ঢাকা ০৫:৪৮ , Sun, ০৫ Jul ২০২৬
বিশ্বসমাচার
আমেরিকা

সুদ ছাড়াই কি আমেরিকায় বাড়ি কেনা সম্ভব?

বিশেষ প্রতিবেদন
  • প্রকাশঃ ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৫২
  • / 8
যুক্তরাষ্ট্রে সুদমুক্ত বা শরিয়াহসম্মত হোম ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বাড়ি কেনার প্রতি মুসলিম পরিবারগুলোর আগ্রহ বাড়ছে গ্রাফিক্স: প্রজন্ম কথা

অনেকের কাছে প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির নয়, বিশ্বাসেরও। যুক্তরাষ্ট্রে নিজের একটি বাড়ি কেনার স্বপ্ন বহু মুসলিম পরিবারের জন্য যেমন বাস্তব প্রয়োজন, তেমনি সেই স্বপ্ন পূরণে সুদভিত্তিক মর্টগেজ এড়িয়ে চলার ইচ্ছাও তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর ঠিক সেখানেই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ইসলামিক বা শরিয়াহসম্মত হোম ফাইন্যান্সিং।

ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে যারা প্রচলিত সুদভিত্তিক মর্টগেজ নিতে চান না, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে উঠেছে এক বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা। এখানে সুদের বদলে ব্যবহার করা হয় সম্পদভিত্তিক লেনদেন, ভাড়াভিত্তিক কাঠামো এবং অংশীদারিত্বের মডেল। ইসলামিক অর্থনীতির মূল নীতিই হলো রিবা বা সুদ পরিহার, চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং লাভ-ঝুঁকির ন্যায্য বণ্টন বজায় রাখা। এই নীতির ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিংয়ের কয়েকটি বহুল আলোচিত মডেল।

এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ কাঠামো হিসেবে পরিচিত মুরাবাহা। এই ব্যবস্থায় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান প্রথমে গ্রাহকের পছন্দের বাড়িটি কিনে নেয়। এরপর মূল মূল্য ও পূর্বনির্ধারিত লাভ যোগ করে সেটি গ্রাহকের কাছে কিস্তিতে বিক্রি করে। অর্থাৎ শুরুতেই মোট মূল্য ঠিক হয়ে যায়। ফলে মাসিক পরিশোধে অনিশ্চয়তা থাকে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৪ লাখ ডলারের একটি বাড়ি প্রতিষ্ঠান কিনে নির্ধারিত লাভ যোগ করে ৫ লাখ ডলারে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পারে, যা গ্রাহক দীর্ঘমেয়াদে কিস্তিতে পরিশোধ করেন। এই মডেলের সুবিধা হলো মোট দায় কত, তা শুরুতেই স্পষ্ট থাকে। তবে সমালোচকেরা বলেন, বাস্তব প্রয়োগে এটি অনেক সময় প্রচলিত ঋণ কাঠামোর সঙ্গে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় মডেল ইজারা। আরবি এই শব্দের অর্থ ভাড়া। এ ব্যবস্থায় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বাড়িটির মালিক থাকে এবং গ্রাহক সেটি ব্যবহার করেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। গ্রাহক মাসে মাসে ভাড়া পরিশোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে এই ভাড়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে বাড়ির মালিকানাও অর্জন করেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে পুরো মালিকানা তার হাতে চলে আসে। ইসলামিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে ঋণের বদলে সম্পদ ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ প্রদান করা হয়, যা শরিয়াহর নীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে মালিকানা হস্তান্তরের ধরন, রক্ষণাবেক্ষণের দায় এবং চুক্তির সূক্ষ্ম শর্ত প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হতে পারে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত মডেল ডিমিনিশিং মুশারাকা বা হ্রাসমান অংশীদারিত্ব। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য শরিয়াহভিত্তিক মডেল বলে মনে করেন। এই ব্যবস্থায় গ্রাহক এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বাড়ির মালিক হন। ধরা যাক, ৫ লাখ ডলারের একটি বাড়ির জন্য গ্রাহক ২৫ হাজার ডলার ডাউন পেমেন্ট দিলেন। সে ক্ষেত্রে তিনি শুরুতেই বাড়ির ৫ শতাংশ মালিক হবেন, আর বাকি ৯৫ শতাংশ মালিকানা থাকবে প্রতিষ্ঠানের হাতে। এরপর প্রতি মাসে গ্রাহক দুটি অংশে অর্থ পরিশোধ করবেন। একটি অংশ হবে প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন অংশ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, আর অন্য অংশ হবে সেই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধীরে ধীরে কিনে নেওয়ার অর্থ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অংশ কমতে থাকবে, আর গ্রাহকের মালিকানা বাড়তে থাকবে। শেষ পর্যন্ত পুরো বাড়ির মালিকানা চলে যাবে গ্রাহকের হাতে।

