ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। দুই বছর ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় উপত্যকার অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ন্যূনতম বাসযোগ্য পরিবেশ না থাকলেও বাধ্য হয়ে তাঁবু টানিয়ে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় বসবাস করতে হচ্ছে তাঁদের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব তাঁবুতে পর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা নেই। ফলে শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও ত্বকজনিত রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, নোংরা পরিবেশ ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আবু আমর পরিবার ১৭ বারের বেশি স্থানান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে তাঁরা গাজার রিমাল এলাকায় আবর্জনার ভাগাড়ের পাশে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন। দূষণ, দুর্গন্ধ ও অসুস্থতার সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করেই টিকে থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
৬৪ বছর বয়সী আবু আমর বলেন, গাজায় আমরা দুটি যুদ্ধের মধ্যে আছি—একটি বোমা হামলা, আরেকটি আবর্জনার সঙ্গে যুদ্ধ। আমার অ্যাজমার সমস্যা রয়েছে। ময়লার দুর্গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হলে ইনহেলার ব্যবহার করতে হয়।
তাঁর পুত্রবধূ, পাঁচ সন্তানের জননী সুরাইয়া আবু আমর বলেন, তাঁবুতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
“এখানে পানির সংকট চরম। মাসে কয়েকবার পেটের পীড়ায় ভুগতে হয়,” বলেন তিনি।
তিনি জানান, বাইত আল-লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে গাজা নগরীতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। যুদ্ধের আগে তাঁদের জীবন ছিল পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন।
হতাশা
ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত গাজায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। উপত্যকার অধিকাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতির পরও চার শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
বাসিন্দা সেলিম (৪০) বলেন,
“আমাদের সন্তানরা শীত ও গরমে প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে। বাতাসের সঙ্গে দুর্গন্ধ আসে। খেতে বসলে খাবারেও অরুচি লাগে।”
তিনি জানান, ঝড়ের সময় নর্দমার পানি তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং কাপড় নোংরা হয়ে যায়।
“পরিষ্কার কাপড় নেই। অনেক সময় নোংরা কাপড়েই নামাজ পড়তে হয়,” বলেন তিনি।
১৩ বছর বয়সী শিশু রাহাফ জানায়, পরিচ্ছন্নতার অভাবে তার চুল পড়ছে এবং ত্বকে সংক্রমণ হয়েছে।
স্বাস্থ্য সংকট
গাজার আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের ফুসফুস বিভাগের প্রধান আহমেদ আলরাবিই বলেন, গাজার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভয়াবহ। আমরা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দেখতে পাচ্ছি। যুদ্ধের আগে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি।
গাজা মিউনিসিপ্যালিটির কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েলি হামলায় পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আহমেদ দিরিয়েমলি বলেন, গাজা নগরীতে দেড় লাখ মিটারের বেশি পাইপ এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ পানির কূপ ধ্বংস হয়েছে। পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও পুরোপুরি অচল।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও ভেঙে পড়েছে। গাজার পূর্বাঞ্চলে বর্জ্য ফেলার স্থানে প্রবেশে বাধা দেওয়ায় শহরজুড়ে ময়লার স্তূপ জমে উঠেছে। মিউনিসিপ্যালিটির মুখপাত্র হুসনি মুহানা জানান, উপত্যকায় ৭ লাখ টনের বেশি বর্জ্য জমা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু গাজা নগরীতেই সাড়ে তিন লাখ টনের বেশি।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতির পরও গাজাবাসীর জীবন স্বাভাবিক হয়নি। ধ্বংসস্তূপ, বর্জ্যের স্তূপ আর রোগবালাইয়ের মধ্যে তাঁবুতে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে লাখো মানুষের। স্থানীয়দের মতে, অবকাঠামো পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা ছাড়া এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।





























