কানাডার চাকরির প্রলোভনে প্রতারণা, কীভাবে পাবেন বৈধ জব ভিসা? জেনে নিন পুরো প্রক্রিয়া
- প্রকাশঃ ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:০৩
- / 9
কানাডায় চাকরি ও ওয়ার্ক পারমিটের নামে প্রতারণার ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থানা এলাকা থেকে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের দুই সদস্য মারিফুল ইসলাম ও বাচ্চা বাউ ওরফে হাসিনুরকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা কানাডার ভুয়া ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা অনুমোদনপত্র এবং অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
পুলিশ তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন এবং জাল পাসপোর্ট উদ্ধার করেছে। এই ধরনের প্রতারণা থেকে মানুষকে সতর্ক করতে এবং কানাডার প্রকৃত ওয়ার্ক ভিসা পাওয়ার বৈধ প্রক্রিয়া তুলে ধরতেই এই বিশেষ প্রতিবেদন।
আবেদন করার আগে যে বিষয়গুলো জানা জরুরি
প্রথমত, বর্তমানে কানাডায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ বেকার। এর পাশাপাশি দেশটিতে লাখ লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা নিয়মিত চাকরির জন্য আবেদন করছেন। তারা স্থানীয় পরিবেশ, ভাষা এবং কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত। ফলে বিদেশ থেকে আবেদনকারীকে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, কানাডার কোনো নিয়োগকর্তা বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত আবেদন জমা পড়ে। তাই আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী কি না, তা আগে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, কানাডায় কাজের জন্য ইংরেজি অথবা ফরাসি ভাষায় দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল কথা বলতে পারলেই হয় না। ইংরেজির ক্ষেত্রে আইইএলটিএস এবং ফরাসির ক্ষেত্রে টিইইএফ (TEF) বা টিসিএফ (TCF) পরীক্ষায় ভালো ফল থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় ভাষাগত যোগ্যতা না থাকলে কানাডার জব ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
কানাডার ওয়ার্ক পারমিট কী?
কানাডার ওয়ার্ক পারমিট হলো বিদেশি নাগরিকদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশটিতে কাজ করার সরকারি অনুমতি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আগে একটি বৈধ চাকরির অফার থাকতে হয়।
অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাকে কানাডা সরকারের কাছে প্রমাণ করতে হয় যে সংশ্লিষ্ট পদে কোনো কানাডিয়ান নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা পাওয়া যায়নি। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় লেবার মার্কেট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (LMIA)। তবে আন্তর্জাতিক চুক্তি, বিশেষ কর্মসূচি বা নির্দিষ্ট কিছু পেশার ক্ষেত্রে এলএমআইএ ছাড়াও ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয়।
ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার ধাপগুলো
প্রথম ধাপে কানাডার কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রকৃত চাকরির অফার পেতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে নিয়োগকর্তা প্রয়োজন অনুযায়ী এলএমআইএর জন্য আবেদন করবেন এবং অনুমোদন নেবেন। তৃতীয় ধাপে আবেদনকারীকে চাকরির অফার, পাসপোর্ট, শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতার সনদ, ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণপত্র, প্রয়োজন হলে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে।
চতুর্থ ধাপে বায়োমেট্রিকস, নিরাপত্তা যাচাই এবং আবেদন মূল্যায়নের পর কানাডার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ভিসা বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়। পঞ্চম ধাপে ভিসা অনুমোদিত হলে কানাডায় পৌঁছানোর পর সীমান্ত কর্মকর্তার চূড়ান্ত অনুমোদনের ভিত্তিতে ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু করা হয়।
কফিল প্রথার মতো ব্যবস্থা নেই