এই মডেলের বড় সুবিধা হলো, এখানে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার সম্পর্কের বদলে অংশীদারিত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। গ্রাহকের মালিকানা যত বাড়ে, প্রতিষ্ঠানের অংশের জন্য যে ভাড়া দিতে হয়, সেটিও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে কাঠামোগতভাবে এটি অনেকের কাছে প্রচলিত মর্টগেজের তুলনায় আলাদা ও বেশি স্বচ্ছ মনে হয়।

প্রচলিত মর্টগেজ ও ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিংয়ের পার্থক্য এখানেই। প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যাংক গ্রাহককে ঋণ দেয়, আর গ্রাহক সুদসহ সেই ঋণ পরিশোধ করেন। অন্যদিকে ইসলামিক ফাইন্যান্সিংয়ে সাধারণত সরাসরি ঋণ দেওয়া হয় না। প্রতিষ্ঠান হয় সম্পদ কিনে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে, নয়তো ভাড়াভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করে, অথবা অংশীদারিত্বে বাড়ি কেনে। অর্থাৎ পার্থক্য শুধু সুদের উপস্থিতিতে নয়, চুক্তির কাঠামো, মালিকানা এবং ঝুঁকি বণ্টনের পদ্ধতিতেও।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গাইডেন্স রেসিডেনশিয়াল, ইউআইএফ করপোরেশন, ইজারা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন, ডেভন ব্যাংক ইসলামিক ফাইন্যান্সিং এবং ল্যারিবা। বাজারে বিশেষভাবে পরিচিত ইউআইএফ করপোরেশন তাদের অংশীদারিত্বভিত্তিক মুশারাকা মডেলে হোম ফাইন্যান্সিং দিচ্ছে এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সেবা সম্প্রসারণ করেছে। অন্যদিকে ডেভন ব্যাংক মুরাবাহাভিত্তিক ইসলামিক ফাইন্যান্সিং অফার করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে, তাদের আর্থিক পণ্য শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। UIF Corporation, Devon Bank Faith-Based Financing

তবে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং নিয়ে সব আলেম, গবেষক ও অর্থনীতিবিদের মধ্যে একক মত নেই। কেউ এটিকে সুদভিত্তিক মর্টগেজের কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কিছু মডেলের বাস্তব প্রয়োগ, ঝুঁকি বণ্টন এবং চুক্তির ভাষা নিয়ে আরও গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বিশেষ করে সমালোচকদের একটি অংশের প্রশ্ন, কিছু মডেল নাম ও কাঠামোয় আলাদা হলেও অর্থনৈতিক ফলাফল কতটা ভিন্ন, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি।

সেই কারণেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোনো ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আগে শুধু “হালাল” বা “শরিয়াহসম্মত” শব্দ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বরং প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা, ফি, ডাউন পেমেন্ট, মালিকানা হস্তান্তরের পদ্ধতি, আগাম পরিশোধের শর্ত, অতিরিক্ত চার্জ এবং শরিয়াহ বোর্ডের কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে নিজস্ব আলেম, ইসলামিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ এবং রিয়েল এস্টেট আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক আর্থিক সেবার চাহিদা, আর্থিক সচেতনতা এবং বিকল্প ফাইন্যান্সিং খোঁজার প্রবণতা বাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং খাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে একসময় যে প্রশ্ন ছিল “সুদ ছাড়া আমেরিকায় বাড়ি কেনা আদৌ সম্ভব কি না”, এখন সেই প্রশ্নের উত্তরে সামনে আসছে একাধিক পথ। তবে কোন পথটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, নিরাপদ এবং বাস্তবে উপযোগী, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বুঝে, যাচাই করে এবং দীর্ঘমেয়াদি হিসাব মাথায় রেখে।

❤️
👏
🙂
😞

সুদ ছাড়াই কি আমেরিকায় বাড়ি কেনা সম্ভব?

