ঢাকা ০৯:১১ , Thu, ০৬ Aug ২০২৬

নিউইয়র্ক বোমা হামলার নয় বছর পরও সুপারম্যাক্স কারাগারেই বাংলাদেশি আকায়েদ উল্লাহ, আমৃত্যু কারাভোগ বহাল

ফাহিম আহমেদ
  • প্রকাশঃ ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২১
  • / 16
২০১৭ সালের টাইমস স্কয়ার বোমা হামলায় দোষী সাব্যস্ত আকায়েদ উল্লাহ বর্তমানে কলোরাডোর এডিএক্স ফ্লোরেন্স ফেডারেল কারাগারে যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন ফাইল ছবি

নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার এলাকায় ২০১৭ সালের ব্যর্থ বোমা হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আকায়েদ উল্লাহ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ফেডারেল কারাগার এডিএক্স ফ্লোরেন্সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সাম্প্রতিক আপিলে তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ বাতিল হলেও কারাগার থেকে মুক্তির কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।

ফেডারেল আদালতের রায় অনুযায়ী, আকায়েদ উল্লাহকে বাকি জীবন কারাগারেই কাটাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিচার ব্যবস্থায় ১৯৮৭ সালের পর থেকে প্যারোল ব্যবস্থা নেই। ফলে ভালো আচরণ বা কারাগারের রেকর্ডের ভিত্তিতে সাধারণভাবে আগাম মুক্তির সুযোগও নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তার কারাগারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত কলোরাডোর এডিএক্স ফ্লোরেন্সে বিশ্বের আলোচিত বহু উচ্চঝুঁকির বন্দিকে রাখা হয়েছে। বর্তমানে সেখানেই রয়েছেন আকায়েদ উল্লাহ।

২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সার্কিট আপিল আদালত আকায়েদ উল্লাহর মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত তার বিরুদ্ধে থাকা একটি অভিযোগ বাতিল করে জানায়, সরকারপক্ষ যথেষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি যে তিনি সরাসরি জঙ্গি সংগঠন আইএসের নির্দেশনা বা নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছিলেন।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, অনলাইনে আইএসের প্রচারণা অনুসরণ করা মাত্রই কোনো ব্যক্তি সংগঠনটির সরাসরি নির্দেশনায় কাজ করেছেন, এমনটি প্রমাণিত হয় না। তবে এই সিদ্ধান্ত তার সাজায় কোনো পরিবর্তন আনেনি। বিস্ফোরক ব্যবহার, গণপরিবহন ব্যবস্থায় হামলা এবং অন্যান্য গুরুতর অভিযোগে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল রয়েছে। ফলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও বহাল রয়েছে।

২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর নিউইয়র্কের ব্যস্ততম এলাকা টাইমস স্কয়ার ও পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালের মাঝের পথচারী টানেলে সকালবেলার অফিসগামী মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিজের শরীরে বাঁধা ঘরে তৈরি একটি পাইপ বোমার বিস্ফোরণ ঘটান আকায়েদ উল্লাহ।

বোমাটি পুরোপুরি বিস্ফোরিত না হওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো যায়। তবে আকায়েদ উল্লাহ নিজে গুরুতর আহত হন। একজন পথচারী স্থায়ীভাবে তাঁর শ্রবণশক্তির বড় অংশ হারান। ঘটনার পর নিউইয়র্কজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

আকায়েদ উল্লাহর জন্ম চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। ২০১১ সালে পারিবারিক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ফ্ল্যাটল্যান্ডস এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। জীবিকার জন্য ট্যাক্সিচালক ও ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবেও কাজ করেছেন।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে তিনি অনলাইনে উগ্রপন্থী প্রচারণার সংস্পর্শে আসেন। তদন্তে বলা হয়, ধীরে ধীরে তিনি চরমপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত হন এবং হামলার পরিকল্পনা করেন। হামলার আগে বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করে নিজের বাসায় বোমা তৈরি করেছিলেন বলেও তদন্তে উঠে আসে।

২০১৮ সালের নভেম্বরে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে এক সপ্তাহব্যাপী বিচার শেষে জুরি তাকে ছয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল বিস্ফোরক ব্যবহার, সন্ত্রাসী হামলা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় সহিংসতা।

২০২১ সালের এপ্রিলে ফেডারেল বিচারক রিচার্ড সুলিভান তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর পাশাপাশি আরও ৩০ বছরের সাজা ঘোষণা করা হয়। সাজা ঘোষণার আগে আকায়েদ উল্লাহ অনুতাপ প্রকাশ করেছিলেন। তবে বিচারক বলেন, হামলাটি ছিল পরিকল্পিত এবং অত্যন্ত গুরুতর।

আকায়েদ উল্লাহর ঘটনা বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির জন্য একটি কঠিন অধ্যায় হয়ে রয়েছে। তবে একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় কোনো কমিউনিটির নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন, ব্যবসা করছেন এবং দেশটির অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রেখে চলেছেন। হামলার পরও বাংলাদেশি-আমেরিকান সংগঠনগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, উগ্রপন্থা ও সহিংসতার কোনো স্থান তাদের কমিউনিটিতে নেই।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনলাইন উগ্রপন্থার ঝুঁকিও নতুন করে আলোচনায় আসে। কীভাবে একজন সাধারণ জীবনযাপনকারী ব্যক্তি ধীরে ধীরে অনলাইনের উগ্রপন্থী প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে সহিংসতার পথে যেতে পারেন, সেই প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা পরিবার, কমিউনিটি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সচেতন ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি নজর রাখা এবং ঘৃণা ও সহিংসতার প্রচারণা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্তমানে আকায়েদ উল্লাহর জীবন কারাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফেডারেল আদালতের রায় অনুযায়ী, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে কারাগারেই থাকতে হবে।

