ঢাকা ০৩:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও কেন থামছে না গাজা, লেবানন ও ইরানের সংঘাত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • প্রকাশঃ ০৩:৫৬:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬
  • / 2

ছবি: সংগৃহীত


গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে একাধিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে হামলা, প্রাণহানি এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এতে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা, আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইসরায়েল ও লেবানন গত বুধবার নতুন করে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। এর আগে ১৬ এপ্রিলও উভয় পক্ষ একই ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছিল। একইভাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি বলবৎ আছে।

তবে এসব সমঝোতার পরও সংঘর্ষ বন্ধ হয়নি। শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননের নাকৌরা ও নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত একজন নিহত হন। একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন হামলার অভিযোগ করছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এসব ঘটনার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গাজাতেও যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হামলার ঘটনা ঘটছে। চলতি সপ্তাহে একটি আবাসিক ভবনে হামলায় নয়জন নিহত হয়েছেন। যদিও যুদ্ধবিরতির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানো।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব দ্য ফ্রেজার ভ্যালির অপরাধবিচার ও অপরাধতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মার্ক কার্স্টেন বলেন, যুদ্ধবিরতি হলো সংঘর্ষ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এটি সাধারণত চূড়ান্ত বা স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয় না।

কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাইকেল লিংকের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি অনেক ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোর তুলনায় রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে বেশি কার্যকর হয়। তাঁর মতে, শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত বাস্তবায়ন ও তদারকির ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে তা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।

ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী ও গোয়ের্নিকা-৩৭ চেম্বার্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা টবি ক্যাডম্যান বলেন, যুদ্ধবিরতি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হলেও এটি স্বভাবগতভাবে নাজুক। কারণ, এটি সামরিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে, কিন্তু মূল সংঘাতের সমাধান করে না।

গাজা, লেবানন ও ইরান সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রায় সব পক্ষই একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন কোনো নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ নেই, যার বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে যে কোন পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব সাধারণত মধ্যস্থতাকারী দেশ বা পক্ষের ওপর থাকে। গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এমন ভূমিকা পালন করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের মূল্যায়ন রাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।

মার্ক কার্স্টেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। বহু রাষ্ট্র বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করলেও তা সংঘাত বন্ধ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) তদন্ত বা রায় দিতে পারলেও সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। ফলে আইনি সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের পদক্ষেপের মধ্যে ব্যবধান থেকে যায়।

টবি ক্যাডম্যানের মতে, গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার অধিকার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আইনি যুক্তি। তবে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সহিংসতা অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ হলো বাস্তবায়ন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক আদালতের সীমিত প্রয়োগক্ষমতা এবং রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

মাইকেল লিংক বলেন, কার্যকর জবাবদিহির অভাব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা। অন্যদিকে টবি ক্যাডম্যানের মতে, আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মের ঘাটতি নেই; মূল সমস্যা সেগুলোর সমান ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

শেয়ার করুন

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও কেন থামছে না গাজা, লেবানন ও ইরানের সংঘাত

প্রকাশঃ ০৩:৫৬:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ জুন ২০২৬

গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে একাধিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে হামলা, প্রাণহানি এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এতে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা, আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইসরায়েল ও লেবানন গত বুধবার নতুন করে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। এর আগে ১৬ এপ্রিলও উভয় পক্ষ একই ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছিল। একইভাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি বলবৎ আছে।

তবে এসব সমঝোতার পরও সংঘর্ষ বন্ধ হয়নি। শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননের নাকৌরা ও নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত একজন নিহত হন। একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন হামলার অভিযোগ করছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এসব ঘটনার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গাজাতেও যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হামলার ঘটনা ঘটছে। চলতি সপ্তাহে একটি আবাসিক ভবনে হামলায় নয়জন নিহত হয়েছেন। যদিও যুদ্ধবিরতির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানো।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব দ্য ফ্রেজার ভ্যালির অপরাধবিচার ও অপরাধতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মার্ক কার্স্টেন বলেন, যুদ্ধবিরতি হলো সংঘর্ষ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। তবে এটি সাধারণত চূড়ান্ত বা স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয় না।

কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাইকেল লিংকের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি অনেক ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোর তুলনায় রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে বেশি কার্যকর হয়। তাঁর মতে, শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণত বাস্তবায়ন ও তদারকির ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে তা অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।

ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী ও গোয়ের্নিকা-৩৭ চেম্বার্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা টবি ক্যাডম্যান বলেন, যুদ্ধবিরতি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হলেও এটি স্বভাবগতভাবে নাজুক। কারণ, এটি সামরিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে, কিন্তু মূল সংঘাতের সমাধান করে না।

গাজা, লেবানন ও ইরান সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রায় সব পক্ষই একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন কোনো নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ নেই, যার বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে যে কোন পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব সাধারণত মধ্যস্থতাকারী দেশ বা পক্ষের ওপর থাকে। গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এমন ভূমিকা পালন করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের মূল্যায়ন রাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে।

মার্ক কার্স্টেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। বহু রাষ্ট্র বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করলেও তা সংঘাত বন্ধ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) তদন্ত বা রায় দিতে পারলেও সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। ফলে আইনি সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের পদক্ষেপের মধ্যে ব্যবধান থেকে যায়।

টবি ক্যাডম্যানের মতে, গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার অধিকার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আইনি যুক্তি। তবে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সহিংসতা অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ হলো বাস্তবায়ন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক আদালতের সীমিত প্রয়োগক্ষমতা এবং রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

মাইকেল লিংক বলেন, কার্যকর জবাবদিহির অভাব আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা। অন্যদিকে টবি ক্যাডম্যানের মতে, আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মের ঘাটতি নেই; মূল সমস্যা সেগুলোর সমান ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।