বাড়ি কেনার স্বপ্ন দূরে সরিয়ে শেয়ারবাজার ও সঞ্চয়ে ঝুঁকছে আমেরিকান জেন জি
- প্রকাশঃ ২২ অগাস্ট ২০২৬, ১৯:৩৫
- / 2
যুক্তরাষ্ট্র, (প্রজন্ম কথা) – বাড়ি কেনাকে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ও আর্থিক নিরাপত্তা তৈরির প্রধান উপায় হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণা থেকে সরে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেশন জেড বা জেন জির একটি বড় অংশ। বাড়ির বাড়তি দাম ও বন্ধকি ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে তরুণদের অনেকে এখন অবসরকালীন সঞ্চয়, শেয়ারবাজার এবং উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাবে অর্থ রাখাকে ভবিষ্যৎ সম্পদ গড়ার বেশি কার্যকর পথ হিসেবে দেখছেন।
২৬ বছর বয়সী কানা কামিংসের আর্থিক পরিকল্পনায় এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ পাওয়া যায়। ২০২০ সালে কলেজের তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আগ্রহী হন তিনি। করোনাভাইরাস মহামারির সময় উদ্বেগ কমাতে কয়েকজন শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি কর্মশালার আয়োজন করলে তাতে অংশ নেন কামিংস।
কর্মশালা শেষে গ্রীষ্মকালীন ইন্টার্নশিপ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে তিনি রথ আইআরএ নামের অবসরকালীন বিনিয়োগ হিসাব খোলেন। পরে ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর কোম্পানির ৪০১(কে) পরিকল্পনায় অর্থ জমাতে শুরু করেন। বার্ষিক বোনাসের অর্থও রথ আইআরএতে রাখেন তিনি। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনের জন্য অর্থবাজারভিত্তিক তহবিলে সঞ্চয় এবং আলাদা একটি বিনিয়োগ পোর্টফোলিও গড়ে তুলেছেন।
ভবিষ্যতে বড় কোনো শহরে অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ইচ্ছা থাকলেও বর্তমানে বাড়ি কেনার জন্য আলাদা করে সঞ্চয় করছেন না কামিংস। ব্যবসায় শিক্ষার পড়াশোনা শুরু করার আগে তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন ব্যয় ও বন্ধকি ঋণের উচ্চ সুদহার তরুণদের বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জুনে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৪০ বছরের কম বয়সী ৮৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করেন, তাদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমান তরুণদের জন্য বাড়ি কেনা বেশি কঠিন। একই জরিপে বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের মধ্যে বাড়িকে ‘খুব ভালো’ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতাও কম দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে জেন জির অনেকেই অবসরকালীন সঞ্চয়, বিনিয়োগ অ্যাপের মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা এবং উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাবে অর্থ রাখাকে সম্পদ তৈরির বিকল্প পথ হিসেবে দেখছেন।
অবসরকালীন সঞ্চয়ও এ প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শুরুতে ফিডেলিটির এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেন জির অবসরকালীন সঞ্চয়ে অবদান এক বছরে ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। এই বৃদ্ধির হার মিলেনিয়ালদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
স্ট্যানফোর্ডের গবেষক রোবার্টা ক্যাটজ, যিনি জেন জি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করেছেন, বলেন, এই প্রজন্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা। তাঁর মতে, বয়স্ক প্রজন্মের কাছে বাড়ি সম্পদ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতীক ছিল। জেন জির মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এমন স্থির ধারণা তুলনামূলকভাবে কম। পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে তারা আর্থিক নমনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
২৮ বছর বয়সী জেফ শার্পের আর্থিক পরিকল্পনাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ওরেগনের বেন্ড শহরে বসবাসকারী শার্প বারটেন্ডার হিসেবে খণ্ডকালীন কাজের পাশাপাশি পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাঁর বসবাসের শহরে একটি বাড়ির মধ্যম দাম বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০ বছর আগের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি।
শার্প ২০ বছরের শুরুর দিকেই বিনিয়োগ শুরু করেন। প্রথমে রবিনহুড অ্যাপ ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কিনতেন। পরে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও জানার পর সূচকভিত্তিক তহবিলে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেন এবং রবিনহুডের সব বিনিয়োগ ভ্যানগার্ডে স্থানান্তর করেন। পাশাপাশি রথ আইআরএ ও মেয়ের জন্য ৫২৯ কলেজ সঞ্চয় পরিকল্পনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। ছোট অঙ্কে বিনিয়োগের জন্য তিনি অ্যাকর্নস অ্যাপও ব্যবহার করেন।
জেন জির আর্থিক সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে বাজেট ও বিনিয়োগের বিভিন্ন অ্যাপের ব্যবহারও বাড়ছে। চলতি মাসে প্রকাশিত গ্যালাপের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জেন জির ৮১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পরামর্শ খোঁজেন এবং ৭৫ শতাংশ এ ধরনের তথ্য অনলাইন থেকে সংগ্রহ করেন।
২৩ বছর বয়সী অ্যাডাম বেন্টন একটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিচালন বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। বেতন পাওয়ার পর নিয়মিতভাবে অবসরকালীন সঞ্চয়, ব্রোকারেজ হিসাব ও উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাবে অর্থ রাখেন তিনি। সূচকভিত্তিক তহবিলে বিনিয়োগের জন্য চার্লস শোয়াবের অ্যাপ ব্যবহার করেন। নিজের সম্পদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ‘মাই ওয়ালেট’ নামের একটি অ্যাপের মাধ্যমে নিট সম্পদের হিসাবও রাখেন।
বেন্টনেরও ভবিষ্যতে বাড়ি কেনার ইচ্ছা রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিকে নিকট ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন না তিনি। তাঁর ভাষায়, বাড়ি কেনার বিষয়টি এত দূরের মনে হয় যে সেখানে পৌঁছানো আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন জাগে।
জেন জির এই পরিবর্তিত আর্থিক দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে বাড়ির ক্রমবর্ধমান মূল্য, উচ্চ ঋণব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে বাড়ি কিনে সম্পদ গড়ার প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি এ প্রজন্মের একটি বড় অংশ বিনিয়োগ, অবসরকালীন সঞ্চয় এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সম্পদে অর্থ ভাগ করে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা তৈরির দিকে এগোচ্ছে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস


























