ঢাকা ১১:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সৈয়দ আশরাফুল হককে খোলা প্রশ্ন: খেলোয়াড়ের স্বপ্নের চেয়েও কি জীবন ছোট

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ১২:৩৮:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 19

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু নিয়ে চলমান সংকটকে ঘিরে সাবেক ক্রিকেট সংগঠক সৈয়দ আশরাফুল হকের বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ভারতভিত্তিক একটি ক্রিকেট ওয়েবসাইটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যেকোনো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন বোর্ডের উচিত ছিল আইসিসির নিরাপত্তা পরিকল্পনা খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া। তাঁর মতে, সরকার বা বোর্ড নয়, সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত ছিল খেলোয়াড়দের।

তিনি আরও মন্তব্য করেন, একটি ‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের জন্য খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ খেলার আজন্ম স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার দায়ভার ব্যক্তিগতভাবে তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। তারা বলেন, একজন ক্রিকেটার মাঠের পারফরম্যান্সে বিশেষজ্ঞ হলেও সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও বোর্ডের।

উদাহরণ হিসেবে সমালোচকেরা তুলে ধরছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত যখন পাকিস্তানে এশিয়া কাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অংশ নেয় না, তখন সেই সিদ্ধান্ত সরকার ও বোর্ড নেয়—খেলোয়াড়দের ভোটাভুটির মাধ্যমে নয়। একইভাবে, ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অংশগ্রহণ না করা কিংবা ইতালির ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে না পারার ঘটনাও দেখানো হচ্ছে যে, একটি বড় টুর্নামেন্টে অনুপস্থিত থাকলেই কোনো দেশের খেলাধুলা ধ্বংস হয়ে যায় না।

নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি সন্দেহে মারধরের ঘটনা, শিবসেনা নেতাদের প্রকাশ্য হুমকি এবং আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, যখন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, তখন পুরো জাতীয় দল, সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

এ অবস্থায় আইসিসির তথাকথিত স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকেরা বলছেন, যদি সত্যিই ঝুঁকি না থাকে, তবে মোস্তাফিজকে আইপিএল দল থেকে সরানোর প্রয়োজন কেন পড়ল—এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর কেউ দেয়নি।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হচ্ছে, তারা বিশ্বকাপ বর্জনের কথা বলেনি; বরং নিরাপত্তার স্বার্থে ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। শ্রীলঙ্কা সহ-আয়োজক দেশ হওয়ায় এটিকে যুক্তিসংগত ও বাস্তবসম্মত দাবি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সমালোচকেরা আরও বলছেন, টিকিট বিক্রি, হোটেল বুকিং বা সম্প্রচার সূচির যুক্তি দেখিয়ে মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিকে পাশ কাটানো গ্রহণযোগ্য নয়। ক্রিকেট ইতিহাসে নিরাপত্তার কারণে শেষ মুহূর্তে ভেন্যু পরিবর্তনের বহু নজির রয়েছে—নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের পাকিস্তান সফর বাতিল তার উদাহরণ।

এই প্রেক্ষাপটে সৈয়দ আশরাফুল হকের বক্তব্যকে ‘দ্বিমুখী’ ও ‘বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন’ আখ্যা দিয়েছেন অনেকে। তাদের মতে, ক্রিকেট বোর্ড বা সরকারের প্রথম দায়িত্ব খেলোয়াড়দের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। খেলোয়াড়দের স্বপ্ন ও ক্যারিয়ারের চেয়ে জীবন ও আত্মসম্মানকে অগ্রাধিকার দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি ছিল বাংলাদেশের ন্যায্য ও মানবিক অবস্থান। এই অবস্থান থেকে সরে আসা মানে ভবিষ্যতে যেকোনো অপমান ও ঝুঁকি মেনে নেওয়ার নজির তৈরি করা। তারা বলেন, বাংলাদেশ এখন শুধু অংশগ্রহণের জন্য ক্রিকেট খেলে না, সম্মানের জন্য খেলে।

আইসিসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ক্ষেত্রে হাইব্রিড মডেল বা নিরপেক্ষ ভেন্যু ব্যবহৃত হলেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে একই নীতি প্রয়োগ করা হয়নি, যা সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ ভেন্যু ইস্যু এখন কেবল একটি ক্রীড়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা, আত্মসম্মান ও ন্যায্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই প্রশ্নে আপস করা মানে ভবিষ্যতের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”

