার দিন ছেলেকে নিতে গিয়ে তার পোশাক এলোমেলো ও মনমরা দেখে সন্দেহ হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ তখন ‘হালকা চড় দেওয়ার’ কথা স্বীকার করে। কিন্তু বাসায় ফিরে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং গলা, মুখ ও কানে ব্যথার কথা জানায়।

পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে শিশুটির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি লক্ষ্য করা যায়। পরে সিসিটিভির ভিডিও সংগ্রহ করে পুরো ঘটনার ভয়াবহতা প্রকাশ পায়।

অভিভাবকদের ক্ষোভ ও আতঙ্ক

ঘটনার পর আজ সকালে স্কুলটি বন্ধ দেখা গেছে। তবে সেখানে জড়ো হন একাধিক অভিভাবক। তাঁরা জানান, ভিডিও দেখে তাঁরা আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ। অনেকেই সন্তানকে ওই স্কুলে পাঠানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

শিশু নির্যাতনের শাস্তি ও আইন

শিশু আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ নীতিমালা’ থাকলেও কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ে নজরদারির ঘাটতি রয়েছে।

পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞ মত

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রওশন আরা বলেন, “শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধ না হলে তাদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব পুরো সমাজে পড়বে।”

চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ জানিয়েছে, শিশুটিকে মানসিক ট্রমা থেকে বের করে আনতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”