বড়পুকুরিয়ার মুনাফায় খনি–কেন্দ্র দ্বন্দ্ব, লোকসানে পিডিবি
- প্রকাশঃ ০৪:৪৭:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 53
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি| ছবি: সংগৃহীত
দেশের একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি টানা তিন অর্থবছর বিপুল মুনাফা করলেও পাশের সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সেই কয়লার বাড়তি দাম পরিশোধ করে বছরে শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনছে। আমদানি করা কয়লার দাম যেখানে প্রতি টনে গড়ে ৭৫ ডলার, সেখানে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা পিডিবিকে বিক্রি করা হচ্ছে ১৭৬ ডলারে। এই অস্বাভাবিক মূল্য পার্থক্য নিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর অসন্তোষ ও প্রশ্ন।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে বড়পুকুরিয়ার কয়লার দাম ১৩০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৭৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়। দাম বাড়ার পর বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির মুনাফা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। কোম্পানির কর্মকর্তা–কর্মচারীরা প্রতিবছর এ মুনাফার ১০ শতাংশ বোনাস হিসেবে পাচ্ছেন—বেতন–ভাতার বাইরে বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত।
অন্যদিকে একই কয়লা কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা পিডিবির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি টানা তিন অর্থবছর বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসেবে, বাড়তি দামের কয়লা কিনে বিইআরসির নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় কেন্দ্রটির রাজস্ব ঘাটতি প্রতি বছরই বেড়েছে। যদিও গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া সূচক অনুসারে গড়ে ৯৯.৫৮ ডলার দরে পরিশোধ করায় কিছুটা লোকসান কমে আসে। তবে ১৭৬ ডলারের হিসাব ধরে পরিশোধ করা হলে লোকসান হতো ১ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা।
পিডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে ইন্দোনেশিয়া সূচকে দাম পুনর্গণনার সুপারিশ থাকলেও তা প্রজ্ঞাপন হয়নি। ফলে বড়পুকুরিয়া কর্তৃপক্ষ আগের ১৭৬ ডলার দামই ধরে বিল করছে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবু তালেব ফরাজী বলেন, কয়লা উত্তোলনে ঠিকাদারকে টনপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়। দেড় হাজার মিটার গভীর থেকে কয়লা উত্তোলনের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেশি।

ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানি খাত–সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের কয়লার মান ভালো হলেও পরিবহন খরচ না থাকায় দাম আরও কম হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু প্রকল্প সম্প্রসারণ, জমি অধিগ্রহণ এবং ডলার–টাকার বিনিময় হারের কারণে খরচ বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে। ডলারের দর ৮৪ থেকে বেড়ে ১২২ টাকা হওয়ায় মাথাপিছু আয় না বাড়লেও খনি কোম্পানির আয় বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)–এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, “এভাবে পিডিবিকে লোকসানে ফেলে খনিকে মুনাফা দেওয়া জ্বালানি খাতে ভয়াবহ অনিয়ম। আমদানির চেয়ে দ্বিগুণ দামে কয়লা কিনতে হলে খনির প্রয়োজনই থাকে না।”
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, দুই বিভাগকে একত্রে বসিয়ে বড়পুকুরিয়ার কয়লার দাম পুনর্নির্ধারণে আলোচনা হবে। সেই ভিত্তিতে ন্যায্য দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় খনি–কেন্দ্র বিভাজন ও দায়বদ্ধতার অভাবের ফলে তৈরি হওয়া এ সংকট গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপও বাড়াচ্ছে—মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






























