নিউ জার্সির প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটিতে বাড়ছে বাংলাদেশিদের প্রভাব
- প্রকাশঃ ০২ নভেম্বর ২০২৬, ২২:১০
- / 1
নিউ জার্সি, ৩ নভেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটিতে বাংলাদেশিদের বসতি, ব্যবসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়ছে। স্থানীয় অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও নগর রাজনীতিতেও তাঁদের অংশগ্রহণ ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে।
প্যাটারসনের ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের একটি অংশের নাম ‘বাংলাদেশ বুলেভার্ড’ হওয়া থেকে শুরু করে আটলান্টিক সিটিতে মসজিদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম, দুই শহরেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্থায়ী অবস্থান তৈরির চিত্র দেখা যাচ্ছে।
প্যাটারসন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। শহরটির ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের দুই পাশে বাংলাদেশি দোকান, খাবারের প্রতিষ্ঠান, পোশাকের ব্যবসা, মসজিদ এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের উপস্থিতি এলাকাটিকে প্রবাসীদের কাছে পরিচিত বাংলাদেশি জনপদে পরিণত করেছে। অনেকে এলাকাটিকে ‘নতুন লিটল বাংলাদেশ’ বলেও উল্লেখ করেন। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি উপাধি নয়; বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকার পরিচিতি বোঝাতে ব্যবহৃত একটি প্রচলিত বর্ণনা।
প্যাটারসনে বাংলাদেশিদের বসতি গড়ে ওঠার ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। আশির দশক থেকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের আগমন বাড়তে থাকে। কাজ, বাসস্থান ও উন্নত জীবনের সন্ধানে আসা এসব মানুষের অনেকেই পরে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের যুক্তরাষ্ট্রে আসতে সহায়তা করেন। এভাবে গড়ে ওঠে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। একসময় যাঁরা নতুন পরিবেশে নিজেদের জায়গা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম এখন শহরের ব্যবসা, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্যাটারসনের বাংলাদেশি কমিউনিটির আকার প্রায় ১৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারির তথ্যের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশি জনসংখ্যার দিক থেকে নিউইয়র্ক শহরের পর প্যাটারসন অন্যতম বড় কেন্দ্র। ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের অনেক দোকান, খাবারের প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও ওষুধের দোকানে বাংলায় কথা বলার সুযোগ রয়েছে। নতুন অভিবাসীদের জন্য পরিচিত ভাষা ও সংস্কৃতির এই পরিবেশ মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে।
শহরটির বাংলাদেশি পরিচিতি আরও দৃশ্যমান হয় ২০১৯ সালের জুনে। সে সময় প্যাটারসন পৌর কর্তৃপক্ষ ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের শেরিডান অ্যাভিনিউ থেকে ওয়েন অ্যাভিনিউ পর্যন্ত প্রায় দুই ব্লকের একটি অংশের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ বুলেভার্ড’ করে। বাংলাদেশি কমিউনিটির দীর্ঘদিনের অবদান ও সাংস্কৃতিক পরিচিতির স্বীকৃতি হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নামকরণ উপলক্ষে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
পারিবারিক ব্যবসা প্যাটারসনের বাংলাদেশি কমিউনিটির অর্থনৈতিক বিকাশের অন্যতম ভিত্তি। অনেক পরিবার ছোট দোকান, মুদি ব্যবসা, খাবারের প্রতিষ্ঠান, পোশাকের দোকান ও অন্যান্য সেবামূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পরিবারের একাধিক সদস্য কাজ করেন। কোথাও বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানেরা ব্যবসা পরিচালনায় যুক্ত হচ্ছেন, কোথাও দ্বিতীয় প্রজন্ম নতুন ধারণা ও উদ্যোগ নিয়ে পারিবারিক ব্যবসাকে এগিয়ে নিচ্ছে।
ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের আশপাশে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় পণ্যের দোকানগুলোতে চাল, ডাল, মাছ, মাংস, মসলা, শাকসবজি, দেশীয় খাবার এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়। বাংলা টাউন সুপারমার্কেট এ ধরনের ব্যবসার একটি পরিচিত উদাহরণ।
এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় আরও দক্ষিণ এশীয় মুদি দোকান ও খাবারের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব ব্যবসা নতুন অভিবাসীদের পরিচিত পণ্য পাওয়ার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে।
প্যাটারসনের বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসও রয়েছে। ২০১২ সালে মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান শহরটির দ্বিতীয় ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাঁকে উত্তর নিউ জার্সিতে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে শাহিন খালিকও দ্বিতীয় ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে।
২০২৬ সালের ১২ মে প্যাটারসনের মেয়র নির্বাচনেও সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ১ হাজার ৯৫৪ ভোট পান। অন্যদিকে মেয়র আন্দ্রে সায়েগ তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন। একই নির্বাচনে কাউন্সিলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের জন্য বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