কানাডায় সৌদি আরবের কফিল ব্যবস্থার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো ব্যক্তি বা নিয়োগকর্তা ভিসা “দিয়ে” দিতে পারেন না। কানাডার ভিসা প্রদান করে কেবল ফেডারেল সরকার। এমনকি প্রাদেশিক সরকারেরও ভিসা দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
যেসব ভুল ধারণা সবচেয়ে বেশি ছড়ানো হয়
প্রতারকরা সাধারণত দাবি করে, “১০০ শতাংশ গ্যারান্টি ভিসা”, “ইন্টারভিউ ছাড়াই চাকরি”, “দুই-তিন মাসে পিআর”, “কোনো যোগ্যতা ছাড়াই উচ্চ বেতনের চাকরি”, “সরকারি বিশেষ কোটা”, “ভাষা জানা প্রয়োজন নেই” কিংবা “কানাডায় কাজের কোনো অভাব নেই”।
বাস্তবে কানাডা সরকার বা দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ কাউকেই আগাম ভিসার নিশ্চয়তা দেয় না। প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে যাচাই করা হয়। কোনো ব্যক্তি, এজেন্সি বা প্রতিনিধি ভিসা অনুমোদনের গ্যারান্টি দিতে পারে না।
প্রতারকরা যেভাবে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে
সাম্প্রতিক ঘটনাসহ অতীতের বিভিন্ন প্রতারণার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতারকরা নামী প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির অফার লেটার তৈরি করে। তারা জাল এলএমআইএ, জাল ওয়ার্ক পারমিট ও ভুয়া ভিসা অনুমোদনপত্র দেখায়। সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডায় থাকা ব্যক্তিদের ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করে।
অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে অগ্রিম টাকা দাবি করা হয়। আবার কানাডার +১ কান্ট্রি কোড ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমোতে ফোন দেওয়া হলেও সেটি কানাডা থেকেই করা হচ্ছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে অনলাইনে এই নম্বর ব্যবহার করা সম্ভব।
কীভাবে যাচাই করবেন?
কানাডায় চাকরির প্রস্তাব পেলে প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে রয়েছে কি না। প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, ফোন নম্বর এবং ওয়েবসাইট যাচাই করা প্রয়োজন। চাকরির অফার লেটারে বেতন, কর্মস্থল, দায়িত্ব এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবসম্মত কি না, তা ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
ই-মেইলটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ডোমেইন থেকে এসেছে, নাকি সাধারণ ফ্রি ই-মেইল ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও যাচাই করা জরুরি। কোনো ওয়েবসাইটে ভিসা যাচাই করতে বলা হলে সেটি সরকারি ওয়েবসাইট কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।
অর্থ লেনদেনের আগে সতর্কতা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানো উচিত নয়। সব ধরনের অর্থ লেনদেনের রসিদ সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো নথিতে স্বাক্ষর করার আগে তা ভালোভাবে পড়ে বুঝে নেওয়া জরুরি। সন্দেহ হলে কানাডার অনুমোদিত ইমিগ্রেশন পরামর্শক বা আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
ওয়ার্ক পারমিট মানেই স্থায়ী বসবাস নয়
ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া মানেই কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা (পিআর) হয়ে যাওয়া নয়। এটি একটি অস্থায়ী কাজের অনুমতি। পরে কাজের অভিজ্ঞতা, ভাষাগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং প্রচলিত অভিবাসন কর্মসূচির শর্ত পূরণ করলে কেউ স্থায়ী বাসিন্দার জন্য আবেদন করতে পারেন। তাই “ওয়ার্ক পারমিট মানেই নিশ্চিত পিআর” এমন প্রচারণা বিভ্রান্তিকর।
সতর্ক থাকার আহ্বান
কানাডায় উন্নত জীবনের স্বপ্ন অনেকেরই রয়েছে। তবে সেই স্বপ্ন যেন প্রতারণার ফাঁদে না পড়ে, সে জন্য আবেদনকারীদের সঠিক তথ্য যাচাই, বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং ধৈর্যের সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কানাডায় চাকরি বা ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্টকাট কোনো পথ নেই। বৈধ নথি, যোগ্যতা এবং সরকারি নিয়ম মেনেই আবেদন করাই নিরাপদ উপায়।
























