৯ মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা: বাংলাদেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেশি–বিদেশি বিশেষজ্ঞদের
- প্রকাশঃ ০৬:০৫:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫
- / 130
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশি–বিদেশি ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় অবস্থান করা ‘মেগাথার্স্ট’ ফল্ট থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে—যা এ অঞ্চলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে শনিবার অনুষ্ঠিত ‘আর্থকুয়েক অ্যাওয়ারনেস, সেফটি প্রটোকল অ্যান্ড ইমার্জেন্সি প্রিপারেডনেস’ শীর্ষক সেমিনারে এসব মতামত তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। সেমিনারের আয়োজন করে জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড।
তিন সক্রিয় প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশ
সেমিনারে জানানো হয়, ভারত, মিয়ানমার ও ইউরেশীয়—এই তিন টেকটোনিক প্লেটের মিলনস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে দেশটি ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন—সিলেটের ডাউকি ফল্ট, চট্টগ্রাম–টেকনাফের চিটাগং-আরাকান ফল্ট, মিয়ানমারের সাগাইং ফল্ট—মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ভূকম্পন অঞ্চলে রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, ঘনবসতি, বিল্ডিং কোড উপেক্ষা ও সংকীর্ণ সড়কের চাপ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
শত বছরের সঞ্চিত শক্তি এখনো মুক্ত হয়নি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত সাবডাকশন জোনে গত ৮০০ থেকে ১০০০ বছরের সঞ্চিত শক্তি এখনো মুক্ত হয়নি—যা বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘মেগাথার্স্ট’ ফল্ট নড়াচড়া করলে তা ৯ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে পারে—যা পুরো অঞ্চলের অবকাঠামো ও জনজীবনে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে।
গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে ২০০টির বেশি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে, আর ২০২৪ সালের পর কম্পনের হার আরও বেড়েছে বলেও সেমিনারে উল্লেখ করা হয়।
জাপানের অভিজ্ঞতা: ভবন নিরাপত্তায় জোর
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন জাপানের দুই ভূমিকম্প–সহনশীল স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ কেসিরো সাকো ও হেসাইয়ে সুগিয়ামা। তাঁরা জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে— নিরাপদ স্থাপত্য নকশা, ভূমিকম্প–সহনশীল প্রযুক্তি, টেকসই নির্মাণমান—ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন।
ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কী করতে হবে
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সঠিক প্রস্তুতি ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে বড় ভূমিকম্পেও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তাঁদের সুপারিশ— ভূমিকম্প–সহনশীল ভবন নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনের স্ট্রাকচারাল অডিট, নির্মাণমান কঠোর তদারকি, জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বাড়ানো, কার্যকর প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, নাগরিকদের নিয়মিত ড্রিল ও প্রশিক্ষণ, পরিবারভিত্তিক জরুরি প্রস্তুতি, তাঁদের মতে, রাষ্ট্র, আবাসন খাত ও জনগণের যৌথ দায়বদ্ধতা ছাড়া ভূমিকম্প মোকাবিলা সম্ভব নয়।
ঢাকার ঝুঁকি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক কম্পন
স্বাগত বক্তব্যে জেসিএক্স ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় অনুভূত একাধিক ভূমিকম্প দেশের অস্বাভাবিক ঝুঁকি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, জনঘনত্ব ও দুর্বল ভবন কাঠামোর কারণে বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটলে বিপর্যয় ভয়াবহ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র, আবাসন খাত ও জনগণ—এই তিনটি স্তম্ভ শক্তিশালী হলেই আমরা ভূমিকম্প ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারব।
সেমিনারে বক্তব্য দেন খ্যাতিমান প্রকৌশলী প্রফেসর ড. এম শামীম জেড বসুনিয়া, প্রফেসর ড. সৈয়দ ফখরুল আমিন (বুয়েট), রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদুজ্জামান, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী, রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ আল হোসেন চৌধুরী রিজভী, প্রফেসর ড. রাকিব আহসান (বুয়েট), বাজুস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান, বিএমইডির পরিচালক মমিনুল ইসলাম, স্থপতি আরিফুল ইসলাম, স্থপতি রফিক আজম ও ভিস্তারার এমডি মুস্তফা খালিদ পলাশ।





