তিনি ৩ হাজার ৬০৮ ভোট পেলেও শীর্ষ তিনজনের মধ্যে থাকতে পারেননি। এসব ফল থেকে বোঝা যায়, স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়লেও নির্বাচিত পদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে তাঁদের সামনে প্রতিযোগিতা রয়েছে।
প্যাটারসনের মতো আটলান্টিক সিটিতেও বাংলাদেশি কমিউনিটির বিকাশের পেছনে রয়েছে অভিবাসন, পারিবারিক যোগাযোগ এবং সামাজিক সংগঠনের ভূমিকা। শহরটি পর্যটন, সমুদ্রসৈকত ও বিনোদনকেন্দ্রিক অর্থনীতির জন্য পরিচিত হলেও সেখানে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর একটি স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাংলাদেশি সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটলান্টিক কাউন্টিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রায় ১২ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে আটলান্টিক সিটিতেই প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস বলে ২০২২ সালে স্টকটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
সংখ্যাগুলো স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধির দেওয়া হিসাব ও আগের গবেষণার তথ্য; নতুন আদমশুমারির চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়। আটলান্টিক সিটিতে বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি পরিচিত ক্ষেত্র মুদি দোকান ও খাবারের ব্যবসা।
দেশীয় চাল, ডাল, মসলা, মাছ, হালাল মাংস, শাকসবজি এবং দক্ষিণ এশীয় খাবারের চাহিদা পূরণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। আটলান্টিক অ্যাভিনিউয়ের দেশি বাজার ও পণ্য বিক্রির দোকানগুলো স্থানীয় বাংলাদেশি এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় পরিবারের কাছে পরিচিত। এর মধ্যে দেশি বাজার অ্যান্ড প্রডিউস একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান।
এখানে দক্ষিণ এশীয় খাদ্যপণ্য, মাছ, মাংস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়। এসব ব্যবসা পণ্য কেনাবেচার পাশাপাশি কমিউনিটির মানুষের যোগাযোগের জায়গা হিসেবেও কাজ করে। নতুন কোনো বাংলাদেশি পরিবার আটলান্টিক সিটিতে এলে কোথায় দেশীয় খাবার পাওয়া যাবে, কোথায় প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হবে কিংবা পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে, সে বিষয়ে এসব প্রতিষ্ঠান সহায়তা করতে পারে।
আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশি সমাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আল-হেরা মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদে নামাজ, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আল-হেরা মসজিদের নিজস্ব পরিচিতি অনুযায়ী, এটি স্থানীয় বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার নামাজ, শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা এবং কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
রমজান মাসে ইফতার, দান কার্যক্রম এবং অন্যান্য সামাজিক আয়োজনের মধ্য দিয়েও এসব প্রতিষ্ঠান মানুষের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করে। ২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল আল-হেরা মসজিদে দক্ষিণ জার্সির জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে বড় ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
আয়োজকদের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৭০০ মানুষ অংশ নেন। এ ধরনের আয়োজন দেখায়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উপাসনার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।
তবে আটলান্টিক সিটিতে মসজিদের মোট সংখ্যা কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কতটি নতুন মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ধারাবাহিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে মসজিদের বিস্তার বা বৃদ্ধির হার দাবি করার সুযোগ নেই। তবে শহরটিতে বাংলাদেশি মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের উপস্থিতি স্পষ্ট।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ জার্সির ভূমিকা রয়েছে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটির লক্ষ্য বাংলাদেশি ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখা এবং প্রবাসীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো। সংগঠনটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পিঠা উৎসব, ঈদবাজার, পারিবারিক আয়োজন, খাদ্য বিতরণ এবং নতুন প্রজন্মের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল আটলান্টিক সিটিতে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সংগঠনটির আয়োজনে বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গান, কবিতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, দেশীয় খাবার এবং বিভিন্ন পণ্যের দোকান ছিল। স্থানীয় বাংলাদেশিদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার প্রবাসীরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
