কানাডায় নতুন তেল পাইপলাইনের ঘোষণা, সামনে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ
- প্রকাশঃ ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৩:০৮
- / 17
কানাডার আলবার্টা থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার (বি.সি.) পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত নতুন তেল পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আর্থিক ঝুঁকি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ, পরিবেশগত বিধিনিষেধ এবং দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়াসহ নানা বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। প্রকল্পটি ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে নির্মাণ শেষ করে চালু হতে ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
কী ঘোষণা করা হয়েছে?
ক্যালগেরি থেকে বৃহস্পতিবার রাতে নতুন পাইপলাইন প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, আলবার্টা থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার রিচমন্ডের কাছে অবস্থিত রবার্টস ব্যাংক টার্মিনাল পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫.২ থেকে ৪৩.৭ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার। এটি মূলত বিদ্যমান ট্রান্স মাউন্টেন এক্সপ্যানশন (TMX) পাইপলাইনের পথ অনুসরণ করবে।
নতুন পাইপলাইন পরিকল্পনা ও নির্মাণের দায়িত্বে থাকবে ট্রান্স মাউন্টেন করপোরেশন। বেসরকারি অংশীদার হিসেবে যুক্ত হবে পেমবিনা পাইপলাইন করপোরেশন। প্রাথমিকভাবে নির্মাণ পর্যায়ে পেমবিনার অংশীদারিত্ব হবে ১০ শতাংশ, যা পাইপলাইন চালু হওয়ার পর ২০ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ শৃঙ্খলা প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ ভবিষ্যতে পুরো প্রকল্পই বেসরকারি খাতের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পাইপলাইন নির্মাণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রমাণ করা যে এটি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হবে। আগের TMX প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে, কিন্তু তেল পরিবহন শুরু হয় ২০২৪ সালে। অর্থাৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছে।
প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় শেষ পর্যন্ত TMX-এর নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার। তবে প্রধানমন্ত্রী কার্নির দাবি, বর্তমানে TMX অত্যন্ত লাভজনক এবং এটি চালু হওয়ার পর ২০২৫ সালে কানাডার পশ্চিম উপকূল দিয়ে তেল রপ্তানি দ্বিগুণ হয়েছে।
তবুও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদা ভবিষ্যতেও একই থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মোশে ল্যান্ডার বলেন, “এক দশক পর বৈশ্বিক তেলের চাহিদা কোথায় থাকবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।”
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আপত্তি কি আবারও বাধা হবে?
কানাডার অতীতের বড় পাইপলাইন প্রকল্পগুলোর অন্যতম প্রধান বাধা ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যথাযথ পরামর্শের অভাব। ২০১৮ সালে ফেডারেল কোর্ট অব আপিল রায় দেয়, TMX প্রকল্পে ফার্স্ট নেশনস জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শ করা হয়নি। ফলে প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় বিলম্বিত হয়।
একই ধরনের সমস্যার কারণে নর্দার্ন গেটওয়ে প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায় এবং এনব্রিজ শত শত মিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়ে। নতুন প্রকল্পের রুট প্রায় ১২৫টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত ভূখণ্ড অতিক্রম করবে। কার্নি জানিয়েছেন, নতুন রুট নিয়ে সংশ্লিষ্ট ফার্স্ট নেশনস সম্প্রদায়ের সঙ্গে দ্রুত পরামর্শ শুরু হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী আদিবাসীদের অধিকার উপেক্ষা করলে প্রকল্পটি আবারও আদালতে গড়াতে পারে।
পরিবেশ ও কার্বন করও বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন পাইপলাইন মানেই তেল উৎপাদন বৃদ্ধি, আর তার অর্থ বেশি কার্বন নিঃসরণ। যদিও ভোক্তা পর্যায়ের কার্বন মূল্য ২০২৫ সালে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্বন কর এখনো বহাল রয়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় নতুন বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। সরকার একই সঙ্গে অয়েল স্যান্ডস অ্যালায়েন্সের কার্বন ক্যাপচার প্রকল্প ‘পাথওয়েজ’ নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যতে নির্গমন কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে আরও এক দশক
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদন, পরিবেশগত মূল্যায়ন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা এবং সম্ভাব্য আইনি জটিলতা বিবেচনায় প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অধ্যাপক মোশে ল্যান্ডার বলেন, ব্যবসায়ীরা কয়েক দশকব্যাপী প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা চান।

















