ঢাকা ১০:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতীয় আম আমদানিতে জাপানের নিষেধাজ্ঞা, বড় লোকসানের শঙ্কায় চাষি ও রপ্তানিকারকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশঃ ০৭:২৬:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬
  • / 4

ভারতের ফল শোধন প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোতে রোগবালাই দমন ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ধরা পড়ায় ভারতীয় আম আমদানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জাপান। চলতি বছরের শুরুতে জাপানের কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে এসব অনিয়ম ধরা পড়ে বলে জানা গেছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে গ্রীষ্মকালীন আম মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভারতের আম রপ্তানি কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে আলফনসো, কেসর, ল্যাংড়া ও ভাঙ্গানাপল্লীর মতো প্রিমিয়াম জাতের আমের চাষি ও রপ্তানিকারকেরা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন।

প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম ভারতীয় আমের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল জাপান। এর আগে ফ্রুট ফ্লাই সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে ভারতীয় আম আমদানি বন্ধ করেছিল টোকিও। পরে ভারতের শোধন প্রক্রিয়া জোরদার হওয়ার পর ২০০৬ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

সাম্প্রতিক পরিদর্শনে জাপানি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় আমের চালান তাদের নির্ধারিত উদ্ভিদ স্বাস্থ্য মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্থানীয় কৃষি সুরক্ষায় জাপান ক্ষতিকর পোকামাকড় ও মাছির বিরুদ্ধে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে থাকে।

প্রতি বছর আম রপ্তানি মৌসুম শুরুর আগে জাপানের কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তারা ভারতে অবস্থিত ‘ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট’ বা ভিএইচটি কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন। এসব কেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিত গরম ও আর্দ্র বাতাস ব্যবহার করে আমকে পোকামাকড় ও জীবাণুমুক্ত করা হয়। দুই দেশের রপ্তানি চুক্তি অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক।

চলতি বছরের মার্চে ভারতের উত্তর প্রদেশের রহমানপুরে অবস্থিত একটি ভিএইচটি কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় জাপানি কর্মকর্তারা রোগবালাই দমন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যদিও ঠিক কী ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ভারত বা জাপান সরকার।

পরিদর্শনের পর জাপানের ইয়োকোহামা প্ল্যান্ট প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা দেয়, ২৬ মার্চের পর ইস্যুকৃত স্বাস্থ্য সনদধারী ভারতীয় আমের কোনো চালান আর গ্রহণ করা হবে না।

পরিমাণের দিক থেকে জাপান ভারতের সবচেয়ে বড় আমের বাজার না হলেও, দেশটিতে উচ্চমূল্যে প্রিমিয়াম আম বিক্রি হওয়ায় রপ্তানিকারকদের জন্য এটি লাভজনক বাজার হিসেবে পরিচিত। ভারত বছরে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টন আম উৎপাদন করে বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদক দেশ হলেও রপ্তানির বড় অংশ আসে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজার থেকে।

রপ্তানিকারকেরা আশঙ্কা করছেন, এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব অন্য আমদানিকারক দেশগুলোর নীতিতেও পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে জলবায়ুগত কারণে চলতি বছর ভারতের আমচাষিরা আগেই সংকটে পড়েছিলেন। এল নিনো প্রভাবজনিত তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে আমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত কয়েকটি জরিপ অনুযায়ী, কিছু এলাকায় আলফনসো আমের ফলন ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে জাপানের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় মৌসুমের সবচেয়ে লাভজনক সময়ে চাষিদের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শেয়ার করুন

ভারতীয় আম আমদানিতে জাপানের নিষেধাজ্ঞা, বড় লোকসানের শঙ্কায় চাষি ও রপ্তানিকারকরা

প্রকাশঃ ০৭:২৬:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

ভারতের ফল শোধন প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোতে রোগবালাই দমন ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ধরা পড়ায় ভারতীয় আম আমদানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জাপান। চলতি বছরের শুরুতে জাপানের কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে এসব অনিয়ম ধরা পড়ে বলে জানা গেছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে গ্রীষ্মকালীন আম মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভারতের আম রপ্তানি কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে আলফনসো, কেসর, ল্যাংড়া ও ভাঙ্গানাপল্লীর মতো প্রিমিয়াম জাতের আমের চাষি ও রপ্তানিকারকেরা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন।

প্রায় দুই দশকের মধ্যে এই প্রথম ভারতীয় আমের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল জাপান। এর আগে ফ্রুট ফ্লাই সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে ভারতীয় আম আমদানি বন্ধ করেছিল টোকিও। পরে ভারতের শোধন প্রক্রিয়া জোরদার হওয়ার পর ২০০৬ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

সাম্প্রতিক পরিদর্শনে জাপানি কর্তৃপক্ষ ভারতীয় আমের চালান তাদের নির্ধারিত উদ্ভিদ স্বাস্থ্য মানদণ্ড পূরণ করছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্থানীয় কৃষি সুরক্ষায় জাপান ক্ষতিকর পোকামাকড় ও মাছির বিরুদ্ধে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে থাকে।

প্রতি বছর আম রপ্তানি মৌসুম শুরুর আগে জাপানের কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তারা ভারতে অবস্থিত ‘ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট’ বা ভিএইচটি কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেন। এসব কেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিত গরম ও আর্দ্র বাতাস ব্যবহার করে আমকে পোকামাকড় ও জীবাণুমুক্ত করা হয়। দুই দেশের রপ্তানি চুক্তি অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক।

চলতি বছরের মার্চে ভারতের উত্তর প্রদেশের রহমানপুরে অবস্থিত একটি ভিএইচটি কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় জাপানি কর্মকর্তারা রোগবালাই দমন প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যদিও ঠিক কী ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ভারত বা জাপান সরকার।

পরিদর্শনের পর জাপানের ইয়োকোহামা প্ল্যান্ট প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা দেয়, ২৬ মার্চের পর ইস্যুকৃত স্বাস্থ্য সনদধারী ভারতীয় আমের কোনো চালান আর গ্রহণ করা হবে না।

পরিমাণের দিক থেকে জাপান ভারতের সবচেয়ে বড় আমের বাজার না হলেও, দেশটিতে উচ্চমূল্যে প্রিমিয়াম আম বিক্রি হওয়ায় রপ্তানিকারকদের জন্য এটি লাভজনক বাজার হিসেবে পরিচিত। ভারত বছরে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টন আম উৎপাদন করে বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদক দেশ হলেও রপ্তানির বড় অংশ আসে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজার থেকে।

রপ্তানিকারকেরা আশঙ্কা করছেন, এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের কৃষিপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব অন্য আমদানিকারক দেশগুলোর নীতিতেও পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে জলবায়ুগত কারণে চলতি বছর ভারতের আমচাষিরা আগেই সংকটে পড়েছিলেন। এল নিনো প্রভাবজনিত তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে আমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত কয়েকটি জরিপ অনুযায়ী, কিছু এলাকায় আলফনসো আমের ফলন ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে জাপানের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় মৌসুমের সবচেয়ে লাভজনক সময়ে চাষিদের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।