প্রতিবন্ধকতা নিয়েই কেটেছে জীবনের দীর্ঘ ৬০ টি বছর তবুও অন্যের কাছে হাত পাতেনি মফিজ
- প্রকাশঃ ০৫:৪৪:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 142
জন্মগত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ৬১ বছর ধরে কখনো কারো কাছে হাত না-পেতে জীবিকা নির্বাহ করছে মফিজ উদ্দিন | ছবি: প্রজন্ম কথা
জন্ম থেকেই বিকল মফিজের দুই পা। এক হাতে আছে চারটি আঙুল, অন্য হাতে দুটি। চলাচল করেন প্যাডেল ঘোরানো এক হুইলচেয়ারে। এমন প্রতিবন্ধকতা নিয়েই কেটেছে জীবনের দীর্ঘ ষাটটি বছর। কিন্তু কখনো দুঃখ করে বসে থাকেননি, অন্যের কাছে হাত পাতেননি। নিজের শ্রম দিয়েই সংসার টেনেছেন। এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তিনি। তবু হাল ছাড়েননি। নড়াইল শহরের দুর্গাপুর এলাকায় নড়াইল-মাগুরা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে রেলব্রিজের নিচে মাদুর পেতে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে জীবনের শেষ প্রহরটুকুও আত্মমর্যাদা নিয়েই কাটাচ্ছেন।
গতকাল শনিবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, মফিজের দোকানে আছে বিস্কুট, চানাচুর, সিগারেট, বাদাম, আর শিশুদের জন্য কিছু চিপস ও টফি-বিস্কুট। পরিমাণে কোনো পণ্যই খুব বেশি নয়। মাঝে মাঝে চলতিপথে ক্রেতারা দাঁড়াচ্ছেন মফিজের দোকানে৷ টুকটাক কেনাকাটা শেষে আবার চলে যাচ্ছেন।
জানা যায়, তার পুরো নাম মফিজ উদ্দিন (৬১)। তিনি নড়াইল শহরের দুর্গাপুর গ্রামের নাজিম উদ্দীনের ছেলে। জন্ম থেকেই তার এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। শুধু তিনি নয়, তার আরেক ভাইসহ পরিবারের আরো কয়েকজন সদস্য শারিরীক প্রতিবন্ধী। তবে তারা সবাই কর্ম করেই জীবন চালান। মফিজের কোনো জায়গা-জমি না থাকায় দোকানের পাশে একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন। সঙ্গে থাকে তার ছোট মেয়ে। মেয়েটি এবার নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। অন্য দুইটি মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তারা শ্বশুরবাড়িতে ঘর-সংসার করছেন। আর স্ত্রী মারা গেছেন অনেক আগেই৷’
প্রতিবন্ধকতাকে কখনোই বেঁচে থাকাতে বাঁধা মনে করেননি জানিয়ে মফিজ বলেন, শারীরের এ অবস্থার কারণে তেমন কঠিন কোনো কাজ করতি পারি না। তবে বইসেও থাকিনি। যুব উন্নয়নের সামনে আমার এট্টা ছোট মুদি দোকান ছিল। প্রায় ২৫ বছরের মত ওখানে দোকানদারি করিছি। বেশ কয়েকবছর আগে দোকানডা নষ্ট হইয়ে ভাইঙ্গেচুরে যায়৷ টাকার অভাবে আর দোকানঘর করতি পারিনি। এরপর মাঝে কিছু সময় বেকার বইসে ছিলাম। সংসার তো আর চলে না। পরে বছর চারেক আগে আবার এখানে কিছু মালামাল নিয়ে মাদুর পাইতে বইছি।
সেখানে বেচাকেনা ভালো হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এহানে ভালই লোকজন দাঁড়ায়৷ বেচাকিনা খারাপ হয় না। কিন্তু আমার দোকানে তো মালই নাই। মাল না থাকলি কি বেঁচবো৷ টাকার অভাবে মাল উঠাতি পারি নে। দিনে যা বেচাকিনা হয় তার থেকে ১৫০-২০০ টাকার মত লাভ থাকে। এ দিয়ে বাসা ভাড়া, সংসার, ওষুধ ও মাইয়ের পড়াশোনা চালাতি খুব কষ্ট হয়।
তবুও জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই জানিয়ে মফিজ বলেন, ”হয়তো অর্থ সম্পদ থাকলি বাড়িঘর করে ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখে থাকতি পারতাম। কিন্ত তা তো নাই৷ দুই-চার হাজার পুঁজি আছে, তাই দিয়ে বেচাকিনা করি। কোনরহম খায়ে না খায়ে চলতি হয়। তারপরও বলব, উপর আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো আছি। যদি দোকানঘর তুলতে পারতাম, আর মালামাল উঠাতে পারতাম, তালি বেইচেকিনে আরেকটু ভালো থাকতি পারতাম।”
তার পাশে দীর্ঘসময় বসে থাকতে দেখা যায় লুৎফার মোল্যা নামে একজনকে। তিনি মফিজের বন্ধু। সময় পেলে দোকানে এসে বন্ধুকে সহযোগিতা করেন। তিনি বলেন, মফিজ আমার এলাকার ভাই-বন্ধু। ছোটবেলারতেই ও কাজকর্ম করে। আয় হলি খায়, না হলি না খায়। কিন্তু কারো দুয়োরি (দরজায়) যায় না।
শারিরীক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ভিক্ষা বা কারো কাছে হাত না পেতে পরিশ্রম করে সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করায় মফিজের প্রশংসা করেন দুর্গাপুরের বাসিন্দা কাজী আরাফাত, ইমন সিকদার এবং পথচারী সবা আলী খান ও রবিউল ইসলামসহ কয়েকজন। তারা বলেন, বিত্তবান ও সরকারের উচিত তাঁকে একটি দোকানঘর নির্মাণ ও পূঁজিসহ মালামাল তুলতে সহায়তা করা। যাতে আত্মসম্মানের সঙ্গে তাঁর বাকি জীবনটা আরেকটু ভালোভাবে কাটাতে পারে।
নড়াইল শহর সমাজেবা কর্মকর্তা মো. সুজা উদ্দীন বলেন, প্রতিবন্ধী হলেও তিনি কাজ করে সংসার চালান- এটি প্রশংসার দাবি রাখে। তাকে আমরা একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দিয়েছি। এছাড়াও সুদমুক্ত ঋণসহ সরকারি যে-কোনো সহযোগিতার সুযোগ থাকলে করা হবে। যাতে আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করতে পারেন তিনি।





























