নিউইয়র্ক পুলিশে বাংলাদেশিদের উত্থান, এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি-আমেরিকান কর্মকর্তা
- প্রকাশঃ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:২৮
- / 5
নিউইয়র্ক, ২৫ সেপ্টেম্বর, (প্রজন্ম কথা) – কয়েক দশক আগে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। বর্তমানে নিউইয়র্ক পুলিশের প্রায় ৩৩ হাজার ইউনিফর্মধারী সদস্যের মধ্যে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি-আমেরিকান কর্মকর্তা কাজ করছেন। পাশাপাশি বিভাগের বেসামরিক কর্মীদের মধ্যেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ রয়েছেন।
নিউইয়র্কে বাংলাদেশি অভিবাসী সম্প্রদায়ের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ বিভাগেও তাঁদের উপস্থিতি বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সক্রিয় নিয়োগ, নতুন অভিবাসীদের উৎসাহিত করা এবং পুলিশের বেসামরিক পদ থেকে পরবর্তী সময়ে ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ এই অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শামসুল হক ২০০৪ সালে নিউইয়র্ক পুলিশে যোগ দেওয়ার সময় বাংলাদেশি কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল খুবই কম। তাঁর মতে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর বাংলাদেশি ও মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু তরুণের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ বাড়ে।
হক ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন পড়ার পর তাঁর সামনে বেসরকারি খাতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ৯/১১ হামলার পর তিনি পুলিশ একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয়ে ছিলেন।
পরে নিউইয়র্ক পুলিশে বাংলাদেশিদের প্রবেশের একটি কার্যকর পথ তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব না থাকলেও পুলিশের কিছু বেসামরিক পদে কাজের সুযোগ থাকায় নতুন অভিবাসীদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, স্কুল নিরাপত্তা কিংবা জরুরি সেবা নম্বরের অপারেটর হিসেবে বিভাগে যোগ দিতে উৎসাহিত করা হয়।
নাগরিকত্ব পাওয়ার পর এসব কর্মী পুলিশ একাডেমিতে আবেদন করে ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ পান। শামসুল হকের হিসাব অনুযায়ী, নিউইয়র্ক পুলিশের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ এই পথ অনুসরণ করেছেন।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন অভিবাসীরা প্রথমে পুলিশ বিভাগের কর্মপরিবেশ ও দায়িত্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। পরে নাগরিকত্ব অর্জনের পর তাঁদের জন্য ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার পথ তৈরি হয়।
সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক পুলিশের বিভিন্ন পদেও দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশি-আমেরিকান পুলিশ কর্মকর্তাদের সংগঠনের বর্তমান সভাপতি সার্জেন্ট এরশাদুর সিদ্দিকের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ১০ জন গোয়েন্দা, ৮২ জন সার্জেন্ট, ২০ জন লেফটেন্যান্ট এবং চারজন ইন্সপেক্টর রয়েছেন।
নেতৃত্বের পর্যায়েও বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের অগ্রগতি হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে অবসর নেওয়ার আগে শামসুল হক নিউইয়র্ক পুলিশের প্রথম দক্ষিণ এশীয় এবং প্রথম মুসলিম লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদে উন্নীত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের এই উপস্থিতি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও পুলিশে ক্যারিয়ার গড়ার আগ্রহ তৈরি করছে। নিউইয়র্ক পুলিশের বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে গিয়ে তরুণ ও নতুন অভিবাসীদের পুলিশে চাকরির সুযোগ সম্পর্কে জানান এবং তাঁদের এই পেশায় আসতে উৎসাহিত করেন।
নিউইয়র্ক পুলিশের জনবল কাঠামোতেও এশীয়সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিফর্মধারী সদস্যদের প্রায় ৩৮ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ, ৩৩ শতাংশ হিস্পানিক, ১৭ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ এবং প্রায় ১২ শতাংশ এশীয়।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কর্মকর্তাদের অগ্রযাত্রার পেছনে তাই একাধিক পর্যায়ের সম্পৃক্ততা দেখা যায়। কেউ প্রথমে বেসামরিক কর্মী হিসেবে পুলিশ বিভাগে যুক্ত হয়েছেন, পরে নাগরিকত্ব অর্জনের পর পুলিশ একাডেমিতে প্রবেশ করেছেন। আবার কেউ নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে নিয়োগের তথ্য ছড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় আসতে উৎসাহিত করেছেন।
কয়েক দশক আগে যেখানে নিউইয়র্ক পুলিশে বাংলাদেশি কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত, সেখানে বর্তমানে এক হাজারের বেশি ইউনিফর্মধারী বাংলাদেশি-আমেরিকান সদস্যের উপস্থিতি নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অভিবাসী সম্প্রদায়ের পেশাগত পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে উঠেছে।





























