কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে মাতৃভাষা ও ঐতিহ্য উৎসব, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মিলল চার দেশের সংস্কৃতি
- প্রকাশঃ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:০৩
- / 11
কানাডা, ১৬ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – মাতৃভাষার প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণের অঙ্গীকার নিয়ে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার নিউ ওয়েস্টমিনস্টারের কুইন্সবোরো কমিউনিটি সেন্টারের মুক্তমঞ্চে বার্ষিক ‘মাতৃভাষা উৎসব ২০২৬’ উদ্যাপন করেছে গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটি। সংগঠনটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে কানাডার বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বাংলাদেশ, চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার শিল্পীরা অংশ নেন।
‘ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যই আমাদের পরিচয়’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত উৎসবে সমাজসেবক, লেখক, কবি, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী এবং কানাডার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমের পাশাপাশি একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও পরিচয়ের ধারক। সেই চেতনা থেকেই দীর্ঘদিন ধরে মাতৃভাষার গুরুত্ব সংরক্ষণে কাজ করে আসছে গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে কানাডার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে ফার্স্ট নেশনসের শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন। এর মধ্য দিয়ে কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এরপর বাংলাদেশের ভাষাশহীদ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মাতৃভাষা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ ও সংগ্রাম করা মানুষদের স্মরণে ৩০ সেকেন্ড নীরবতা পালন করা হয়।
ফেডারেল সংসদ সদস্য জেইক সাওয়াটস্কি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও মূল অতিথি হিসেবে একটি বিশেষ বার্তা পাঠান। দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে তাঁর অনুপস্থিতিতে বার্তাটি পাঠ করে শোনান শফিউল আজম। বার্তায় মাতৃভাষা সংরক্ষণের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগকে স্বাগত ও সাধুবাদ জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বসবাসরত বাঙালি লেখক ও কবিরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী ফারজানা নাজ শম্পা তাঁর অনূদিত বই থেকে কানাডীয় কবি জর্জ এলিয়টের একটি ইংরেজি কবিতার বাংলা অনুবাদ ও আবৃত্তি উপস্থাপন করেন।
তিনি বিভিন্ন ভাষার সৌন্দর্যকে অলংকারের সঙ্গে তুলনা করে কানাডার সাহিত্য অনুবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ৭০টির বেশি ভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
সংগঠনটির দীর্ঘদিনের সহযোগী কবি শাহানা আক্তার মহুয়া তাঁর বক্তব্যে ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কীভাবে মানুষের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলে, তা তুলে ধরেন।
গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটির সভাপতি আবদুল মতিন বলেন, মাতৃভাষা রক্ষার লড়াই শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকেই। প্রতিদিনের পারিবারিক জীবনে সন্তানদের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ভাষা মানুষের শিকড় ও বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান সেতু। ভাষা হারিয়ে গেলে নিজের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ সময় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতির প্রস্তাবক প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন আবদুল মতিন। তাঁদের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজের বৈচিত্র্য ফুটে ওঠে। বাংলাদেশ, চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার শিল্পীরা নিজ নিজ সংস্কৃতির আবহে বর্ণিল নৃত্য পরিবেশন করেন। বৈচিত্র্যময় এসব পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং অনুষ্ঠানজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির পারস্পরিক মেলবন্ধন তৈরি করে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি ভাষার মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ও ঐক্যের দিকটি তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের সভাপতি আবদুল মতিন ফুলের শুভেচ্ছা উপহার তুলে দেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সহ-আহ্বায়ক আবদুস সালামের হাতে।
গ্লোবাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স সোসাইটির সভাপতি হিসেবে আব্দুল মতিন দায়িত্ব পালন করছেন। ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন মাইকেল দীপায়ন মিত্র ও হাসান মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শফিউল আজম। সংগঠনটির সঙ্গে বিভিন্ন পদে প্রায় ১৪ বছর ধরে কাজ করছেন আবদুল মতিন।
উৎসবের সফল আয়োজনের পেছনে সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরা হয়। হাসান মামুন, মাইকেল মিত্র, শফিউল আজমসহ নির্বাহী কমিটির সব সদস্যকে তাঁদের পরিকল্পনা, সমন্বয় ও পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়।
সমাপনী বক্তব্যে সভাপতি ড. আবদুল মতিন এবং ভ্যাঙ্কুভারে জিভিবিসিএর সভাপতি এম এইচ লিটন অনুষ্ঠানে সহযোগিতার জন্য ফার্স্ট নেশনস দলের নেতৃত্বে থাকা ল্যাডোনা উইকস, কারিগরি ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ দল, স্বেচ্ছাসেবক এবং উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই মাতৃভাষা উৎসব ছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্ব স্মরণ করার একটি আয়োজন। ভাষা যোগাযোগের মাধ্যমের পাশাপাশি মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত, সেই বার্তাই উৎসবের বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়।





