❤️
👏
🙂
😞

নিউইয়র্ক বোমা হামলার নয় বছর পরও সুপারম্যাক্স কারাগারেই বাংলাদেশি আকায়েদ উল্লাহ, আমৃত্যু কারাভোগ বহাল

প্রকাশঃ ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০২:২১

নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার এলাকায় ২০১৭ সালের ব্যর্থ বোমা হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আকায়েদ উল্লাহ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ফেডারেল কারাগার এডিএক্স ফ্লোরেন্সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সাম্প্রতিক আপিলে তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ বাতিল হলেও কারাগার থেকে মুক্তির কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।

ফেডারেল আদালতের রায় অনুযায়ী, আকায়েদ উল্লাহকে বাকি জীবন কারাগারেই কাটাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বিচার ব্যবস্থায় ১৯৮৭ সালের পর থেকে প্যারোল ব্যবস্থা নেই। ফলে ভালো আচরণ বা কারাগারের রেকর্ডের ভিত্তিতে সাধারণভাবে আগাম মুক্তির সুযোগও নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তার কারাগারগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত কলোরাডোর এডিএক্স ফ্লোরেন্সে বিশ্বের আলোচিত বহু উচ্চঝুঁকির বন্দিকে রাখা হয়েছে। বর্তমানে সেখানেই রয়েছেন আকায়েদ উল্লাহ।

২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সার্কিট আপিল আদালত আকায়েদ উল্লাহর মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত তার বিরুদ্ধে থাকা একটি অভিযোগ বাতিল করে জানায়, সরকারপক্ষ যথেষ্ট প্রমাণ দিতে পারেনি যে তিনি সরাসরি জঙ্গি সংগঠন আইএসের নির্দেশনা বা নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছিলেন।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, অনলাইনে আইএসের প্রচারণা অনুসরণ করা মাত্রই কোনো ব্যক্তি সংগঠনটির সরাসরি নির্দেশনায় কাজ করেছেন, এমনটি প্রমাণিত হয় না। তবে এই সিদ্ধান্ত তার সাজায় কোনো পরিবর্তন আনেনি। বিস্ফোরক ব্যবহার, গণপরিবহন ব্যবস্থায় হামলা এবং অন্যান্য গুরুতর অভিযোগে তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল রয়েছে। ফলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও বহাল রয়েছে।

২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর নিউইয়র্কের ব্যস্ততম এলাকা টাইমস স্কয়ার ও পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনালের মাঝের পথচারী টানেলে সকালবেলার অফিসগামী মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিজের শরীরে বাঁধা ঘরে তৈরি একটি পাইপ বোমার বিস্ফোরণ ঘটান আকায়েদ উল্লাহ।

বোমাটি পুরোপুরি বিস্ফোরিত না হওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো যায়। তবে আকায়েদ উল্লাহ নিজে গুরুতর আহত হন। একজন পথচারী স্থায়ীভাবে তাঁর শ্রবণশক্তির বড় অংশ হারান। ঘটনার পর নিউইয়র্কজুড়ে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

আকায়েদ উল্লাহর জন্ম চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়। ২০১১ সালে পারিবারিক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের ফ্ল্যাটল্যান্ডস এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। জীবিকার জন্য ট্যাক্সিচালক ও ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবেও কাজ করেছেন।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে তিনি অনলাইনে উগ্রপন্থী প্রচারণার সংস্পর্শে আসেন। তদন্তে বলা হয়, ধীরে ধীরে তিনি চরমপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত হন এবং হামলার পরিকল্পনা করেন। হামলার আগে বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ সংগ্রহ করে নিজের বাসায় বোমা তৈরি করেছিলেন বলেও তদন্তে উঠে আসে।

২০১৮ সালের নভেম্বরে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে এক সপ্তাহব্যাপী বিচার শেষে জুরি তাকে ছয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল বিস্ফোরক ব্যবহার, সন্ত্রাসী হামলা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় সহিংসতা।

২০২১ সালের এপ্রিলে ফেডারেল বিচারক রিচার্ড সুলিভান তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর পাশাপাশি আরও ৩০ বছরের সাজা ঘোষণা করা হয়। সাজা ঘোষণার আগে আকায়েদ উল্লাহ অনুতাপ প্রকাশ করেছিলেন। তবে বিচারক বলেন, হামলাটি ছিল পরিকল্পিত এবং অত্যন্ত গুরুতর।

আকায়েদ উল্লাহর ঘটনা বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির জন্য একটি কঠিন অধ্যায় হয়ে রয়েছে। তবে একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় কোনো কমিউনিটির নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন, ব্যবসা করছেন এবং দেশটির অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রেখে চলেছেন। হামলার পরও বাংলাদেশি-আমেরিকান সংগঠনগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, উগ্রপন্থা ও সহিংসতার কোনো স্থান তাদের কমিউনিটিতে নেই।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনলাইন উগ্রপন্থার ঝুঁকিও নতুন করে আলোচনায় আসে। কীভাবে একজন সাধারণ জীবনযাপনকারী ব্যক্তি ধীরে ধীরে অনলাইনের উগ্রপন্থী প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে সহিংসতার পথে যেতে পারেন, সেই প্রশ্ন এখনও প্রাসঙ্গিক। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা পরিবার, কমিউনিটি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সচেতন ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তরুণদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি নজর রাখা এবং ঘৃণা ও সহিংসতার প্রচারণা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্তমানে আকায়েদ উল্লাহর জীবন কারাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফেডারেল আদালতের রায় অনুযায়ী, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে কারাগারেই থাকতে হবে।