প্রকাশঃ ০৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৫২

অনেকের কাছে প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির নয়, বিশ্বাসেরও। যুক্তরাষ্ট্রে নিজের একটি বাড়ি কেনার স্বপ্ন বহু মুসলিম পরিবারের জন্য যেমন বাস্তব প্রয়োজন, তেমনি সেই স্বপ্ন পূরণে সুদভিত্তিক মর্টগেজ এড়িয়ে চলার ইচ্ছাও তাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর ঠিক সেখানেই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ইসলামিক বা শরিয়াহসম্মত হোম ফাইন্যান্সিং।

ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে যারা প্রচলিত সুদভিত্তিক মর্টগেজ নিতে চান না, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে উঠেছে এক বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা। এখানে সুদের বদলে ব্যবহার করা হয় সম্পদভিত্তিক লেনদেন, ভাড়াভিত্তিক কাঠামো এবং অংশীদারিত্বের মডেল। ইসলামিক অর্থনীতির মূল নীতিই হলো রিবা বা সুদ পরিহার, চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং লাভ-ঝুঁকির ন্যায্য বণ্টন বজায় রাখা। এই নীতির ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিংয়ের কয়েকটি বহুল আলোচিত মডেল।

এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ কাঠামো হিসেবে পরিচিত মুরাবাহা। এই ব্যবস্থায় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান প্রথমে গ্রাহকের পছন্দের বাড়িটি কিনে নেয়। এরপর মূল মূল্য ও পূর্বনির্ধারিত লাভ যোগ করে সেটি গ্রাহকের কাছে কিস্তিতে বিক্রি করে। অর্থাৎ শুরুতেই মোট মূল্য ঠিক হয়ে যায়। ফলে মাসিক পরিশোধে অনিশ্চয়তা থাকে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৪ লাখ ডলারের একটি বাড়ি প্রতিষ্ঠান কিনে নির্ধারিত লাভ যোগ করে ৫ লাখ ডলারে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পারে, যা গ্রাহক দীর্ঘমেয়াদে কিস্তিতে পরিশোধ করেন। এই মডেলের সুবিধা হলো মোট দায় কত, তা শুরুতেই স্পষ্ট থাকে। তবে সমালোচকেরা বলেন, বাস্তব প্রয়োগে এটি অনেক সময় প্রচলিত ঋণ কাঠামোর সঙ্গে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় মডেল ইজারা। আরবি এই শব্দের অর্থ ভাড়া। এ ব্যবস্থায় অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বাড়িটির মালিক থাকে এবং গ্রাহক সেটি ব্যবহার করেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। গ্রাহক মাসে মাসে ভাড়া পরিশোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে এই ভাড়ার পাশাপাশি ধীরে ধীরে বাড়ির মালিকানাও অর্জন করেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে পুরো মালিকানা তার হাতে চলে আসে। ইসলামিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে ঋণের বদলে সম্পদ ব্যবহারের বিনিময়ে অর্থ প্রদান করা হয়, যা শরিয়াহর নীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে মালিকানা হস্তান্তরের ধরন, রক্ষণাবেক্ষণের দায় এবং চুক্তির সূক্ষ্ম শর্ত প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হতে পারে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত মডেল ডিমিনিশিং মুশারাকা বা হ্রাসমান অংশীদারিত্ব। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য শরিয়াহভিত্তিক মডেল বলে মনে করেন। এই ব্যবস্থায় গ্রাহক এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বাড়ির মালিক হন। ধরা যাক, ৫ লাখ ডলারের একটি বাড়ির জন্য গ্রাহক ২৫ হাজার ডলার ডাউন পেমেন্ট দিলেন। সে ক্ষেত্রে তিনি শুরুতেই বাড়ির ৫ শতাংশ মালিক হবেন, আর বাকি ৯৫ শতাংশ মালিকানা থাকবে প্রতিষ্ঠানের হাতে। এরপর প্রতি মাসে গ্রাহক দুটি অংশে অর্থ পরিশোধ করবেন। একটি অংশ হবে প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন অংশ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, আর অন্য অংশ হবে সেই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধীরে ধীরে কিনে নেওয়ার অর্থ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অংশ কমতে থাকবে, আর গ্রাহকের মালিকানা বাড়তে থাকবে। শেষ পর্যন্ত পুরো বাড়ির মালিকানা চলে যাবে গ্রাহকের হাতে।