একই বছরের ১২ আগস্ট আটলান্টিক সিটির স্যান্ডক্যাসল স্টেডিয়ামে সংগঠনটির উদ্যোগে সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শিল্পীদের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের শিল্পীরাও অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, মেধাবীদের সম্মাননা, দেশীয় খাবার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল আয়োজনের উল্লেখযোগ্য অংশ। অনুষ্ঠানে আটলান্টিক সিটির মেয়র, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি পরিবারগুলো নিজেদের সংস্কৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া অনেক শিশু-কিশোর বাংলা ভাষা, গান, খাবার ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছেও বাংলাদেশি সংস্কৃতি পরিচিত হচ্ছে।
প্রবাসীদের নাগরিক ও প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশি সংগঠনগুলো ভূমিকা রাখছে। ২০২২ সালে স্টকটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আটলান্টিক সিটি ক্যাম্পাসে বাংলাদেশের নিউইয়র্ক কনস্যুলেটের প্রতিনিধিরা স্থানীয় বাংলাদেশিদের জন্য পাসপোর্ট ও ভিসাসংক্রান্ত সেবা দিতে এসেছিলেন। স্থানীয় সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত ওই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজের জন্য প্রবাসীদের নিউইয়র্ক পর্যন্ত যাতায়াতের ঝামেলা কমানো।
এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১০ নভেম্বর আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশ কমিউনিটি সেন্টারে এক দিনের ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ১ নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ জার্সি, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনস্যুলেট এবং আটলান্টিক সিটির বহুসাংস্কৃতিক সেবা বিভাগের সহযোগিতায় এ কর্মসূচি হওয়ার কথা। সেখানে ই-পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, দ্বৈত নাগরিকত্ব, অনাপত্তিপত্র এবং বিভিন্ন নথি সত্যায়নের মতো সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় রাজনীতিতেও আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেয়র, কাউন্সিলর, রাজ্য আইনপ্রণেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কমিউনিটির সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশি সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা স্থানীয় সভা ও নাগরিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। এর ফলে শিক্ষা, ব্যবসা, নাগরিক সেবা ও সামাজিক সমস্যাগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও দুটি শহরের বাংলাদেশি কমিউনিটির বিকাশে কয়েকটি অভিন্ন বিষয় রয়েছে। পারিবারিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে নতুন অভিবাসীদের বসতি গড়ে উঠছে। ছোট ব্যবসা ও পারিবারিক উদ্যোগ অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করছে। মসজিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও তরুণেরা স্থানীয় সমাজে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।
কোনো অভিবাসী জনগোষ্ঠীর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। ব্যবসার মালিকানা, শিক্ষায় সাফল্য, স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নাগরিক সংগঠনে নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটিতে বাংলাদেশিদের কার্যক্রমে এসব পরিবর্তনের উদাহরণ দেখা যাচ্ছে।
তবে এই দুই শহরে বাংলাদেশি ব্যবসার সংখ্যা কত বেড়েছে, কতটি নতুন পারিবারিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে কিংবা গত পাঁচ বছরে কতটি নতুন মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে ব্যবসা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধির হার দাবি করা ঠিক হবে না। একইভাবে দুই শহরের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন নয়। তবে স্থানীয় ব্যবসা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, সংগঠনের কার্যক্রম এবং জনসংখ্যাসংক্রান্ত তথ্য থেকে কমিউনিটির বিস্তারের চিত্র পাওয়া যায়।
প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটি এখন নিউ জার্সিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি কেন্দ্র। প্যাটারসনে বাংলাদেশ বুলেভার্ড, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক উপস্থিতি এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ একটি প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি জনপদের পরিচয় তুলে ধরছে। অন্যদিকে আটলান্টিক সিটিতে পারিবারিক ব্যবসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রশাসনিক যোগাযোগের মাধ্যমে কমিউনিটি আরও সংগঠিত হচ্ছে।
একসময় উন্নত জীবনের সন্ধানে বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অনেক অভিবাসীর সন্তান এখন দেশটির স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। কেউ পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা করছে, কেউ পেশাজীবী হিসেবে কাজ করছে, আবার কেউ স্থানীয় রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশিদের পরিচিতি এখন শুধু অভিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতিতেও তাঁদের অবস্থান তৈরি হচ্ছে।
এই অগ্রগতি ধরে রাখতে শিক্ষা, তরুণ নেতৃত্ব, ভোটার নিবন্ধন, নাগরিক অধিকার এবং স্থানীয় নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক ও নাগরিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।


















