জামায়াতকে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র: মার্কিন কূটনীতিকের ফাঁস হওয়া অডিওতে বিস্ময়কর তথ্য
- প্রকাশঃ ১০:১৪:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
- / 57
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইতিহাসের সেরা ফলাফল করতে পারে—এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কূটনীতিকদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা থেকে পাওয়া একটি অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাতে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন পত্রিকাটির নয়াদিল্লি ব্যুরো প্রধান প্রাণশু ভার্মা। এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র পুনরুত্থিত ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলেও দলটি নিষিদ্ধ ছিল। অতীতে শরিয়া আইন প্রবর্তন এবং নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর মতো অবস্থানের কারণে দলটি সমালোচিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তারা নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। বর্তমানে জামায়াত দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা অডিও অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় একজন মার্কিন কূটনীতিক স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বলেন, বাংলাদেশ এখন ‘ইসলামী ধারার দিকে মোড় নিচ্ছে’। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ‘আগে কখনো যা করতে পারেনি, তেমন ফলাফল করতে পারে’।
ওই বৈঠকে কূটনীতিক সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন,
“আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই।”
এ সময় তিনি সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করেন, জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের টকশো বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব কি না।
নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই কূটনীতিকের পরিচয় প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন পোস্ট। তবে তিনি জামায়াতের মাধ্যমে বাংলাদেশে জোরপূর্বক শরিয়া আইন আরোপের আশঙ্কা নাকচ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এমন ‘লিভারেজ’ রয়েছে, যা প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে। তার ভাষায়, “আমি মোটেও বিশ্বাস করি না যে জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দিতে পারবে।”
তিনি আরও বলেন, জামায়াত যদি ক্ষমতায় গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অগ্রহণযোগ্য কোনো নীতি গ্রহণ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপসহ কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই ওয়াশিংটন পোস্টকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, ডিসেম্বরের ওই আলোচনা ছিল দূতাবাস কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের মধ্যে একটি নিয়মিত, অফ-দ্য-রেকর্ড মতবিনিময়। তিনি জানান, সেখানে একাধিক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষ নেয় না। “বাংলাদেশি জনগণ যাকে নির্বাচিত করবে, যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গেই কাজ করবে,”—বলেন তিনি।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, “একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক আলোচনায় কী বলা হয়েছে, সে বিষয়ে মন্তব্য না করাই শ্রেয় মনে করছি।”
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে এবং দেশটি কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, জামায়াতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কের দূরত্ব আরও বাড়াতে পারে। তার মতে, “ভারতের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাগত উদ্বেগগুলোর একটি হলো জামায়াতে ইসলামী।”
তবে মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের ওপর বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকার পর জামায়াতে ইসলামী এবার মূলধারার রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মুবাশ্বার হাসান বলেন, “জামায়াত এখন মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকে জামায়াতে ইসলামী ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে এবং ঢাকায়ও নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়, এই অডিও ফাঁস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন কূটনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিরল ও স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে।




