এই মডেলের বড় সুবিধা হলো, এখানে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার সম্পর্কের বদলে অংশীদারিত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়। গ্রাহকের মালিকানা যত বাড়ে, প্রতিষ্ঠানের অংশের জন্য যে ভাড়া দিতে হয়, সেটিও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে কাঠামোগতভাবে এটি অনেকের কাছে প্রচলিত মর্টগেজের তুলনায় আলাদা ও বেশি স্বচ্ছ মনে হয়।

প্রচলিত মর্টগেজ ও ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিংয়ের পার্থক্য এখানেই। প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যাংক গ্রাহককে ঋণ দেয়, আর গ্রাহক সুদসহ সেই ঋণ পরিশোধ করেন। অন্যদিকে ইসলামিক ফাইন্যান্সিংয়ে সাধারণত সরাসরি ঋণ দেওয়া হয় না। প্রতিষ্ঠান হয় সম্পদ কিনে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে, নয়তো ভাড়াভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করে, অথবা অংশীদারিত্বে বাড়ি কেনে। অর্থাৎ পার্থক্য শুধু সুদের উপস্থিতিতে নয়, চুক্তির কাঠামো, মালিকানা এবং ঝুঁকি বণ্টনের পদ্ধতিতেও।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে গাইডেন্স রেসিডেনশিয়াল, ইউআইএফ করপোরেশন, ইজারা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন, ডেভন ব্যাংক ইসলামিক ফাইন্যান্সিং এবং ল্যারিবা। বাজারে বিশেষভাবে পরিচিত ইউআইএফ করপোরেশন তাদের অংশীদারিত্বভিত্তিক মুশারাকা মডেলে হোম ফাইন্যান্সিং দিচ্ছে এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সেবা সম্প্রসারণ করেছে। অন্যদিকে ডেভন ব্যাংক মুরাবাহাভিত্তিক ইসলামিক ফাইন্যান্সিং অফার করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করে, তাদের আর্থিক পণ্য শরিয়াহ বোর্ডের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। UIF Corporation, Devon Bank Faith-Based Financing

তবে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং নিয়ে সব আলেম, গবেষক ও অর্থনীতিবিদের মধ্যে একক মত নেই। কেউ এটিকে সুদভিত্তিক মর্টগেজের কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কিছু মডেলের বাস্তব প্রয়োগ, ঝুঁকি বণ্টন এবং চুক্তির ভাষা নিয়ে আরও গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বিশেষ করে সমালোচকদের একটি অংশের প্রশ্ন, কিছু মডেল নাম ও কাঠামোয় আলাদা হলেও অর্থনৈতিক ফলাফল কতটা ভিন্ন, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি।

সেই কারণেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোনো ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার আগে শুধু “হালাল” বা “শরিয়াহসম্মত” শব্দ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। বরং প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা, ফি, ডাউন পেমেন্ট, মালিকানা হস্তান্তরের পদ্ধতি, আগাম পরিশোধের শর্ত, অতিরিক্ত চার্জ এবং শরিয়াহ বোর্ডের কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে নিজস্ব আলেম, ইসলামিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ এবং রিয়েল এস্টেট আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক আর্থিক সেবার চাহিদা, আর্থিক সচেতনতা এবং বিকল্প ফাইন্যান্সিং খোঁজার প্রবণতা বাড়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামিক হোম ফাইন্যান্সিং খাত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে একসময় যে প্রশ্ন ছিল “সুদ ছাড়া আমেরিকায় বাড়ি কেনা আদৌ সম্ভব কি না”, এখন সেই প্রশ্নের উত্তরে সামনে আসছে একাধিক পথ। তবে কোন পথটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, নিরাপদ এবং বাস্তবে উপযোগী, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বুঝে, যাচাই করে এবং দীর্ঘমেয়াদি হিসাব মাথায় রেখে।