প্রাসঙ্গিক

শেয়ার করুন

সৈয়দ আশরাফুল হককে খোলা প্রশ্ন: খেলোয়াড়ের স্বপ্নের চেয়েও কি জীবন ছোট

প্রকাশঃ ১২:৩৮:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু নিয়ে চলমান সংকটকে ঘিরে সাবেক ক্রিকেট সংগঠক সৈয়দ আশরাফুল হকের বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ভারতভিত্তিক একটি ক্রিকেট ওয়েবসাইটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যেকোনো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন বোর্ডের উচিত ছিল আইসিসির নিরাপত্তা পরিকল্পনা খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া। তাঁর মতে, সরকার বা বোর্ড নয়, সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত ছিল খেলোয়াড়দের।

তিনি আরও মন্তব্য করেন, একটি ‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের জন্য খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ খেলার আজন্ম স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার দায়ভার ব্যক্তিগতভাবে তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। তারা বলেন, একজন ক্রিকেটার মাঠের পারফরম্যান্সে বিশেষজ্ঞ হলেও সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও বোর্ডের।

উদাহরণ হিসেবে সমালোচকেরা তুলে ধরছেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত যখন পাকিস্তানে এশিয়া কাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অংশ নেয় না, তখন সেই সিদ্ধান্ত সরকার ও বোর্ড নেয়—খেলোয়াড়দের ভোটাভুটির মাধ্যমে নয়। একইভাবে, ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অংশগ্রহণ না করা কিংবা ইতালির ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে না পারার ঘটনাও দেখানো হচ্ছে যে, একটি বড় টুর্নামেন্টে অনুপস্থিত থাকলেই কোনো দেশের খেলাধুলা ধ্বংস হয়ে যায় না।

নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। ভারতের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি সন্দেহে মারধরের ঘটনা, শিবসেনা নেতাদের প্রকাশ্য হুমকি এবং আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, যখন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, তখন পুরো জাতীয় দল, সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

এ অবস্থায় আইসিসির তথাকথিত স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকেরা বলছেন, যদি সত্যিই ঝুঁকি না থাকে, তবে মোস্তাফিজকে আইপিএল দল থেকে সরানোর প্রয়োজন কেন পড়ল—এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর কেউ দেয়নি।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হচ্ছে, তারা বিশ্বকাপ বর্জনের কথা বলেনি; বরং নিরাপত্তার স্বার্থে ভেন্যু শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। শ্রীলঙ্কা সহ-আয়োজক দেশ হওয়ায় এটিকে যুক্তিসংগত ও বাস্তবসম্মত দাবি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সমালোচকেরা আরও বলছেন, টিকিট বিক্রি, হোটেল বুকিং বা সম্প্রচার সূচির যুক্তি দেখিয়ে মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিকে পাশ কাটানো গ্রহণযোগ্য নয়। ক্রিকেট ইতিহাসে নিরাপত্তার কারণে শেষ মুহূর্তে ভেন্যু পরিবর্তনের বহু নজির রয়েছে—নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের পাকিস্তান সফর বাতিল তার উদাহরণ।

এই প্রেক্ষাপটে সৈয়দ আশরাফুল হকের বক্তব্যকে ‘দ্বিমুখী’ ও ‘বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন’ আখ্যা দিয়েছেন অনেকে। তাদের মতে, ক্রিকেট বোর্ড বা সরকারের প্রথম দায়িত্ব খেলোয়াড়দের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। খেলোয়াড়দের স্বপ্ন ও ক্যারিয়ারের চেয়ে জীবন ও আত্মসম্মানকে অগ্রাধিকার দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি ছিল বাংলাদেশের ন্যায্য ও মানবিক অবস্থান। এই অবস্থান থেকে সরে আসা মানে ভবিষ্যতে যেকোনো অপমান ও ঝুঁকি মেনে নেওয়ার নজির তৈরি করা। তারা বলেন, বাংলাদেশ এখন শুধু অংশগ্রহণের জন্য ক্রিকেট খেলে না, সম্মানের জন্য খেলে।

আইসিসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ক্ষেত্রে হাইব্রিড মডেল বা নিরপেক্ষ ভেন্যু ব্যবহৃত হলেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে একই নীতি প্রয়োগ করা হয়নি, যা সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ ভেন্যু ইস্যু এখন কেবল একটি ক্রীড়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা, আত্মসম্মান ও ন্যায্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই প্রশ্নে আপস করা মানে ভবিষ্যতের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

সর্বশেষ খবর পেতে অনুসরণ করুন- “প্রজন্ম কথা”